Friday, April 8, 2016

অধিকন্তু

ঊনবিংশ শতকের মাঝামাঝি সময় থেকে বাঙালি মেয়েদের মধ্যে শিক্ষার হার যখন বাড়তে শুরু করল এবং তাঁরা ক্রমশ নিজেদের জন্য নিজেরাও কলম ধরলেন তখন অন্যান্য নানা বিষয়ের মতোই একটা বিষয় নিয়ে তাঁদের দীর্ঘ লড়াই করতে হয়েছিল, তা ছিল নামের সঙ্গে পদবী যোগ করা। কারণ পদবী তখন পর্যন্ত একমাত্র পুরুষেরাই ব্যবহার করতে পারতেন। মেয়ে সন্তানই যেখানে কাম্য ছিল না, সেখানে খেঁদি বা আন্নাকালীদের নামটুকু পাওয়াই অনেক ছিল। স্বর্ণকুমারী কী গিরীন্দ্রমোহিনী এত সব নামের বাহার একটু শিক্ষিত উচ্চবিত্ত পরিবার না হলে জুটত না। লেখার ক্ষেত্রেও অনেকদিনই মেয়েদের নাম হয় একেবারেই লেখা হত না, নাহলে জনৈক বঙ্গমহিলা কী আমাদিগের এক ভগিনী কী বড়জোর সূচিপত্রে কোনওভাবে আলাদা করে চিহ্নিত করা থাকত মেয়েদের লেখা বলে। সেদিক থেকে বামাগণের রচনা বিভাগ খুলে এবং তাঁদের নামসহ লেখা প্রকাশ করে বেশ উল্লেখযোগ্য কাজ করেছিল বামাবোধিনী পত্রিকা। আবার অনেক পুরুষ লেখকও বোধহয় চট করে পাঠকের চোখে পড়বার আশায় নারীর ছদ্মনামে লিখতেন।

পদবী ব্যবহার নিয়ে যে দ্বিধা বা নিষেধ ছিল তা পত্রিকাগুলিতে লেখিকাদের নাম দেখলেই বোঝা যায়। উচ্চবিত্ত ঘরের মেয়েরা সাধারণত নামের শেষে দেবী, এবং তুলনায় নিম্নবিত্ত ঘরের মেয়েরা নামের শেষে দাসী ব্যবহার করতেন।এখানে নিম্নবিত্ত মানে শিক্ষা এবং আর্থিক ক্ষেত্রে নয়, সামাজিক অবস্থানে।শিক্ষিত পরিবার না হলে মেয়েদের মধ্যে লেখালেখির চলও তেমন থাকত না। বামাবোধিনী পত্রিকায় জনৈক লক্ষ্মীমণিকে তাঁর লেখা কবিতা বা প্রবন্ধের তলায় লক্ষ্মীমণি বর্ধমান, শ্রী লক্ষ্মীমণি, লক্ষ্মীমণি দেবী, লক্ষ্মীমণি বসু প্রভৃতি একাধিক নামে উল্লেখ করা হয়েছে। এরকম অন্যান্য লেখিকাদের ক্ষেত্রেও ঘটেছে।

অর্থাৎ মোদ্দা কথা হল এই যে নামের শেষে পদবীটা পুরুষতান্ত্রিক নিয়মের বিরুদ্ধে খেটেখুটে লড়াই করে আদায় করা।

কিন্তু এখন আবার অনেক মহিলাই নামের শেষে পদবীটা পুরুষতান্ত্রিকতা বলে রাখতে চাননা। আবার কেউ কেউ স্বচ্ছন্দ বোধ করেন বলে ছোটবেলা থেকে যে পদবীটা ব্যবহার করে এসেছেন, সেইটাই রাখেন। কেউ বা বিয়ের পর স্বামীর পদবী ব্যবহার করেন। কেউবা দুটো পদবীই ব্যবহার করে নামকে অযথা ভারাক্রান্ত করে ফেলেন সময়ে সময়ে।

অর্থাৎ পদবী নিয়ে বাঙালি মেয়ে এখনও কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারেনি। এবং পদবী থাকাটা পুরুষতান্ত্রিক বা না থাকাটা সেটাও নিয়েও নয়।

আমার মনে হয় এত না ভেবে, নিজের কানে যেটা ভালোলাগছে সেটাই নিজের নাম ও পরিচ্ছদ হওয়া উচিত। হ্যাঁ, পদবী খানিক নামের পরিচ্ছদই বটে।

বাঙালির পদবীর ইতিহাস ঘেঁটে কোনওদিনই আমাদের লাভ নেই। কারণ ঊনবিংশ শতকের আগে সে ইতিহাসে আমরা কোথাও ছিলাম না। আর তাই এখনও মাথা না ঘামানোই ভালো। অন্ততঃ এই নিয়ে মেয়েদের লড়াইয়ের ইতিহাসটা জানার পর একথাই আমার মনে হয়েছে। পুরুষতান্ত্রিক মনে করলে বাবা ও স্বামী উভয়ের পদবীই তাই, আবার না মনে করলে কোনটাই কিছু না। আর দীর্ঘদিনধরে মেয়েরা সবরকমের পদবীই ব্যবহার করে আসছেন, তাই সবেতেই আমাদের একটা অধিকার তো বর্তায়।


পূর্বসূরীদের অধিকার আদায়ের উত্তরাধিকার তো বটেই।

No comments:

Post a Comment