Wednesday, September 2, 2015

বিরিঞ্চিবাবা

১)
স্বর্ণাক্ষরে চাকরি করতে পুজোসংখ্যার লেখার জন্য চিত্রশিল্পী শুভাপ্রসন্নের বাড়ি গিয়েছিলাম। উনি লিখতে পারবেন না, অনুলিখন করতে হবে। বেশ বড় সাজানো বাড়ি। ঢোকার মুখে জলে ফুলটুল কীসব ভাসছে। ঘরে অজস্র আর্টের জিনিস। প্রত্যেকটা ঝকঝক করছে। বসার ঘর দেখলেই তাঁর আর্থিক সাচ্ছল্যের একটা সম্যক পরিচয় পাওয়া যায়। সময়টা ছিল নন্দীগ্রাম ঘটনার ঠিক পরেই পরেই। প্রসঙ্গটা উনিই তুললেন। আমি শুনলাম, শুনেই গেলাম। মনে হল, ফাঁকা কথাগুলো যেন এই সাজানো সচ্ছ্বল ঘরে হাস্যকরভাবে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। উনি বিদেশ ভ্রমণের গল্প বলছিলেন একটু আগে, সেটাই বেশ মানাচ্ছিল। এটা শুনতে শুনতে আমার খুব হাসি পাচ্ছিল, ভীষণ হাসি...। সেই থেকে লোকটাকে বড় ঘেন্না লাগে আমার।

২)
‘আমাদের ছুটি-র হয়ে শঙ্খ ঘোষের সাক্ষাতকার নিতে গেছি। তার আগে মায়ের সুবাদে একদিন গিয়েছিলাম ওনার বাড়িতে। ছাদ পর্যন্ত বই, দারুণ লেগেছিল। ভদ্র ব্যবহার, ভালো। শঙ্খ ঘোষের গদ্য এবং কবিতা আমার সবসময়ই খুব ভালোলাগে। সাক্ষাতকার মুখে দেবেন না। প্রশ্ন লিখে দিয়ে যেতে বললেন, লিখে উত্তর দেবেন। তাই সই। আমার সাক্ষাতকার নেওয়ার অভিজ্ঞ মন বলল, মুখে বললে আলগা শব্দ দু’একটা বেরিয়েই আসতে পারে, খুব সতর্ক হলেও। লিখে দিলে সে সুযোগ নেই। আর শঙ্খ ঘোষ এখন বাঙালি বুদ্ধিজীবিদের মধ্যে অন্যতম। কাজেই ‘আমাদের ছুটি’-র মত অতি ক্ষুদ্র, তুচ্ছ একটা পত্রিকাতেও তিনি কী বলছেন সেটা খুব বুঝেশুনেই বলতে হবে। লিখিত সাক্ষাতকার আনতে গিয়ে ছবির কথা বললাম। কিছুতেই রাজি হলেন না। ওনার বক্তব্য ওনার অনেক ছবি পাওয়া যায়, যেকোনো জায়গা থেকে নিয়ে নিতে। আমাদের ছবি তুলতে দেওয়ার মতো সময় ওনার নেই।
কিন্তু ‘আমাদের ছুটি’-তে কোথাও থেকে নিয়ে ছবি প্রকাশিত হয়না। হতে পারি আমরা খুব ক্ষুদ্র, খুব তুচ্ছ, কিন্তু আমাদের নিজস্ব কিছু এথিকস রয়েছে। ছবি ছাড়াই সাক্ষাতকার প্রকাশিত হল। সেটা দেখার কোনো আগ্রহও দেখালেন না শঙ্খ ঘোষ। সত্যিই তো ওনার মতো মানুষের সাক্ষাতকার কত নামীদামী পত্রিকায় বেরোচ্ছে, আমরা তো চুনোপুঁটি। কিন্তু কেন ওই সাক্ষাতকারের সঙ্গে ছবি নেই তা নিয়ে আমাদের অনেকবার পাঠকদের জিজ্ঞাসার মুখে পড়তে হয়েছে। বলেছি, প্রথম সংখ্যা তো তাই কিছু ত্রুটি রয়ে গেছে আমাদেরই।

৩)
বর্তমানে বাংলা ভ্রমণলেখিকাদের মধ্যে মূলতঃ পরিচিত মুখ নবনীতা দেবসেন। তাঁর লেখার সরসতা আমার খুব ভালোলাগে। কিন্তু যখন লেখার প্রতি ছত্রে ছত্রে ‘আমি’ এবং আবার ‘আমি’ থাকে তখন ক্লান্ত লাগতে শুরু করে ভীষণ। অমর্ত্য সেনের কোনো লেখায় নবনীতার উল্লেখ থাকে কিনা জানিনা, কিন্তু নোবেল পাওয়ার পর থেকে নবনীতার লেখার পাতায় পাতায় অমর্ত্যের কথা পড়তে পড়তে আমার আরও ক্লান্ত লাগে। তা হোক তবু সাক্ষাতকার একটা নেওয়া যেতেই পারে বলে যোগাযোগ করলাম। প্রথমে সময় হবে না ইত্যাদি। আসলে এই তুচ্ছ পত্রিকা, কে পড়বে, কে জানবে আর কী...। কারণ তারমধ্যেই তিনি বহু কিছু করছেন কাগজে দেখি মাঝেমধ্যে। যাইহোক বিনীতভাবে জানাই ই-মেল-এ প্রশ্ন পাঠাতে পারি সময় করে উত্তর দিলেই হবে। যাহোক প্রশ্ন পাঠাই। বেশ কয়েকবার তাগাদা দেওয়ার পর উত্তর আসে দায়সারা, দু’তিনটে প্রশ্নের দু’এক কথায় সংক্ষিপ্ত জবাবের পর লেখা - তোমার প্রশ্নগুলো বেশ ভালো, আমার বইগুলো দেখ, উত্তর পেয়ে যাবে। দাঁতে দাঁত চেপে বলি, আপনার ছবি লাগবে, আপনি যদি পাঠিয়ে দেন বা আমরা গিয়ে তুলে আনতে পারি। উত্তর এল, ওসব ছবি-ফবি দিতে পারব না। ও যোগাড় করে নাও। নাহ্‌, সাক্ষাতকার প্রকাশ করিনি আমরা। ওই যে আমাদেরও একটা এথিকস আছে, যত তুচ্ছই হই না কেন।

