Monday, April 4, 2016

আশীর্বাদ

মানুষের দীর্ঘায়ু কামনা করে না আজ আর কেউ।

সেতুরা দীর্ঘজীবী হোক। দীর্ঘজীবী হোক কোনমতে তৈরি হল যেসব রাস্তা ও ফুটপাত। দীর্ঘজীবী হোক পথের আলো, বাসস্ট্যান্ড, এবং অগভীর অন্তর্লীন ড্রেনের মতো আমাদের যাবতীয় উন্নয়ন।


এইসব দীর্ঘজীবী হলে, তুমি-আমি খুচরো মানুষেরা আরও কিছুদিন টিঁকে যাব। এইসব দীর্ঘজীবী হলে, আরও কিছুকাল আমাদের রক্ত বা সামান্য ক্ষতিপূরণের কোনও প্রয়োজন হবে না।

Sunday, April 3, 2016

ছন্দপতন

সবেতেই ছন্দ থাকে। ঠিক ঢাকা ঠিক বোতলের মাথায় না লাগলে ছন্দ কাটে। ছন্দ ভাঙে তরকারির পাত্রের ঠিক ঢাকাটা ঠিক পাত্রের ওপর না বসলেও। ছন্দ কাটলে মাথার মধ্যে বিষম কষ্ট হয়। তখন অন্য সব বোতল হাতড়ে কী রান্নাঘর, ফ্রিজের তাকে তাকে ছন্দ খুঁজে বেড়াতে হয়। বই পড়া আর ওষুধ খাওয়া পাশাপাশি চলায় মনের ভুলে পেজমার্কের বদলে বইয়ের পাতায় ঢুকিয়ে দিই ওষুধের খালি ফয়েল। মেয়ে রেগে যায় ভীষণ। আমি বুঝতে পারি ওর মাথার মধ্যে ছন্দপতন ঘটছে। খালি ফয়েল ফেলে পেজমার্ক দিই। খুশি হয়ে ওঠে সে। নিমপাতার সঙ্গে মাংসের কী ছন্দ মেলে জানিনা, কিন্তু আমার তেঁতো প্রিয় হলেও ও এভাবেই না ভালোলাগাটা মেলাতে চেষ্টা করে। যেমন, চুলের সঙ্গে চিরুনির ছন্দটা ও কিছুতেই মেলাতে পারেনা বলে মা রাগ করলে বাতাসে রুক্ষ্ম চুল ওড়ে, নাহলে মায়ের হাতে সযত্নলালিত হয়।


জীবনের ছন্দ নিয়ে লিখতে থাকলে এই লেখাটা অনন্ত হতে পারত। কিন্তু আমি তো লিখছিলাম ছন্দপতন নিয়ে। মাথার মধ্যে মাঝে মাঝেই একটা তীব্র অস্থিরতা কষ্ট দিতে থাকি। ঠিক বুঝি ছন্দ ভাঙছে, চুরমার হয়ে যাচ্ছে মস্তিষ্কের কোষে কোষে। কোথায় যে ভাঙছে, ঠিক কোনখানে তা আর খুঁজে পাইনা। সেই না খুঁজে পাওয়ার অস্বস্তি ছড়িয়ে পড়ে সমস্ত অস্তিত্ব জুড়ে। আমি হাতড়ে বেড়াই জীবনের আদিগন্তে।

পণ্য?

জীবন সস্তা হয়েছে খুব, আরও সস্তা বিকোচ্ছে কবিতা। বর্ণমালারা খুন হয়ে গেলে কলরব হয়না কোথাও। রক্তপাতে হাহাকার, ক্ষতিপূরণ সব বাতুলতা। খোলা বাজারেই বুক, উরু, নিতম্ব মাপমতো পাওয়া যাবে ঠিক গরম প্রতিবাদী, মিয়ানো প্রেম অথবা মুচমুচে পরকীয়া। কবিতার পোশাক পাল্টায় যারা, রঙ, জাত, আরও অন্যকিছু - তাদের সাদা খাতায় মৃত শব্দের সারি দেখে হাততালি দেয় অনুগতেরা। কবিতা লিখিনা আমি, শব্দের বেচাকেনা ঘৃণা করে থাকি। অথচ জীবন মানে কবিতাই জন্মাবধি জানি। কবিতার মানে জানি হৃদয়ে অনন্ত রক্তক্ষরণ। 

