Wednesday, June 1, 2016

তোমাকে দেখছিলাম

অথচ সে আছে। আর তাই হৃদয়টা পরিপূর্ণ হয়ে কেমন টলমল করে ওঠে। দুহাত বাড়িয়ে চাইলেই তাকে ছুঁয়ে দিতে পারি আর যেই ছুঁতে যাই অমনি সে সমস্ত আকাশ বাতাস জুড়ে এমনি ছড়িয়ে যায় যে আপনি আমি মিলিয়ে যাই সেই অসীমতায়। আর তখন আমার একলাপনাটা হারিয়ে গিয়ে কেমন পূর্ণ হয়ে উঠি। কোথাও আর একটুও ফাঁক থাকেনা। আনন্দ ভরে ওঠে মনে। ধূ ধূ রোদ্দুরে অথবা শীতের সন্ধের দুঃখের গায়ে সেই আনন্দের রেশ এসে যখন পড়ে তখন বেশ লাগে। খুব একপশলা বৃষ্টির পর সমস্ত সবুজের গায়ে ঝলমল করতে করতে যখন সে বলে ওঠে, এই আমি এই আমি, তখন মনটা আপনি বালিকা খুশিতে নেচে ওঠে। পাহাড়ি রাস্তা ধরে একা একা হাঁটলে আনমনে ফুটে থাকা ফুলে সেই হাসিটুকু হঠাৎ যেন ঝিকমিকিয়ে ওঠে। রাত গভীর হলে একলা চাঁদ যখন এক পাহাড়ের গায়ে আলো ছড়ায় আর অন্য পাহাড়টা অভিমানে আঁধার হয়ে থাকে তখন মনে হয় ওই আলো-আঁধারির ঠিক মাঝখানটিতে আপনমনে স্বপ্নের জালখানি বিছিয়ে রেখেছে সে। সেকথা ভাবতে ভাবতেই বুনোফুলের গন্ধ এসে মাথার ভেতরটায় কেমন ঝিমঝিম করতে থাকে। আবার খুব ভোরবেলার আলো যখন সমুদ্রের দিগন্ত ছোঁয়, অমনি একটা আশা জাগে মনে - এইবার, ঠিক এইবার তাকে দেখতে পাব। আর তাই ভিড়ে ঠাসা কলকাতায় ট্রামের জানলা দিয়ে তাকে দেখতে দেখতে যাই।

যখন এসেছিলে

কাল সারা সন্ধে মাথার মধ্যে রবি ঠাকুরের গানের শব্দ-অক্ষরগুলো বেজে যাচ্ছিল, দেবব্রত? না, না, সুচিত্রা মিত্রের গলায় –‘আমায় কেন বসিয়ে রাখ একা দ্বারের পাশে...। মেঘ জমেনি তখনও। অথচ আমি তার জন্যই বসেছিলাম। অথবা ভাবছিলাম, জানতে চাইছিলাম, আমায় কেন বসিয়ে রাখ, কেন বসিয়ে রাখ...? 

ভোরের দিকে ঝড়ের শব্দে ঘুম ভেঙে গেল। মনে হল, তুমি এসেছিলে, আমি ঘুমিয়েছিলাম। যাবার বেলায় ডাক দিয়ে গেলে অমনি অমনিই।

আমি তখন ছিলেম গহন মগন ঘুমেরই ঘোরে যখন বৃষ্টি নামল...


তারপর থেকে সারাটাদিন মেঘলা হয়ে আছে।

নেমতন্ন!

সেদিন সহ সম্পাদক মেল খুলে কাজের তাড়নায় ফোন করেছেন, তো সম্পাদক চিঁ চিঁ করে জানালেন, আমি বিছানায়, তুমি ওদিকে যা পার কর। সহ সম্পাদক উদবিগ্ন গলায় জিজ্ঞাসা করলেন, আবার কি হল? উত্তরে সম্পাদক রীতিমতো হাহাকার করে উঠলেন,কী আর হবে, নেমতন্ন, বুঝেছ, আমি আর নেমতন্নে যাচ্ছিনা

ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে সহ সম্পাদক জানতে চান, মানে? আর বোলো না, সম্পাদক বলতে থাকেন, গতকাল রাতে একটা বিয়েবাড়ির নেমতন্ন ছিল। একে তো জামাকাপড় পরাটাই ইদানীং প্রায় যুদ্ধ করার মতো লাগে। যাইহোক সেজেগুজে হাঁপাতে হাঁপাতে তো গিয়ে পৌঁছালাম। খুব কাছেই ছিল বিয়েবাড়ি, বাসে এই গোটা দু-তিন স্টপেজ। বিশেষ চেনা-পরিচিত কেউ তেমন ছিলনা, গিফট দিয়ে খেতে গেছি। প্লেট নিয়ে সামান্য দু-এক পদ নিয়ে কিছুটা খেতেই বুঝতে পারলাম প্লেট ধরায় হাতের পাতায় খুব ব্যথা করছে, মানে একেবারে ভেঙে আসছে আর কী। আচ্ছা, তুমিই বলো, একজন মাঝবয়সী ভদ্রমহিলা সেজেগুজে নেমতন্ন খেতে গিয়ে যদি অন্যের হাতে ধরা প্লেট থেকে খান, কেমন বিশ্রী লাগে! তাই তাতে রাজি না হয়ে কোনওমতে নম নম করে খাওয়াটা শেষ করে ফেললাম। ফের হাঁপাতে হাঁপাতে বাড়ি ফিরে একেবারে শয্যাশায়ী। আর বোলো না, তখন তো বুঝিনি, বাড়ি ফিরে হাড়ে হাড়ে টের পেলাম, হ্যাঁ, একেবারে হাড়ে হাড়েই, যে বাঁ কাঁধটায় অসহ্য যন্ত্রণা করছে। ওই যে প্লেটটা ধরেছিলাম বাঁ হাতে। সারারাত ধরে বুঝলে, টের পেলাম নেমতন্ন কারে কয়! পেনকিলারেও কিচ্ছু হলনা, ঘুমোতেই পারলামনা। যে পাশই ফিরি ব্যথা ডিফারেন্ট অ্যাঙ্গেলে জেগে ওঠে, মানে জেগেই থাকে আর আমাকেও জাগিয়ে রাখে। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে খুব সিরিয়াস গলায় সহ সম্পাদক পরামর্শ দেন, সব গেছে, খুলে অয়েল করতে হবে। ...


বেশিক্ষণ কথা বললেও হাত-কাঁধ আবার নতুন করে ব্যথা বাড়তে পারে। ফোন নামিয়ে রেখে সম্পাদক ভাবেন, কত ডাক্তার দেখালাম, এ চিকিচ্ছে কী আর সহজ কথা, ওমন তেল-মোবিলের কম্ম নয়, চামড়াটা কেটে ভেতরের খোলনলচে শুদ্ধু বদলিয়ে যদি আবার নতুন করে হাড়-মাংস পোরা যেত, তাহলে হলেও হতে পারত। সেতো আর হওয়ার নয়, এই বলে ফের একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে কাঁধে সেঁকটা লাগিয়ে অন্য পাশ ফিরে শুলেন।

Sunday, May 29, 2016

ঈশ্বর

কেউ আমার কথা শুনছে। নিঃশব্দে শুনেই যাচ্ছে। কোনও মন্তব্য করছে না, কোনও প্রতিবাদ তো দূরের কথা। আমাকে সংশোধন করার চেষ্টাও করছে না। অথচ একবারও মেনে নিচ্ছে না যে আমার সবটাই ঠিক। শুধু শুনেই যাচ্ছে আমার শব্দের নিঃশব্দ উত্থানপতন।

এই গভীর নিঃশব্দ শ্রোতারই নাম ঈশ্বর।

Thursday, May 26, 2016

আনফিনিসড পোট্রেট

ছোটবেলা থেকে সবসময় এই স্বপ্নটা পেরোতে চেয়েছি। অন্ধকারের মধ্যে শুধু পাল্লাহীন একটা দরজার ফ্রেম যার অন্যপাশটা অন্ধকার। প্রতিবারই ওপাশটায় পা দিয়ে ক্রমশ অতল অন্ধকারে নেমে গেছি। এইসময়েই ঘুমটা ভেঙে যেত আর বুঝতাম ওটা নিছক স্বপ্ন। অথচ কোথাও একটা হয়ত আশা থাকত কোনদিন ওপাশটায় আলো থাকবে। ছোটবেলায় বোধহয় এভাবে কখনও ভাবিনি। ছোটবেলায় স্বপ্নটা দেখতেই চাইতাম না। অথচ একেকসময়ে প্রতি রাতেই দেখতাম বা ঘুমিয়ে পড়লেই। স্বপ্নটাকে বেশ ভয়ই পেতাম একটা সময়। অথচ আমাকে দেখতেই হত। বেশ বড় বয়স পর্যন্তই দেখেছি, হয়ত কলেজ জীবনেও। তারপর অনেকদিন আর দেখিনা।