৪)
এদিক থেকে দেবেশ মামা তুলনায় অনেক ভালো। অন্ততঃ এই ধরণের কোনো মানসিকতা আমি দেখতে পাইনি। শুধু ছোট থেকেই দেখেছি একদম খাওয়ায় না। মনে হয় এইজন্য ওনার পপুলারিটি এত কম। শঙ্খ ঘোষের বাড়িতে গেলে প্রচুর খাওয়ান। অনেক মানুষের আড্ডাও জমে ওখানে। সেই ছোটবেলায় দেখেছি আমরা কলকাতায় এলে দেবেশমামা যখন কখনো সখনো গেস্টহাউসে মায়ের সঙ্গে দেখা করতে আসতো কোনোদিন হাতে করে আমাদের জন্যে কিচ্ছু আনেনি। তাই আমি নাম দিয়েছিলাম শুকনো মামা। কিছুদিন আগে আমার বইটা আর মায়ের একটা বই দিতে গিয়েছিলাম বাড়িতে। আমার ধারণা আমি প্রথমবার গেলাম। মা যদিও বলল, নাকি আগে গেছি, কে জানে বাবা, এরকম না খাইয়ে রাখলে ঠিক মনে থাকত আমার। একে তো কানে শুনতে পায়না এখন, সে এক বিড়ম্বনা, তার উপর আমার ভয়ানক খিদে পেয়ে গিয়েছিল। লোকে তো বাড়িতে কেউ এলে চা-বিস্কুট দেয়, ওমা কতক্ষণ ভাবলাম বুঝি এই দেবে এই দেবে, আর দেয়ই না। অনেকক্ষণ বাদে প্রায় ওঠার সময় জিজ্ঞাসা করল, কিছু খাবি? তোর মিস্টি খাওয়ার বারণ নেই তো? বোঝো ঠ্যালা! ওদিকে পেটেয় ছুঁচোয় ডন দিচ্ছে...। লোকে তো অন্ততঃ এক প্লেট মিস্টি এনে খাও খাও করে তবে একথা বলে। আমার আবার মুখ দিয়ে মিথ্যে বেরোতে চায় না। দাঁত-মুখ চিপে বলি, না খাব না, সুগার আছে। আমার এদিকে খিদে পেলে কেমন পাগল পাগল লাগে। তারপরে জিজ্ঞাসা, ডিমটিম খাসতো, ওমলেট খাবি, না বারণ আছে? নিতান্ত নিরুপায় আমি বলি, বারণ আমার বিস্তর কিছুতে আছে, সে প্রায় না খেয়ে থাকলেই হয়, ও বাদ দাও অত আমি মানিনা, দাও কী দেবে। যাইহোক অমলেট আর জল খেয়ে ধড়ে প্রাণ এল। বাইরে বেরিয়েই একটা দোকানে ঢুকে তাড়াতাড়ি কিছু খেয়ে নিলাম। বাড়ি ফিরে মাকে হুমকি দিই, আর আমি যাচ্ছিনা দেবেশ মামার বাড়ি। এরপর কখনো যদি যাইও তাহলে এক পেট খেয়ে তবে যাব। মা বলল, এরকম তো ছিল না দেবেশদা, আমাদের নাটকের রিহার্সালের সময় কত খাওয়াতো। আই বলি, রেখে দাও তোমার খাওয়াতো, আমি তো জম্মে দেখলাম না, সাধে কী আর বলি শুকনো মামা। তবে খেতে না দিক দেবেশমামার শেষ প্রকাশিত বইটা দিয়েছে। তাতেই আমি খুশি – যা পাওয়া যায় আর কী।

৫)
আসলে ছোটবেলায় যখন মায়ের কাছে শুনেছি যে শারদীয় আনন্দমেলাগুলো পড়তে নিয়ে আর একটাও জয়া কাকিমা ফেরত দেয়নি, তখন থেকেই আমি বুদ্ধিজীবিদের ওপর রীতিমতো চটা।