Saturday, April 2, 2016

সাংবাদিকতা

অল্পবয়স থেকে ডাক্তারি এবং সাংবাদিকতা এই দুটো পেশাই আমার খুব ভালোলাগত। এখনও লাগে। এই দুটো পেশাতেই চাইলে অনেক মানুষের কাছে পৌঁছে যাওয়া যায়, মানুষের উপকারেও লাগা যায়। একটু দেরিতে হলেও সাংবাদিকতা পেশায় এসে আমার ভালোলেগেছে।

লেখালেখি করতে পারলে বা ক্যামেরার সামনে দু-একটা বাইট দিতে পারলেই সাংবাদিক হওয়া যায় না। যেকোনও জায়গায়, যে কোনও পরিস্থিতিতে হাজির হয়ে খবর সংগ্রহ করার মানসিকতা থাকা দরকার। দরকার বিভিন্ন বিষয়ে ওয়াকিবহাল হওয়া। তবে সবথেকে বড় যোগ্যতা বোধহয় নিস্পৃহতা। যাঁরা খবর দেখেন তাঁরা জানেননা যে সাংবাদিকদের এই নিস্পৃহতা অর্জন করতে কতখানি মানসিক জোর লাগে। বুঝতে পারেননা যে এটাই এই কাজের অঙ্গ। একজন সাংবাদিক যদি কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে নিজেই বিচলিত হয়ে পড়েন তাহলে তিনি খবরটা প্রচার করবেন কী করে? আসলে সাংবাদিকতা পেশাটা ঠিক সকলের জন্য নয়। আরও একটা জরুরি বিষয় হল, মিডিয়ার অধিকাংশই স্পষ্টভাবে নাহয় অস্পষ্টভাবে কোনও না কোনও রাজনৈতিক মতালম্বী অথবা সহজভাবে বলা যায় প্রত্যেক মিডিয়ারই নিজস্ব কিছু নীতি আছে। প্রত্যেক মানুষেরও নিজস্ব রাজনৈতিক-সামাজিক ভাবনা থাকে। অনেকসময়েই কাজের নীতির সঙ্গে ব্যক্তিগত নীতি না মিললেও কাজের স্বার্থে তাকে আপোষ করে চলতে হয়। এমন কী যে মিডিয়ার সঙ্গে সে যুক্ত তার কার্যকলাপের জন্য সমালোচনাও শুনতে হয়। এইসবই তার কাজের অঙ্গ। সব পেশাতেই ভালো-খারাপ মানুষ থাকেন। সাংবাদিকতাও তার ব্যতিক্রম নয়। কিন্তু যেমন কোনও ডাক্তারের দুস্কর্মের জন্য ডাক্তারি পেশাটা খারাপ হয়ে যায় না, ঠিক তেমনি কোনও সাংবাদিকের সমালোচনাযোগ্য কাজের জন্য সাংবাদিকতা পেশাটা খারাপ হয়ে যায় না।


সত্যি বলতে কী আমি মাঝেমধ্যে ছাত্র পড়িয়েছি। ছাত্রছাত্রীদের ভালোবাসা পেলেও শিক্ষকতা বা অন্য কোনও পেশার কথা সেভাবে ভাবতে পারিনি। একসময়ে সরকারি চাকরির চেষ্টা করেছিলাম। তখনও মাথায় ছিল, চাকরি পেলেও লেখালেখি, ফ্রিল্যান্স করে যাব। আমার মনে হয় খুব না ভালোবেসে কারোর এই পেশায় আসা উচিত নয়। একজন সাংবাদিকের কাজ ঘরে বসে সমালোচনা করা খুব সহজ। সাংবাদিক হয়ে ওঠাটা কঠিন।

Friday, April 1, 2016

সেফ?

চারদিকে লাসের মিছিল এরাও মানুষ ছিল। থেঁতলে যাওয়া হাত-পা-মাথা, টুকরো টুকরো শরীর...। সনাক্তকরণে ওরা আমাদের বাপ-মা, ভাই-বোন। পুড়ে যাওয়া কয়লার পিণ্ডের মতো  শুয়ে আছে সন্তানেরা। এরপর আমাকে তোমরা ভালো থাকতে বোলো না; বোলো না সুখে, শান্তিতে এবং নিরাপদে দিন কাটাতে।

