Saturday, December 5, 2015

রঙ!

কাল থেকে খালি চন্দন সেনের ছবি চোখে পড়ছে আর লাল সেলাম দেখছি। আমার নিরেট মাথায় কিচ্ছু ঢুকছে না। এক ভদ্রলোক পুরস্কারের টাকা নিজের ক্যান্সার চিকিৎসার খাতে না দিয়ে চা বাগানের অনাহারে থাকা শ্রমিকদের দিয়েছেন। সত্যিই এই কাজ প্রশংসার তো বটেই। সেলিব্রিটি বলে আলোচিতও বটে। যদিও চা বাগানের শ্রমিক মৃত্যু নিয়ে এর আগেও বিস্তর হইচই লেখালেখি হয়েছে।

যখন পাড়ার হরিপদ মিস্তিরি তার সারা জীবনের সঞ্চয় দিয়ে স্কুল গড়বে ছেলেবেলায় পড়াশোনা করতে পারেনি বলে, তখন কী আর আলোচনা হবে না কী হইচই! এ তো সেই কে যেন দুঃখ করছিলেন যে প্যারিস নিয়ে আমরা রঙ বদলাতে বসেছি, আর ওদিকে চেন্নাই যে ভেসে গেল। কেন যে বোঝেন না, প্যারিস আর চেন্নাই এক হল? এই তো আমাদের এখানের এক ডাক্তারবাবু বহুকাল ধরে কোন প্রত্যন্ত গ্রামে নিজের টাকায় হাসপাতাল খুলে সেখানেই পড়ে আছেন। তার খবর কে রাখে! এমন কতজন আছেন যাঁরা নিঃশব্দে কাজ করেন, কিন্তু খবর হন না, বা হতেও চান না। আসলে দান যত নিঃশব্দে হবে ততোই সেটা দান থাকে, আর নাহলে...। অবশ্যই কোনো সেলিব্রিটির পক্ষে নিঃশব্দে, গোপনে কোনো বড় কাজ করা খুব কঠিন। সবাই তো আর উত্তমকুমার নয়, যে মারা যাওয়ার পর দেখা যাবে ঋণীর সংখ্যা কত। 

একটা কথা বুঝলাম না, ভালো কাজ যিনি করলেন তিনি অবশ্যই আমাদের নমস্য, অবশ্যই সেলাম যোগ্য। হতে পারে তিনি বামপন্থীও। কিন্তু লাল সেলাম কেন, সেইটা কিছুতেই মাথায় ঢুকল না। কেন বেঁচে থাকলেও রঙ লাগবে, মরে গেলেও কোন রঙের মড়া সেটা জানা জরুরি?  বোমা ফেললেও রঙ, আবার পুরস্কার দান করলেও রঙ!

অথচ আসলে কিছুই রাঙানো হল না হয়ত...


কেন রঙ ছাড়া কাউকে শুধু মানুষ হিসেবে বলতে পারিনা – তোমাকে অভিবাদন?

ম্যাও সামলানো

এ মণিহার আমায়... গভীর দরদ দিয়ে সবে ধরেছিলাম, হঠাৎ, গানটা থামা, দিচ্ছি, দিচ্ছি...। থেমে গেলাম। বিস্মিত আমি ভাবি, আমাকে কী দেবে শঙ্করীদি? তারপরেই বুঝি আমাকে নয়, বেড়ালকে। না, তালব্য শ নয়, লাঞ্চ। আমাদের ফ্ল্যাটবাড়িটায় একটা আওয়াজ সর্বস্য বেড়াল আছে। বুই অবশ্য বলে, ওটা বেড়াল নয়, বেড়ালের ভূত। ঠিক খাওয়ার সময় হলেই রান্নাঘরের পেছনে একতলা থেকে আওয়াজ আসে, ম্যাও, ম্যাও। আর শঙ্করীদির উত্তর শোনা যায়। যতক্ষণ না ভাত মেখে রান্নাঘরের জানলা দিয়ে আওয়াজ লক্ষ্য করে নীচে ছুঁড়ে দেবে ততক্ষণ এই উত্তর-প্রত্যুত্তর চলতেই থাকবে। এই যে দিন পনেরো বেড়াতে গিয়েছিলাম, ফিরে আসতেই হাসি হাসি মুখে শঙ্করীদি বলল, এ ক’দিন তো মাছ ছিল না বৌদি, দুধ কিনে এনে ভাত মেখে খাইয়েছি। ভাবছিলাম, একেই বোধহয় বলে ম্যাও সামলানো!