৬)
এখনো পর্যন্ত একমাত্র ব্যতিক্রম মনে হয়েছে অমিতাভকাকাকে। ছোটবেলায় বা বড় হয়েও কলকাতায় অমিতাভকাকা-রত্না কাকিমাদের বাড়িতে অনেকবার থেকেছি। সেই স্মৃতিগুলো কিন্তু বেশ মজার। রাত বারোটার সময়, তাড়াতাড়ি ছোটদের খেতে দিয়ে দাও, কী উদাত্ত কন্ঠে ‘সায়নারা সায়মন’। ‘নিজ হাতে নিজস্ব ভাষায়’ আমাকে দিয়েছিল অমিতাভকাকা, আর একটা রাশিয়ান গল্পের বইয়ের বাংলা অনুবাদ আমাদের দুজনকে। পৃথ্বীশকাকাকে অমিতাভকাকার বাড়িতেই দেখেছি আমি। আবছা মনে আছে। আমাদের বিয়ের কার্ডও পৃথ্বীশকাকার আঁকা। আমাকে স্নেহ করতেন। একেবারে মনে নেই শক্তি চট্টোপাধ্যায়কে। অথচ ওনার তুমুল ডাক, ‘রত্না রত্না’ স্মৃতিতে রয়ে গেছে। কিছুদিন আগে জানতে পারলাম রত্না কাকিমা অবলা বসুর ভাইয়ের নাতনী।

৭)
ভালোলাগে আড্ডাবাজ মানবকাকুকেও। সেই ছোট থেকেই দেখছি যেন একইরকম রয়ে গেছে। অরুণকাকা লোকটা ভালোই ছিল, ছোটবেলায় আমার কবিতা পড়াতাম। আমাকে একটা বই উৎসর্গও করেছিল। কিন্তু একটু ইয়ের দোষ ছিল আর কী।

অতএব,

বুদ্ধিজীবিদের মিছিলে আমি কখনো যাবনা। আসলে আমার মনে হয় কবিতা, গদ্য বইয়ের পাতায় অথবা শিল্পের ভেতর দিয়ে যাঁকে পাওয়া যায় সেটাই ভালো। কারণ সেখানে তাঁরা আমাদের কাছে এত বড় হয়ে ওঠেন যে বাস্তব মানুষটা সেই জায়গায় পৌঁছতে পারেন না। সেখানে খারাপ লাগাটা আরো বেশি হয়ে ওঠে।

আসলে বুদ্ধিজীবিদের মিছিলেরও রঙ থাকে যা আপাতভাবে বোঝা যায় না। সরাসরি রঙ তাও একরকম। এ আরও ভয়ঙ্কর।


আসলে সমাজের উঁচুতলার মানুষদের দূর থেকে দেখাই ভালো। শুধু তাঁরা যখন সাধারণ মানুষের কথা বলেন, তাদের দুঃখ-দুর্দশার কথা আমার কেমন বিশ্রী একটা হাসি পেয়ে যায়...। অনেকটা বিরিঞ্চিবাবা গল্পের ওই ছেলেটার মতো।

Monday, August 31, 2015

ভালোমানুষ আর রাজনীতি

রাজনীতি নিয়ে আমার ধারণা খুব কম। আরো কম অভিজ্ঞতা। অভিজ্ঞতার কথা বললেই মনে পড়ে 'কালান্তর' কাগজে কাজ করার দিনগুলোর কথা। মনে পড়ে চন্দনদা আর কল্যাণদার কথা। আচ্ছা, বিবাহিত মহিলা হলেই সব জায়গায় কেন জিজ্ঞাসা করে দ্বিতীয় সন্তানের ইচ্ছা রয়েছে কী না? জানিনা, অন্যদেরকে করে কী না, আমায় তো কালান্তর আর স্বর্ণাক্ষরে দুজায়গাতেই করেছিল। কী উত্তর দিয়েছিলাম মনে নেই, তবে স্বর্ণাক্ষরে পরে মহাশ্বেতা বলেছিল, আমি নাকি অমরেন্দ্রবাবুর এই প্রশ্নের উত্তরে স্বতস্ফূর্তভাবে বলেছিলাম, পাগল নাকি? কালান্তরে চন্দনদা না কল্যাণদা কে এই প্রশ্নটা করেছিল মনে নেই। হাজার কী বারোশো টাকার মতো পেতাম মাস গেলে, তাই তার নাম ছিল স্টাইপেন্ড। কিন্তু কাজ করতে বেশ লাগত। এমনকী রোজ ছা্রপোকা মারতে মারতে আর কামড় খেতে খেতেও। কালান্তরের চেয়ার-টেবিলগুলোই আসলে বিপ্লবী ছারপোকাদের দখলে ছিল। কিম্বা ছারপোকা মারাটাই হয়ত বিপ্লবের প্রথম পর্যায়।
চন্দনবাবু, কল্যাণবাবু ডাকায় দুজনেই আঁতকে উঠে বললেন, হয় কমরেড বলো, নয় দাদা। দেখলাম কমরেড বলার মতো বিপ্লবী হতে পারিনি, দাদা-ই ভালো। এখানেই আমার সাংবাদিকতার ঠিকঠাক হাতেখড়ি। কাজ করার ভীষণ স্বাধীনতা ছিল। তর্ক হত নানা বিষয়ে, এমনকী ওনাদের সঙ্গে মতবিরোধও। কিন্তু কাজের পরিবেশ প্রথমদিকে বেশ চমৎকার ছিল। আমি দেখেছি কোথাও কাজ করতে গেলেই আমার কাজের ঠেলায় কিছু মানুষ আমাকে ভালোবাসেন, কিছু লোকের বিরাগভাজন হই। তেমনই কিছু সমস্যা হল মূলতঃ নিউজ এডিটরের সঙ্গে। আমার তো আবার ভয়ানক রাগ। ব্যাগপত্র গুটিয়ে বললাম, চললাম। চন্দনদা, কল্যাণদা ডেকে বিস্তর বোঝালেন। শেষে চন্দনদা বললেন, আমি তোমার বাবার মতো, আমি প্রবীরবাবুর হয়ে তোমার কাছে ক্ষমা চাইছি। তুমি এত ভালো কাজ শিখেছ, ভালো কোনো জায়গায় সুযোগ পাও, যেও, সেদিন বারণ করব না, কিন্তু এভাবে যেও না। তারপরে স্বর্ণাক্ষরে চাকরি পাওয়ার আগে পর্যন্ত কাজ করেছি। হ্যাঁ, নিউজ এডিটরের সঙ্গে একটাও কথা না বলেই দীর্ঘদিন কাজ করেছি তারপর। এটা চন্দনদা, কল্যাণদা আমাকে মাথায় করে রাখত বলেই।
একবারই শুধু কল্যাণদার কাছে বকুনি খেয়েছিলাম, আমি হিতেন ঘোষের মেয়ে সেটা বলিনি বলে। উত্তরে বলেছিলাম, আপনারা তাঁকে আদৌ মনে রেখেছেন কিনা তাতো বুঝিনি, তাছাড়া আমি নিজের পরিচয়েই কাজ করতে চেয়েছি। অবশ্য মায়ের কথা জানতেন, কারণ কালান্তরে মায়ের বেশ কয়েকটা উপন্যাস বেরিয়েছিল শারদীয় সংখ্যায়।
কাগজে পড়েছিলাম গঙ্গায় ঝাঁপ দিয়ে চন্দনদার আত্মহত্যার কথা। খুব মনখারাপ হয়েছিল। কেন যে এ কাজ করলেন অমন নিরীহ নিপাট ভালোমানুষ লোকটা।