সেদিন আগাথা ক্রিস্টির একটা উপন্যাস পড়ছিলাম। গোয়েন্দা কাহিনি নয়। মেরি ওয়েস্টম্যাকট ছদ্মনামে যে ছটি উপন্যাস লিখেছিলেন তারই একটি আনফিনিসড পোট্রেট। মূল মহিলা চরিত্রটি ছোটবেলায় একটি ভয়ের স্বপ্ন ক্রমাগত দেখার প্রসঙ্গে আবার মনে পড়ল নিজের স্বপ্নটা। মহিলাটিকে কেন্দ্র করে ঘটনা আবর্তিত হলেও হয়ত মূল চরিত্র ওই স্বপ্নটাই। ছোটবেলায় নিয়মিতই স্বপ্নে একটি গানম্যানকে তিনি দেখতে পেতেন যার একটি হাত নেই, যে রূঢ়ভাবে তার দিকে চেয়ে থাকত। একটু বড় হলে নিজের চেনা চরিত্রগুলোই অন্য স্বপ্নের মধ্যে বদলে গিয়ে কোনও একজন এক একবার গানম্যান হয়ে যেত। বড় হওয়ার পর মহিলাটি আর সেই স্বপ্নটা দেখতেন না। কিন্তু নিজের জীবনে বদলে যাওয়া মানব চরিত্রের মধ্যে স্বপ্নের সেই গানম্যানকে দেখে ভয় পেতেন। কাহিনির একেবারে শেষে যখন মহিলাটি স্বপ্নের সেই গানম্যানকে বাস্তবে সত্যি সত্যিই দেখতে পাবেন তখন প্রাথমিকভাবে আতঙ্কিত হলেও সে যে আসলে একেবারেই সাধারণ একটা মানুষ, ভয় পাওয়ার কিছুই নয়, সেইটা অনুভব করে নিজের ভয়টা কাটিয়ে উঠবেন। ঊনচল্লিশ বছর বয়সে আবার নতুন করে জীবন শুরু করবেন, যে জীবনে তাঁর ছোটবেলার সেই ভয় তাঁকে আর তাড়া করে বেড়াবে না। 

ছোট থেকেই তিনি খুবই কল্পনাপ্রবণ ছিলেন, নিজের কল্পনার সেই জগতেই থাকতে ভালোবাসতেন। কথা খুব কম বলতেন, মিশতে পারতেন না সহজে, বই পড়তে ভালোবাসতেন। একটা সময় তা কাটিয়ে উঠতে গিয়ে বাধা পান। তারপর লিখতে শুরু করেন। প্রথম লেখা প্রকাশকের কাছ থেকে ফেরত এলেও পরে আরেক প্রকাশকই ওঁকে আবিষ্কার করেন। লেখক হিসেবে কিছুটা পরিচিতিও হয়। একবার আত্মহত্যা করতে গিয়ে বেঁচে যান। হয়ত দ্বিতীয়বার করতেন, কারণ তাঁর মনে হয়েছিল সেই গানম্যান-এর হাত থেকে সারাজীবনেও তাঁর আর নিস্তার নেই এবং এই ভয় তাড়িত জীবন তিনি আর বইতে পারছেন না। কিন্তু বাস্তবে শেষপর্যন্ত যাকে তিনি অবচেতনে ভয় পেতেন, চেতনে তাঁর কাছেই না জেনে নিজের জীবনের কথা খুলে বলেন। যে মুখ ফুটে কথাই বলত না, এক রাতেই বলে ফেলে সারা জীবনের অজস্র ঘটনা। আর তাকেই ঠিকমতো সাজিয়ে নামটাম দিয়ে লিখে ফেলেন সেই পুরুষটি যিনি শুনেছিলেন নিঃশব্দে। আসলে কখনওই মহিলাটির কথা কেউ এত মন দিয়ে এবং বাধা না দিয়ে শোনেনি। কাহিনির কথক একসময় ছবি আঁকিয়ে ছিলেন, প্রথম জীবনে যুদ্ধে তাঁর সেই হাতটি বাদ যায়, যা দিয়ে তিনি আঁকতেন। তাঁর জীবনের এটাই প্রথম লেখা বা ভিন্ন মাধ্যমে ছবি আঁকা। লেখাটি তিনি পাঠাচ্ছেন তাঁর এক বন্ধুর কাছে যিনি একজন লেখিকা।