এছাড়া, যথাবিহীত নিয়মানুযায়ী, তীর্থের কাক, শালিক এবং চড়ুইয়েরা তো আছেই। পিছনের ফ্ল্যাটবাড়িটা উঠে যাওয়ায় তাদের জানলা চমৎকার দাঁড়ের কাজও করছে। কাকের তাগিদা, শঙ্করীদির বকুনি, শালিকের পরবর্তী লাইনেই ছিলাম বাবা এবং অবশেষে চড়ুইয়ের খুঁদকুঁড়ো – জমজমাট শঙ্করীদির সংসার। অনেকদিন পর এক কানের মাথার ওপরটা কিছুটা কাটা নিপাট নিরীহ ভালোমানুষ কুকুরটাও এরমধ্যে ফিরে এসেছে।

অতএব আমাদের তিনজনকে বাদ দিলেও শঙ্করীদির পোষ্যর সংখ্যা বাড়তির দিকেই।


অবশেষে অবলা

মনে হয় কাজটুকুই হোক আমার পরিচয়।
ব্যাপ্তিতে ব্যতিক্রমী ভ্রমণ-রচনা
সীমন্তী সেন
৫ ডিসেম্বর, ২০১৫, ০০:০১:০০
অবলা বসু
সাহেবি শাসকদের সংস্পর্শে বাঙালির ‘আধুনিক’ হয়ে ওঠার অন্যতম সূচক ছিল ভ্রমণকারী এবং ভ্রমণবৃত্তান্ত রচয়িতা হিসেবে তার আত্মপ্রকাশ। উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধ থেকে পশ্চিমি শিক্ষা এবং জাতি-চেতনার উন্মেষ— এই দ্বিবিধ যুগ-অভিজ্ঞতার ফলে ভারতীয় তথা বাঙালি নব্য শিক্ষিত সম্প্রদায়ের মনে ভ্রমণ শুধু বিলাসই নয়, প্রায় এক অবশ্যপালনীয় কর্তব্য ধার্য হয়। স্বাভাবিক কারণেই, এই নবলব্ধ ভ্রমণের সংস্কৃতি ছিল মূলত পুরুষকেন্দ্রিক। সে কালে খুব বেশি মহিলা ভ্রমণের সুযোগ পাননি, আর পেলেও নিজেদের দৃষ্টি এবং স্বরকে পাঠককুলের কাছে পৌঁছে দেওয়ার প্রত্যয় বা প্রেরণা, কোনওটাই তেমন ছিল না। এ দিক থেকে অবলা বসুর ভ্রমণ-সংক্রান্ত রচনা বিশেষ উল্লেখের দাবিদার।
১৩০২-১৩৩২ কালপর্বে অবলা বসুর ভ্রমণের বিবিধ রচনা প্রকাশিত হয় মূলত ছোটদের পত্রিকা মুকুল-এ এবং দু-একটা প্রবাসী-তে। অবলা বসুর জন্মের সার্ধশতবর্ষ উপলক্ষে দময়ন্তী দাশগুপ্ত তাঁর এই রচনাগুলি সংকলিত করে তৎকালীন বাঙালি মহিলার ভ্রমণ রচনার খুব সীমিত তালিকায় গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন করলেন। সমসাময়িক কালে স্বদেশ ভ্রমণ বিষয়ে স্বর্ণকুমারী দেবী, প্রসন্নময়ী দেবী বা প্রিয়ম্বদা দেবীর বেশ কিছু রচনা পাওয়া গেলেও, ইউরোপ ভ্রমণের বৃত্তান্ত কৃষ্ণভাবিনী বা জগৎমোহিনী চৌধুরীর বাইরে বিশেষ একটা চোখে পড়েনি। অবশ্য কাছাকাছি সময়ে, হরিপ্রভা তাকেদা বা সরোজনলিনীর রচনায় জাপান ধরা পড়েছে। তবে এঁরা কেউ-ই জীবনে অবলার মতো এত বিস্তৃত ভ্রমণের সুযোগ পাননি। জগদীশচন্দ্র বসু বিদেশ থেকে বার বার ডাক পেয়েছেন এবং এ রকম বহু জায়গায় স্বামীর সহযাত্রী হয়েছেন অবলা। জাতীয়তাবাদের স্বপরিচিতি নির্মাণের কালে অবলা-ই বাঙালি মহিলাদের মধ্যে প্রথম, যিনি পুব এবং পশ্চিম— দুই পৃথিবী সম্পর্কেই তাঁর ‘দেখা’ পাঠকের দরবারে হাজির করতে পেরেছেন।