আজকের এই নোংরা রাজনীতি দেখতে দেখতে পিতৃপ্রতিম মানুষটিকে মনে পড়ে খুব। আর কল্যাণদা আজও নিশ্চয় হাত নেড়ে সেই টিপিকাল ভঙ্গীতে নিউজের গুরুত্ব, কোনটা কোথায় কেন যাবে বোঝাচ্ছেন। আচ্ছা নতুন ছেলে মেয়েরা আমাদের মতো এঁড়ে তক্ক করে তো?
কাজ শুরু করার প্রথমদিনেই দুজনের কেউ একজন বলেছিলেন মনে আছে, আমাদের 'পুলিশ' কিন্তু তালব্য শ।
চারদিকে দেখছি পুলিশে অথবা পুলিসে মানুষের ওপর লাঠি চালাচ্ছে অথবা পার্টির গুঁতোয় টেবিলের তলায় ঢুকছে, আর আমি কেবল ভেবেই যাচ্ছি যে এই পুলিশ তালব্য শ না দন্ত স!!

কেচ্ছা-কাহিনি

টাইমস অফ ইন্ডিয়া থেকে কয়েক বছর বেশ কিছু বাংলা পত্রিকা প্রকাশিত হত বিভিন্ন বিষয়ে। তার সব কটাতেই নিয়মিত কলাম লিখতাম আমি। একবার 'উদিতা'-র থেকে একটা ইন্টারভিউ নিতে গেছি। মেয়েটি আই এ এস পরীক্ষায় সফল হয়েছে। ইন্টারভিউয়ের উদ্দেশ্য এটাই আমার জানা ছিল। মেয়েটির মা একজন নামকরা আই এ এস অফিসার। তাঁর দ্বিতীয় স্বামীও তাই। সম্ভবতঃ বিবাহ বিচ্ছেদ হয়ে গেছে যতদূর মনে পড়ে। মেয়েটির বাড়িতে একটা বিরাট পিয়ানো ছিল মনে পড়ে। দাদু-দিদার কাছেই মানুষ। তাঁরাই দিয়েছেন, ও বাজাতে খুব ভালোবাসে। অনেক কথা হল। আমি দেখেছি, অন্যদের ক্ষেত্রে কী হয় জানিনা, ইন্টারভিউ নিতে আমার অসম্ভব ভালোলাগে এবং অপরপক্ষও আমার সঙ্গে খুব প্রাণ খুলে কথা বলে, সে যেই হোক না কেন। মেয়েটি আমাকে অনেক কথা বলেছিল, তার ছোটবেলার দুঃখের স্মৃতি, মায়ের কথা, নিজের বাবার প্রতি ঘৃণা, সৎ পিতাকেও অপছন্দ করা। বলতে বলতে শেষে বলেছিল, এসব কথা আপনি প্লিজ লিখবেন না। আমি বলে ফেলেছি। আমি বলেছিলাম, তুমি কিচ্ছু চিন্তা কোরো না, আমি তোমায় কথা দিচ্ছি, এসব কথা লিখব না। পরের দিন আবার ফোন, প্লিজ লিখবেন না কিন্তু। আমি বললাম, তুমি নিশ্চিন্ত থাক এমন কোনো কথা আমি লিখব না যাতে তোমার বা তোমার পরিবারের কোনো অসম্মান হয়।
আসলে আমার কেচ্ছা ব্যাপারটাই ভালোলাগেনা।
আসলে ওর মায়ের গল্পে কোথাও একটা আমার মাকেও খুঁজে পাচ্ছিলাম।
আই এ এস পরীক্ষায় সফল মেয়েটির ইন্টারভিউ জমা দিলাম। অ্যাসিস্টেন্ট এডিটর কল্যাণদা বললেন, এসব কী লিখে আনলি? অদ্ভুত একটা মুখভঙ্গী করে বললেন, ওর বাবা-মার ওইসব ব্যাপারট্যাপার লিখবি তো...। আমি নির্বিকার মুখে সংশোধন করি নিজের বাবা নয়, স্টেপ ফাদার। - কী জানতাম নাতো? তবে ওর বাবা কে? অন্য কেউ হবে - আমার নির্লিপ্ত জবাব। এটা একদম করতে পারিসনি, এতো বড় একটা সুযোগ হারালি। আমি নীরব। যদিও সাক্ষাৎকারে ও কীভাবে পরিশ্রম করে আই এ এস পেয়েছিল তার খুঁটিনাটি যত্ন করেই লেখা ছিল।
