সবার একটা করে গল্প থাকে, সব্বার। ওই যে
বুড়ো ট্রাম ড্রাইভারটা ক্রসিংয়ে ট্রামটা দাঁড়ালেই মাঝের দরজা দিয়ে এসে সামনের সিটটায়
বসে পড়ছে, ওর ক্লান্ত মুখের ভাঁজে ভাঁজে কোথাও একটা আলগা সুখ-দু:খের কাহিনি লেগে রয়েছে
যেন। ভাগ্যিস সামনের সিটটায় বসিনি। ইস, রোজ সারারাস্তা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ট্রাম চালাতে
হয়। মোটাসোটা কনডাক্টরটারও বয়স হয়েছে। শ্যামবাজার পাঁচমাথার মোড়ের ক্রসিংয়ে রাস্তায়
দাঁড়িয়ে কী কথা বলে যায় ড্রাইভারের সঙ্গে। ওর কথা বলার ধরণটার মধ্যেও যেন একটা গল্প
আড়মোড়া ভাঙে।
ট্রাম চলে টুং টাং সুর তুলে। জানলার ধারে
বসে দেখতে দেখতে যাই। পুরোনো ইমারতের ইট-কাঠে, বড় বড় গাছেদের পাতায় পাতায় কত না গল্প
লেগে আছে। রাস্তায়, বাসের চাকার দাগে বয়ে চলে কাহিনিরা।
ওই যে লোকটা ছাতা মাথায় দিয়ে আপনমনে হাসতে
হাসতে আসছে গল্পটা ওর হাসিতে আছে না পুরোনো ছাতার গায়ে তা আমার জানা হবেনা কোনোদিনও।
পথের ধারের দোকান থেকে খাবার খেয়ে আলগোছে জল খায় বউটি, চেহারা-পোশাক দেখে খুব সাধারণ
ঘরেরই মনে হয়। ওই তো আরেকজন হাঁটতে হাঁটতে হসপিটালের গেট দিয়ে বেরিয়ে আসছে, সুখ-দু:খ
কিছুরই আভাস নেই মুখে। অথচ এদেরও আঁচলের খুঁট খুললে ঠিক কিছু না কিছু গল্প মিলবে, মিলবেই।
আর ওই যে ঠেলাওলা তার বোঝাখানি ঠেলার ওপর চড়িয়ে আস্তে আস্তে ব্রিজ পেরোচ্ছে, ঘাম গড়িয়ে
নামছে কপাল বেয়ে, ওর ওই ঠেলায় শুধুই কি আর দরকারি জিনিস আছে, একটা নিতান্ত অপ্রয়োজনীয়
গল্পও কি লুকিয়ে নেই কোথাও?
শেষ স্টপেজ এসে গেছে প্রায়। জানলা দিয়ে
ফিরে দেখি, রাস্তার ধারে পিছনে পড়ে রইল ফলওলারা, তাদের ঝুড়ি বোঝাই টক-মিষ্টি গল্প নিয়ে।
কনডাক্টর তাড়া দেয়। আমি কাঁধে ব্যাগ, হাতে মেয়ের বইয়ের প্যাকেট আর মাথায় একরাশ গল্প
নিয়ে আবার পথে নেমে পড়ি।
No comments:
Post a Comment