• অবলা বসুর ভ্রমণকথা, সংকলন ও সম্পা: দময়ন্তী দাশগুপ্ত। পরশপাথর, ১৭৫.০০
• জলপথে মুর্শিদাবাদ, মনোমোহন গঙ্গোপাধ্যায়, সম্পা: গৌতমকুমার দে। পরশপাথর, ১৭৫.০০
• ভ্রমণকারীর ভ্রমণ বৃত্তান্ত, রসিককৃষ্ণ বন্দ্যোপাধ্যায়, সম্পা: সমীর পাত্র ও শেখর ভৌমিক। মহিষাদল রাজ কলেজ, পরি: আশাদীপ, ১৫০.০০
অবলার কাশ্মীর, লখনউ, মাদ্রাজ কিংবা চিতোরের বিবরণ একই ধাঁচের— যাত্রাপথ, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, স্থাপত্য, লোককথা, লোক-বিশ্বাস, অঞ্চলের ইতিহাস। লেখার ধরনে স্পষ্টই বোঝা যায় যে, উদ্দিষ্ট পাঠক হল কিশোর-কিশোরী। তবু এরই মধ্যে টুকরো মন্তব্য ধরা পড়ে সমসাময়িক বাঙালি বুদ্ধিজীবী শ্রেণির রাজনৈতিক বোধ বিশ্বাসে লেখিকার অংশীদারিত্ব। যেমন, লখনউতে পুরনো রেসিডেন্সি অঞ্চলে সিপাহি বিদ্রোহে নিহত ইংরেজ সেনানায়কদের স্মৃতিসৌধ দেখে তাঁদের বীরত্ব সম্পর্কে তাঁর মন শুধু শ্রদ্ধায় ভরে আসে না, ‘মনে গভীর বিষাদের(ও) আবির্ভাব’ হয়। আবার চিতোর কিংবা কাশীতে হিন্দু স্থাপত্য, মন্দিরের ভগ্নদশা দেখে লেখেন ‘...সর্ব্বত্রই হিন্দু কীর্ত্তির ভগ্নাবশেষ দেখিয়া প্রাণে এক প্রকার ক্লেশ হয়। বর্ত্তমান রাজারা যে কত ভাল তাহা বারবার মনে হয়। তাঁহারা কেমন যত্ন করিয়া হিন্দু ও মুসলমানদিগের প্রাচীন কীর্ত্তি সকল রক্ষা করিতেছেন।’
অবলার বিলেতের বিবরণ তৎকালীন অন্যান্য বিলেতের বিবরণের সঙ্গে প্রায় মিলে যায়। বিলিতি জাহাজেই প্রথম ইংরেজদের ‘নিয়মানুবর্তিতা’ এবং ‘শৃঙ্খলাবোধ’-এর সঙ্গে পরিচয়, এরপর এর দৃষ্টান্ত চোখে পড়ে রাস্তাঘাটে, পার্ক, মিউজিয়মে— প্রায় সমস্ত প্রতিষ্ঠানে বা লোক সমাগমে। ছোটদের জন্য লন্ডনের গল্প লিখতে বসেও কিন্তু অবলা পার্লামেন্টের দীর্ঘ বিবরণ দেন, জানান ফ্যাক্টরি বিল নিয়ে আলোচনা, ভোট দেওয়ার ব্যবস্থা বা লর্ড এবং ‘কমন’-দের বসার আলাদা বন্দোবস্তের কথা। উপনিবেশাশ্রিত শিক্ষিত বাঙালির শাসকের সংস্কৃতির সঙ্গে নৈকট্যবোধের পরিচয় মেলে  যখন ওয়েস্টমিন্‌স্টার অ্যাবিতে কবিদের সমাধি দেখে ‘মনে হয় যে...অনেক দিনের পরিচিত বন্ধুদিগের সহিত সাক্ষাৎ হইয়াছে’। রোম বা ভেনিসের বিবৃতিতেও বাজে এ রকমই পূর্ব-পরিচিতির সুর।
উন্নতি, সমাজ সংগঠনে আমেরিকা যেন ইউরোপীয় সংস্কৃতিরই বিস্তৃত রূপ। তৎকালীন অন্যান্য ভ্রমণকারীর মতোই অবলা পশ্চিমি সমাজ সভ্যতার অনেক কিছু দেখেই মুগ্ধ হন। তবে মুগ্ধতায় জাতীয়তাবোধকে হারাতে দেওয়া যায় না, তাই তিনি কিশোরদেরও বলতে ভোলেন না যে ‘আমাদের জাতীয় চরিত্রে ভাব ও আকাঙ্খার এমন সরল ও উচ্চমান বিদ্যমান, যাহার পরিবর্ত্তে বিদেশের সভ্যতা সম্পূর্ণ গ্রহণ করিবার ইচ্ছা আমার মনে কখনই উদয় হয় নাই’।