হ্যাঁ, সুযোগ হয়তো হারালাম, কারণ টাইমসে পাকা চাকরি আর হয়নি আমার কখনোই। তবে ওইখানে দাঁড়িয়েই ঠিক করলাম এমন একটা লেখা দেব যাতে একটা কথাও বলতে পারবে না।
সেই অর্থে সুযোগ এল। ভাটনগর পুরস্কার পেল আই এস আই থেকে সংঘমিত্রা। তার গবেষণার বিষয়টি অত্যন্ত জটিল। অতএব আমার ডাক পড়ল 'উদিতা'-র হয়ে সাক্ষাৎকার নেওয়ার। আমি খুব মন দিয়ে ওনার গবেষণাপত্র পড়লাম ইন্টারনেটে। তারপর ঘেঁটে বার করলাম তার লিঙ্কড একটা বিষয়ের ওপর দুজন নোবেল পেয়েছে সেইটা। পড়ে ফেললাম। ইন্টারভিউটা বেশ চমৎকার হল। যখন এডিটোরিয়ালে দিলাম বুঝলাম এর বিন্দুবিসর্গ কারোর মাথায় ঢুকবে না। অতএব কেউ কোনো কথাই বলল না, হুবহু ছাপা হল। কিন্তু পত্রিকাটা হাতে নিয়ে মনে হল না অনেকটা চোনার মধ্যে একফোঁটা দুধের মতোই লেখাটা পত্রিকায় একেবারেই মানাচ্ছে না। বোর হলাম নিজেই।
তবে যে প্রশ্নটার জবাব আমাকে অনেকবার দিতে হয়েছে অর্থাৎ জুওলজির ছাত্রী হয়ে সাংবাদিকতা কেন করি তার একটা জুতসই কারণ হল।
এখন কাগজ খুলেই রোজ বন্ধ করে ফেলি। দেখি কত সাংবাদিক কেচ্ছা লিখে যাচ্ছে, কেচ্ছায় ভরে যাচ্ছে কাগজগুলো। আর রগরগে কেচ্ছা পড়তে পড়তে মানুষ ভুলে যাচ্ছে পেটে ভাত নেই। আসলে এই ভুলিয়ে রাখাটাই তো মিডিয়ার উদ্দেশ্য। বাংলাদেশের ব্লগারদের মুসলিম ধর্মান্ধরা মারে বলে তার একটা বাজার আছে, হিন্দুর হাতে হিন্দু মরলে মাঝের পাতার তলায় এক কলামের ছোট্ট খবর হয়, না দিলেই নয় গোছের। বাজারে খাবে না যে সেই খুনটা সেলিব্রিটি মা মেয়েকে মারার মতো অথবা কোন ব্যাঙ্ক ম্যানেজার যেন তার প্রেমিকা আর তার মেয়ের দেহ টুকরো টুকরো করে নদীতে ফেলছিল সেইসব মুখরোচক খুনের মতো।

বাজারে খুনও তো মুখরোচক হতে হয়।

দড়ি টানাটানি

পচিমবঙ্গে এখন ক্ষমতা দখলের লড়াই চলছে অক্ষমদের মধ্যে। এ যেন ছোটবেলার সেই দড়ি টানাটানির খেলা। না, আজ আর সাধারণ মানুষ এই ক্ষমতা দখলের লড়াইয়ের মধ্যে নেই। যতই তারা আছে বলে দু'দলে চিৎকার করুক না কেন। ঢের হয়েছে। এই লড়াই বাম অথবা ডানকে একাই লড়তে হবে। হেরে বা জিতে প্রমাণ করতে হবে নিজেদের। নাহলে পুরোটাই হয়ে দাঁড়াবে দুটো দলের নিজেদের মধ্যে মারামারি, গুন্ডাবাজি। সাধারণ মানুষ পরিবর্তন চেয়েছিল, কিন্তু তার ফলে যা পেল তাতে তাদের অবস্থা এতটাই খারাপ যে আর চাওয়ার আশাটুকুও হাতে নেই। সাধারণ মানুষ যদি কোনোদিন সত্যিকারের লড়াইয়ে নামে তাহলে কাউকেই আর চাইবে না সেদিন। যেরকম কোনঠাসা হয়েছে মানুষ তাতে এটা ঘটতেই পারে যেকোনোদিন। শুধু বেশ কিছু মানুষ আত্মসুখে মগ্ন। তারা বাধা দেবে প্রাণপনে।