উপন্যাসটা পড়ে মনে হল, আমিও সেই স্বপ্নটাকে পেরোতে পেরেছি কি? বোধহয়, একটু একটু করে। আসলে অবচেতনে যা মনে আতঙ্ক সৃষ্টি করে চেতনে হয়ত তা আদপে ভয়েরই নয়। হয়ত সেই ফ্রেমহীন দরজার ওপারে অনেকটা আলোই থাকে যাকে শেষপর্যন্ত দেখতে পাওয়া যায়।


স্বপ্নের গানম্যান আসলে আতঙ্কের কেউ না। বাস্তবে সেই বন্ধু হয়ে ওঠে। অথচ বাস্তবের অনেক চরিত্রই যাকে বিশ্বাস করা যায়, শেষপর্যন্ত বদলে যায় গানম্যান-এ।

Tuesday, May 24, 2016

ঠিকানা

আমার একটা ঠিকানা থাক
যেখানে আমি যেকোনদিন চলে যেতে পারি।
আত্মীয়বাড়ি, অথবা বন্ধুর এমন কী নিজেরও হতে পারে।
যেখানে কড়া নাড়লে কেউ একজন দরজা খুলে খুশি হয়ে উঠবে, আমি এসেছি বলেই।
বন্ধু অথবা আপনজন বা প্রিয় মানুষ।

আমার একটা ঠিকানা থাক
যেখানে আমি যেকোনদিনই চলে যেতে পারি।
যেখানে নক্সা পাড়ের আসনে বসিয়ে, সে গরম ভাতের থালা এনে দেবে।
তারপর নিজের বিছানাটা ছেড়ে দিয়ে ঝেড়েঝুড়ে বালিস পেতে বলবে,
ঘুমোও, আমি জেগে রইলাম মাথার কাছে।

আমার একটা ঠিকানা থাক
যেখানে আমি ইচ্ছে করলে চলে যেতে পারি।
যেখানে ঘুমিয়ে পড়লেই রূপকথা বা জাদুর দেশে চলে যাব, যে গল্পের শেষটা খুব সুন্দর 
আর তাই আমার ঘুমন্ত ঠোঁটের কোণে লেগে থাকবে এক টুকরো হাসি।

আমার একটা ঠিকানা থাক
যেখানে আমি ইচ্ছে করলেই নিরুদ্দেশে যেতে পারি।
আর তাই কখনও যাব না।

Monday, May 23, 2016

বেদনার তৃতীয় দিনে

ব্যথার মহিমাময় দিক এটাই যে সে তোমাকে উঠে দাঁড়াতে শেখায়।
যেকোনওভাবেই উঠে দাঁড়াতে। ভর দিয়ে অথবা একা একাই।
প্রথমে একটু ভেবে নিতে হবে ঠিক কী ভাবে উঠে দাঁড়ালে সহনীয় হবে।
কারণ যেভাবেই হোক উঠে দাঁড়াতে হবে। ওটাই প্রাথমিক লক্ষ্য।
আর এই সহনীয় শব্দটা তখন একটু একটু করে বদলে যেতে থাকবে। অনেকটা সিঁড়ির ধাপে ধাপে ওঠার মতো। ওঠার জন্য শুধু ওপরের আর সামনের দিকের সিঁড়িই থাকে।
দাঁড়িয়ে থাকলেই তো চলে না, হেঁটে যেতেও হয় এক পা দুপা করে।
কারণ দাঁড়িয়ে থাকলে চলেনা।
হাঁটার সময় প্রথমে একটু ঝুঁকে, তারপরে ক্রমশ মাথা তুলে সোজা।
কারণ মাথা তোমাকে তুলতেই হবে। আর ঠিক তখনি ব্যথাগুলো ক্রমশ নুয়ে আসতে থাকবে বহুদিনের অভ্যেসের মতো।
যতক্ষণ পর্যন্ত না তারা আবার তোমাকে নুইয়ে দিচ্ছে।
হতাশার কিছু নেই। ব্যথার মহিমাময় দিক এটাই যে সে তোমাকে আবারও উঠে দাঁড়াতে শেখাবে।