লেখিকা যখন জাপানে যাচ্ছেন ১৯১৫ নাগাদ, তখন জাপানকে ঘিরেই গড়ে উঠতে শুরু করেছে পুবের আত্মবিশ্বাস, আত্মাভিমান। তার উন্নত সভ্যতা, আধুনিকতার পরিচয় লেখিকা পেতে শুরু করেন জাপানি জাহাজ থেকেই। এর পর বাড়িঘর, যানবাহন, শিশু প্রতিপালন, উৎসব, অনুষ্ঠান, গৃহসজ্জা— প্রায় সব কিছুই যেন এরই অভিজ্ঞান। তবে এই রকম ‘আধুনিকতা’ এবং ‘উন্নতি’ সত্ত্বেও জাপান কিন্তু স্বাতন্ত্র্য হারায়নি। নারী স্বাধীনতা থেকে চা-পান অনুষ্ঠান পর্যন্ত জাপান নিজস্বতায় সমুজ্জ্বল। তবে ভুললে চলে না যে, এই উন্নতির পাশাপাশি প্রকটিত হচ্ছে জাপানের আগ্রাসী রূপ। অতএব, আমরা এরকম মন্তব্য পাই যে অত্যন্ত কম সময়ে এই অত্যাশ্চর্য উন্নতি জাপানিদের আত্মম্ভরী করে তুলেছে। সে কালে কোনও মহিলার তো নয়ই, সচরাচর কোনও পুরুষের রচনাতেও এত দেশ, সংস্কৃতির বয়ান মেলে না। অতএব, বক্তব্যে না হলেও ব্যাপ্তিতে অবলার ভ্রমণরচনা ব্যতিক্রমী।

Friday, December 4, 2015

শুধুই মানুষ

ঈশ্বর হয়োনা তুমি।

সে বড় নিষ্ঠুর।
মানুষের কষ্টে
নীরব থাকে।

ঈশ্বর হয়োনা তুমি।

আর্তনাদে
যে কোনো
উত্তর দেয় না।

ঈশ্বর হয়োনা তুমি।

সাকারে বা নিরাকারে
যে পাথর।

বরং, মানুষ হয়ো -
রাগে অভিমানে।
ভ্রান্তিমাখা একটা
নিপাট মানুষ।

যাকে জড়িয়ে
রাখা যায়
নাড়ির বন্ধনে।
যাকে ভালোবাসা যায়
মাংসে-মজ্জায়।

তেমন ঈশ্বর হয়ো
মানুষের মতো।
অথবা মানুষ হয়ো
শুধুই মানুষ।


আজও মনে পড়ে

চলে যাব আজ
এক ছুট্টেই
তোমার কাছে।

তোমার কাছে?