পথে চলে যেতে যেতে

কলকাতার পথে একা একা হাঁটতে হাঁটতে মাঝে মাঝে টুকরো টুকরো ছবি মনে গেঁথে যায়। আজ দেখলাম, এক মুচি তার কাজের ফাঁকে হাতের ওপর রাখি লাগিয়ে তাকিয়ে দেখছে। মাথাটা নীচু ছিল তাই চোখ দেখতে পাইনি, কল্পনা করে নিলাম খুশি খুশি মুখটা। তারপর গোটা তিনেক রাখি গুছিয়ে এক পাশে রেখে আবার কাজে মন দিল, আমিও এগিয়ে গেলাম। মানুষের এই যে ছোট ছোট তুচ্ছ তুচ্ছ সুখের মুহূর্ত তা যেন অনেক বিরাট কিছু পাওয়ার থেকেও বড়। আমিও ওর ওই ছোট সুখের কিছুটা মনে রেখে দিলাম।

Sunday, August 30, 2015

তোমাকে দেখছিলাম

কলকাতার পথে হাঁটতে হাঁটতে মাঝে মাঝেই নীরার সঙ্গে দেখা হয় আমার। সেই কবে থেকেই। আজও দেখলাম ওকে। হলুদ পাড়ের একটু অফ হোয়াইট ঘেঁষা সাদা ছাপা শাড়িতে। হ্যাঁ, ইদানীং বয়স বেড়েছে খানিক। চেহারাটাও কিছুটা ভারী হয়েছে। হাতে মোবাইল-এ কী সব করতে করতে একা একাই হাঁটছিল। মাঝে মাঝে আবার মোবাইল বন্ধ করে চুপচাপ। হাওয়ায় চুলগুলো উড়ছিল অল্প অল্প। রাস্তায় ওকে দেখেছি অনেকদিন বিভিন্ন জায়গায়, বিভিন্ন বেশে, বিভিন্ন মেজাজে। কখনো একা কথা বলতে বলতে হাঁটে, কখনো খুশিতে গুনগুন করে গান গাইতে গাইতে। দু'একবার চোখের জল নিয়েও হনহন করে লুকিয়ে চোখ মুছতে মুছতে হেঁটে যেতে দেখেছি ওকে। তবে তখন খুব দ্রুত হাঁটে। পাছে কেউ বুঝতে পারে। আজ দেখলাম শান্ত অন্যমনস্কভাবে হেঁটে যাচ্ছে। মাঝে মাঝেই ভাবি ওকে জিজ্ঞাসা করি, ও খোঁজে কাকে? চলে যাওয়া সুনীলকে না কী সেই সাতাশ বছরের নীলু অর্থাৎ নীললোহিতকে? কোথায় থাকে ও, দিকশূ্ন্যপুরে? নাহ্‌, কোনদিনই জিজ্ঞাসা করতে পারিনি। কাছাকাছি গেলেই দেখি টপ করে একটা আধা চলন্ত বাসে কী ট্রামে উঠে পড়ে অথবা ভিড়ের মধ্যে কোথায় হারিয়ে যায়। তাই শুধু দূর থেকেই দেখি ওকে বাসস্টপে কয়েক মুহূর্ত...।

Friday, August 28, 2015

ইচ্ছে – প্রথম পর্ব


আজ সকাল থেকেই ‘ইচ্ছে’ নিয়ে দু’চার কথা লিখতে ইচ্ছে করছে, কিন্তু ঠিক যা ইচ্ছে জমছে না কলমে থুড়ি কী বোর্ডে। ‘ইচ্ছে’ ব্যাপারটা বেশ চমৎকার যতক্ষণ তা একলার থাকে। যখনই তার ইচ্ছে হয় আরও আরও মানুষেরাও সেই ইচ্ছেতে চলে আসুক তখন অন্যপক্ষের ইচ্ছে না হলেই ভারী মুশকিল।

এই যে আমায় ছোটবেলায় যারা ভীষণ কাছের থেকে দেখেছে তারা বলে, তোকে আর মনে নেই? ‘আমার এখন কান্না পাচ্ছে, আমি কাঁদবই’ - ওইটাই তো তুই। একদম ঠিক। কারণ ওই কান্নায় অন্যদের বিশেষ অসুবিধা ঘটত না বলে বা ছোটরা অমন কেঁদেই থাকে।

কিন্তু বড় হয়েও আমার ইচ্ছেগুলো ওইরকমই রয়ে গেল। ক্লাস টেনে যখন স্কুলের মধ্যে বন্ধুদের টেনে নিয়ে হেডমিস্ট্রেসের বিরুদ্ধে লড়াই করছিলাম, মা ভারী বিরক্ত হয়ে বলেছিল, তোমায় তো বলে লাভ নেই, করছ কর এরপর নিজে উল্টাবে আর তখন পাশে কেউ থাকবে না। একেবারে অক্ষরে অক্ষরে মিলে গেল সেই ভবিষ্যতবাণী।

ক্লাস নাইন-টেনে পড়তে একা একা ধানক্ষেতে বিকেল-সন্ধ্যেয় ঘুরে বেড়ানোর অভ্যেস ছিল। তখন ওইসব জায়গা একদম ফাঁকা। একদিন সূর্য অস্ত গেছে, ফিরে আসছি, একজন গ্রাম্য ধরণের দেখতে লোক আমায় বললেন, এভাবে একা একা ঘুরে বেড়িও না, বিপদ হতে পারে। বললাম, বিপদ তো আমার হবে, আপনার তাতে কি? আমার ইচ্ছে আমি ঘুরে বেড়াব। বেচারা লোকটা নিতান্ত ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে চলে গেল। আমার অবশ্য অত বড় বয়সেও বিপদের কোনো ধারণা ছিল না, এটা ঠিক।

একবছর বিষ্ণুপুরে থাকতে হস্টেলের খাবার আমার ভালোলাগত না। অধিকাংশ দিনই রাতে খেতাম না। এক বন্ধু অনেক সাধাসাধি করে একেকদিন খাওয়াতো। অধিকাংশ দিন তাকে বলতাম আমি খাব না, থালাটা ছুঁড়ে ফেলে দে, আমার ইচ্ছে। হস্টেলের পিছনের দিকে মাঠ, ঝোপঝাড় আর অনেক ভাঙ্গা ভাঙ্গা মন্দির ছিল। ওখানে যাওয়া বিশেষ করে বিকেলের দিকে হস্টেলের নিয়ম ছিল না। অতএব অধিকাংশ দিন ওইখানেই যেতাম আমরা দুই বন্ধুতে। একেকদিন ধরা পড়লে বলতাম, ইচ্ছে হয়েছিল।

নাহ্‌, কোনোদিন ইচ্ছের জন্য মিথ্যে কথা বলিনি কাউকেই। মিথ্যে বলতে আমার খুব বিরক্ত লাগে, একটুও ইচ্ছে করে না।

কলকাতায় হস্টেলে অসম্ভব কড়া নিয়ম ছিল। হস্টেল থেকে বেরোতে হলে হাজার রকমের সই-সাবুদ, পাস...। যারা বেচারা প্রেম করত বড্ড ঝঞ্ঝাটে পড়ত। হস্টেল থেকে পাঁচজন ছাড়া বেরোনো যেত না। এইসব প্রেমিকাদের আমি বিভিন্ন সময়ে সাহায্য করেছি, কখনো দারোয়ানকে রোল আনতে দিয়ে সরিয়ে দিয়ে, কখনোবা পঞ্চম ব্যক্তি হিসেবে সঙ্গ দিয়ে। আসলে ওই চাপিয়ে দেওয়া নিয়ম আমার অসহ্য লাগত। হস্টেলের ভিতরেও নিয়ম ভেঙ্গেছি কখনও। আমার ওপর কিছু চাপিয়ে দিলেই আমি সেটা ঠিক কোথাও না কোথাও নামিয়ে রেখে আসি। নিজেও একই কাজ না করতে চেষ্টা করি তবে মাঝেমধ্যে ইচ্ছে বেগড়বাই করে। যাইহোক একবার ব্রাহ্মসমাজের এক অনুষ্ঠানে হস্টেল থেকে সব্বাইকে যেতে হল। ওখানে পৌঁছনোর পর চারজন প্রেমিকা এসে আমায় বলল তারা পালাতে চায়, দলে একজন কম পড়েছে। আমি বললাম চল, আমারও বোর লাগছে। কিছুটা দূরে তাদের প্রেমিকেরা অপেক্ষা করছিল। সবাই মিলে সল্টলেকের একটা পার্কে গিয়েছিলাম মনে আছে। ওরা প্রেম করছিল আর আমি দুপুরবেলায় রোদের মধ্যে দোলনায় দুলে দুলে একা একাই বকবক করছিলাম আর গান করছিলাম। ভাগ্যিস আর কেউ ছিল না। কিন্তু বেলা যত বাড়তে লাগল ওদের এই ঘোর প্রেমের ইচ্ছেতে আমার মাথা গরম হতে লাগল। না ওদের কাছে যাওয়া যায়, না দূর থেকে ডাকলে সাড়া দেয় – সে এক কেলেঙ্কারী কাণ্ড। শেষে অনেক কষ্টে সব কটাকে গুছিয়ে যখন আনতে পারলাম তখন অনুষ্ঠান শেষ, টিফিন দেওয়ার লাইন পড়েছে। সুড়ুৎ করে লাইনে ঢুকে গেলাম। তারপরে অন্যদের সঙ্গে দিব্য তাল মিলিয়ে আলোচনা অমুকের গান কিম্বা বক্তৃতা...। না দেখলে-শুনলে কী হবে সে ম্যানেজ করা যায় একটু ইচ্ছে থাকলেই। তবে ওদেরকে শাসিয়ে ছিলাম বাব্বা তোদের সঙ্গে আর নয়, হয়েছিল আর কী!