এই সকালে
ভোরের আলোয়
ডাক এসেছে।

অনেক বছর
পেরিয়ে তোমার
কোলের কাছে
ডাক এসেছে।

পড়ার বই
ইস্কুল মাঠ,
পরীক্ষা আর
পুরোনো পাঠ
ঝগড়া কী ভাব –
কতদিন আগে...
ভুলে গেছি সব।

মনে পড়ে যায়
আজ সক্কালে?

আজ সক্কালে
তোমার অভাব
মনে পড়ে যায়।

মনে পড়ে যায়
সিল্কের শাড়ি
ডানহাতে ঘড়ি
হিলতোলা জুতো
আওয়াজ ভারি।

আধুনিকা তুমি
আমরা তখন
বিস্মিত চোখের
নেহাত কিশোরী
মফঃস্বলের।

চুপ চুপ সব।
বিজ্ঞান ক্লাস
বইখাতা সারি
বুক ঢিবঢিব
পারি কী না পারি।
বকুনি আর
বুঝে নেওয়া পড়া
ব্ল্যাকবোর্ড জুড়ে
ছবি আঁকা সারা।

শিক্ষক দিন
ফুল আর হাসি
মনে মনে বলা
ভালো যে বাসি।

তোমার কাছে
বকুনির ভয়
অথচ তোমাকে
ঘিরেই তবু
কলরব হয়।

প্রতিবাদ হয়
হলে অন্যায়
তোমার সঙ্গে।
কিশোরী হৃদয়ে
কলরব হয়।

বহুকাল আগে
‘হোক কলরব’,
মফঃস্বলের
ইস্কুলে, কেউ
জানেনা তবে।

কতদিন আগে?
ভুলে গেছি সব।

আজ আরেকবার
হোক কলরব।

হোক কলরব
তোমাকেই ঘিরে।

ভুলিনি তোমায়
এই অবেলায়
ভোরের আলোয়
সব মনে পড়ে,
আজও মনে পড়ে।


Tuesday, December 1, 2015

জীবিত ও মৃত

হিন্দুস্থান কেবলস পরিবার গ্রুপে অনেকদিন আগেই বাবার ছবি পোস্ট করতে বলেছিল। এদ্দিনে করলাম। খুব স্বাভাবিকভাবেই বাবা নেই জেনে তাঁর ছাত্র-ছাত্রীদের খারাপ লাগছে। আত্মার শান্তি কামনা করি ইত্যাদি লিখছেন। আর আমার সেসব পড়তে গিয়ে ভয়ানক অস্বস্তি করছে। আসলে আমার এই ছ’বছরেও বাবা নেই এই অনুভূতিটা মনের মধ্যে একেবারেই বসেনি। আমার দোর্দণ্ডপ্রতাপ বাবা যেন এতটাই জীবন্ত ছিল যে কিছুতেই নেই হয়ে যেতে পারে না। এই তো গতবছর শান্তিনিকেতনে অবলা বসুর বইয়ের জন্য ছবি তোলার কাজটা শেষ হলে বেরিয়ে এসেই খুশিমনে বাবাকে জানাতে গিয়ে মনে পড়ল নাহ্‌, ফোন করা যাবে না। এই বুড়ো বয়সে এসে ইংরেজি এম এ দিতে গিয়ে সব কটা পেপারে পরীক্ষা দেওয়ার আগে বলে নিয়েছি, দেখো বাবা, যেন পাশটা করি, নইলে মানসম্মান যাবে।

দেবীর জন্য অনুভবটাও তাই। হয়ত আরও বেশি। এখনও সেই সতেরো-আঠেরোতেই যেন দেবী আটকে আছে। চাইলেই ওর সঙ্গে ওদের বাড়ির ছাদের সিমেন্টের বেঞ্চিতে বসে আড্ডা দেওয়া যাবে, অথবা হাঁটতে হাঁটতে যে ধানক্ষেত ওরই মতো আজ আর নেই সেখানে হারিয়ে যাওয়া যাবে আল ধরে। বড় হওয়ার পর কম দেখা হওয়ায় ওর বিয়ের পরের চেহারা আমার মনে দাগই কাটেনি। অনায়াসে আমার কিশোরী বয়সটা জুড়ে বসে থাকে ও।