এরপরে ওই হস্টেল ছেড়ে দিই। সেই ইচ্ছে। প্রাইভেট হস্টেলে থাকার সময় টিফিন খাওয়ার পয়সা থাকত না অধিকাংশ দিনই, ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও কেন জানি টিউশনি জোগাড় করতে পারিনি। আসলে ভীষণ ইন্ট্রোভার্ট আর আনস্মার্ট ছিলাম। কিন্তু ওইসময় কলকাতার রাস্তায় রাস্তায় একা হেঁটেছি অনেক সময়, বেশ লাগত।

এই হস্টেলে থাকার সময়েই একদিন মৌসুমীদির বাড়িতে গিয়েছিলাম। সেও আর এক অদ্ভুত মেয়ে ছিল। ওর ওপর আমার একটাই রাগ ছিল, তখন আমার গোটা দুয়েক সালোয়ার কামিজ আর দুটো-তিনটে শাড়ি ছিল। ওই সালোয়ার কামিজ দুটোই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে কলেজে পড়ে যেতাম। আর মাঝে মাঝেই তার একটা পড়ে ও অদৃশ্য হত এবং কয়েকদিন বাদে না কেচে ফেরত দিয়ে যেত। খুব রাগ হলেও বুঝেছিলাম এই রকমই। মানে এটা ওর ইচ্ছের মধ্যে পড়ে। আমার রুমের আরেকটি মেয়ে রবীন্দ্রভারতীতে পড়ত। তার ইমিটেশন দুল পড়লেই কানে ইনফেকশন হয়ে ফুলে যা তা কাণ্ড হত। প্রতিবার কাঁদতে শুরু করত আর আমাকে গরম জল তুলো দিয়ে পরিস্কার করে ওষুধ লাগিয়ে সেটা ম্যানেজ করতে হত। সেটাও ওর ইচ্ছে বুঝে পরের দিকে বকুনি দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছিলাম।

একদিন সন্ধ্যেবেলায় মৌসুমীদি এসে বলল, চল আমাদের বাড়ি যাবি। মনটা নেচে উঠল ইচ্ছেয়। বললাম চলো। এর আগে বিষ্ণুপুরে থাকতে একবার এক রুমমেটের বাড়ি গিয়েছিলাম রুমের সবাই মিলে। তার নাম ছিল মল্লিকা। বাড়ি ছিল মেদিনীপুরের কোথাও একটা। পিঠের সময় নিয়ে গিয়েছিল। নানা রকম পিঠে খেয়েছিলাম ওদের বাড়িতে আর খিচুড়ি-ইলিশ মাছ। তখন তো বাড়িতে ফোনও নেই। একটা পোস্টকার্ড ছেড়ে দিয়ে রওনা। এবারে সে সময়ও নেই, কারণ ইচ্ছে জেগেছে। মৌসুমীদি বলল, চল, এইসময় আমাদের ওখানে বড় মেলা বসে। তা চেপে বসলাম ট্রেনে, ভাবলাম ফিরে এসে বাড়িতে বলা যাবেখন। মুড়াগাছা লোকালের নাম শুনেছি ঢের, এবারে গন্তব্য সেই মুড়াগাছাই। রাতের ট্রেন কেমন হু হু হাওয়া, বাইরে ভরা জ্যোৎস্না। স্টেশনে নেমে দেখি জ্যোৎস্নায় ভেসে যাচ্ছে চারদিক। রাস্তার পাশে বড় বড় গাছ, ছায়া এসে পড়ছে পথে। ওরই মাঝে নির্জন রাত্তিরে রিক্সায়। সেদিন অনেক রাত পর্যন্ত ওদের বাড়ির ছাতে পরিপূর্ণ জ্যোৎস্নায় বসেছিলাম। কে জানে কোথায় আজ মৌসুমীদি, মাঝে মাঝেই ওকে মনে পড়ে আমার, আর সেই জ্যোৎস্না রাত।

এই হস্টেলেই আরেকটা মেয়ে ছিল, মেমসাহেবের মত দেখতে, ওকে আমরা ডাকতাম নেড়ু বলে। নাম ছিল শর্মিষ্ঠা, চুলগুলো পিক্সিকাট করা সেইসময়ে। ওর সঙ্গেও কলকাতায় ঘুরে বেরিয়েছি আমি অনেকদিন। সবচেয়ে মনে পড়ে বেশ গভীর রাতে একদিন সল্টলেক থেকে ফিরছিলাম। চারদিক নিঃশব্দ, অন্ধকার।

মাঝে মাঝে ভাবি কোথায় গেল মল্লিকা, নিবেদিতা, ফুলকি, মৌসুমীদি, শর্মিষ্ঠার মতো কেউ কেউ। কোথায় গেল বাংলাদেশের মেয়ে শম্পা? সাধারণ মেয়েটা একটা বড়লোকের ছেলেকে ভালোবেসেছিল। কিন্তু কাহিনির শেষটা আর জানতে পারিনি। কোথায় গেল তারা যারা কখনো না কখনো আমার ইচ্ছের সঙ্গী হয়েছিল? আর ইচ্ছেগুলো, তারাও কি একইরকম আছে?

আমি জানি ইচ্ছে মানে অনেকসময়েই কিছুটা দায়িত্বজ্ঞানহীনতা, ইচ্ছে মানে অনেকসময় আত্মকেন্দ্রিকতাও।

ইচ্ছে মতো ইচ্ছে করা যায় না অনেকসময়, ইচ্ছেমতোই করা যায় না অনেকসময়।

তবু ইচ্ছেরা থাকে। থেকেই যায়। আমার মতো কেউ কেউ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ইচ্ছে পূরণ করে কখনও।

আর অনেক মানুষ যখন একসঙ্গে বৃহত্তর ইচ্ছেপূরণ করে তখন তার নাম হয় বিপ্লব বা দিনবদল।


কিন্তু সেই ইচ্ছেগুলোও অধিকাংশ সময়ে ইচ্ছে হয়েই রয়ে যায়।