শুধু তো মৃত্যুই নয়, জীবনও কেড়ে নেয় কোনো কোনো কাছের মানুষকে। জীবনের কোনো এক বাঁকে অন্যপথে হারিয়ে যায় তারা। অথচ সেই সময়টা জুড়ে কেমন অমলিন রয়ে যায়, চিরকাল।

ওই যে, কেউ হারায় না এ জীবনে। আমার তো তেমনই মনে হয়।


কেন সব কুকুরগুলো সহসা চেঁচায় রাতে?

কয়েকদিন আগে ঘরে বসেই শুনতে পাচ্ছিলাম পাড়ার কয়েকজনের আলাপের টুকরো। আলাপের বিষয় ছিল রাজনীতি এবং মোদ্দা কথাটা ছিল এরপর কোন দলে থাকব। একজনের মন্তব্য শুনলাম, না না তৃণমূলেই, কতবার আর বদলাব? লোকে কী বলবে?

আসলে রাজনীতি যাঁরা করেন তাঁদের অধিকাংশই করেন আখের গোছানোর জন্য। একমাত্র এখনও বামপন্থী কিছু মানুষ আছেন এবং থাকবেন যাঁরা আদর্শগতভাবে বামপন্থাকে সমর্থন করেন তাই পার্টি করেন। যদিও তাঁদের এই আদর্শ কতটা বাস্তবে কার্যকরী হয় সে বিষয়ে সন্দেহ আছে। তবে বামেদের এমন একটা ভাবাদর্শের মুখোশ আছে যে এতটুকু কিছু দেখলেই মানুষ অনেক বেশি সমালোচনা করেন। কিন্তু অন্যরা চোর-ছ্যাঁচ্চোড় হলেও এবং সেই সব কাজই খোলাখুলি করলেও মানুষ ধরে নেয় যে এরা তো চোর হবেই, এটাই তো স্বাভাবিক। একই লোক তাই যখন বাম নেতা থাকেন তখন সমালোচিত হন কিন্তু উলটে গেলেই আমরা অনায়াসে বলি, আরে লোকটা তো চোরই, এতে আশ্চর্য হচ্ছ কেন?

দলে গুন্ডা পোষা কী কৃষক-শ্রমিক মৃত্যু কোনো নতুন ঘটনা নয়, কিন্তু ঢাক পিটিয়ে অজস্র বেকার খাতে টাকা দিয়ে একেবারে খোলামেলাভাবে ভোট কেনার চেষ্টা চোখের এই চামড়াহীনতা এইটা আগে ছিল বলে আমার মনে পড়ে না। অবশ্য রাজনীতি আমি কিছু বুঝিনা এবং খুব ভুলোও। তবু কিছুতেই মনে করতে পারলাম না।

অনেক কিছুই আমার মাথায় একদম ঢোকে না। যেমন, কেউ যদি ভালো কাজ করে, তাকে তো মানুষ অমনি সমর্থন করবে, তাহলে ভোট কেনার চেষ্টা করার তো দরকারই থাকে না।

মন্ত্রী-আমলারা চুরি-জোচ্চুরি করে অনেক টাকা নিয়ে করবেটা কি? দেওয়ালে কী কমোডে রেখেটাই বা কী হবে?

সাধারণ মানুষ, যাঁদের অনেকেই ভোট, রাজনীতি বা স্বাধীনতার অর্থই বোঝেন না, তাঁরা কেন দূর-দূরান্ত থেকে এসে দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে ভোট দেন? এক শ্রেণীর মানুষ আছেন যাঁরা খেতে না পেলেও ভোট দিতে পারলে একটা গৌরব অনুভব করেন।


অনেকদিন আগে একটা পোস্ট এডিটোরিয়াল লিখেছিলাম – ‘খেতে পাওয়া এবং বেঁচে থাকা মানুষের অধিকার, রাষ্ট্রের কর্ত্তব্য’। এখন সব কেমন ভুলভাল লাগে নিজেরই। আসলে বোধহয় ভাবাটাই অর্থহীন।