বুলেটের শব্দ, বিস্ফোরণের ধ্বনি-প্রতিধ্বনি মাথার ভেতরে, রক্ত আর চোখের জলের নোনতা স্বাদ অনুভবের সবটুকু জুড়ে; পোড়া মাংসের গন্ধে শ্বাস বন্ধ হয়ে আসতে আসতে আমাকে আর যাইহোক ভালো থাকতে বোলো না।

কিছুক্ষণ বিষন্নতায় ডুবে যেতে দাও, নিজের মুখোমুখি আরও গভীরে। কিছুই পারছিনা যখন। কলম ছাড়া আর কোনও শানিত অস্ত্র নেই আমার হাতে। তাই নিরুপায়ের মতোই লিখে যাই, শাস্তি হোক, শাস্তি হোক। অথচ কে কাকে শাস্তি দেয়? চিরকাল ক্ষমতারা বীণাই বাজায়। আমাদেরই রক্ত-ঘামে গড়ে ওঠা সাম্রাজ্যে আমরাই দোষী সাব্যস্ত হই, এটাই নিয়ম।

আগামীকাল আমার টুকরো টুকরো লাস যখন বয়ে নিয়ে যাবে, কী ভীষণ ব্যঙ্গের মতো তোমাদের কানে বাজবে এই ভালো থেকো-র বর্ণমালা - আজকের দিনটায় বেঁচে যাওয়ার চরম ঠাট্টার মতো। 
নাহয় ভালো থাকতে পারলামই না আজীবন, সাবধানে, সুখে, শান্তিতে। কিছুই তো পারলাম না। শুধু সেই কবে থেকে বোকা এক মানুষের মতো ভালোবাসা খুঁজে ফিরি। লোভ ও ঘৃণার বিরুদ্ধে আমাদের শেষ হাতিয়ার।





আপত্তিকর?

গতকাল ফেসবুকে ভেসে আসা একটা পোস্টে দেখলাম নাইজেরিয়ায় কে বা কারা ৮৬ জন শিশুকে পুড়িয়ে মেরেছে। নিউ ইয়র্ক, প্যারিস, লন্ডন হলে সারা দুনিয়ায় তোলপাড় পড়ে যেত। 

সার দিয়ে শুয়ে থাকা পোড়া মৃতদেহগুলোর দিকে তাকিয়ে বেঁচে থাকাটা কেমন অর্থহীন ঠেকছিল। 

আর ঠিক সেইসময় ফেসবুক আমায় প্রশ্ন করল যে, ছবিটি ভয়ঙ্কর ধরণের কিছু, আমি তা সরিয়ে দিতে চাই কিনা? এর আগে মাঝেমধ্যে সত্যিকারের কুৎসিত কোনও ছবি বা বিষয় আমি ফেসবুকের কাছে রিপোর্ট করে দেখেছি তারা খুব চটজলদি জবাব দিয়েছে যে পোস্টটিতে আপত্তিকর কিছুই তারা পায়নি।

আমার সন্তানেরা কোথাও আজ সেফ নেই। আমি কী করে সেফ থাকব?

টুকরো ভাবনা

কে সেফ, কেন সেফ?
আমার মেয়ে রোজ কলকাতার একপ্রান্ত থেকে আরেকপ্রান্ত স্কুলে যায়। সে যতক্ষণ না ফেরে নিজেকে সেফ লাগেনা। বাড়ির কেউ এমন কী নিজেও যখন রাস্তায় বেরোই তখন তারা ফিরে আসবে বা নিজেই ফিরে আসব কিনা তার কোনও নিশ্চয়তা দেখিনা। এমন কি বাড়ির ভেতরেও আমরা সত্যি সেফ কি? যে হারে খুন, ধর্ষণ, বোমা বিস্ফোরণ, দুর্ঘটনার সংখ্যা বেড়েই চলেছে তাতে আজ বেঁচে আছি বলে আমি বা আমরা নিজেকে বা নিজেদের সেফ ভাবতে পারিনা। এমন কী অন্যকে নিশ্চয়তা দিতেও না।

দোষী!
শেষপর্যন্ত সব দোষ হয় বেচারা ঈশ্বরের, কারণ তিনি নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করার জন্য আবির্ভূত হতে পারেননা বলে। ধরে নেওয়া হয় মানুষকে তিনি সৃষ্টি করেছেন। অতএব মনুষ্যসৃষ্ট যাবতীয় ঘটনা ও দুর্ঘটনার দায় তাঁর।
রাজ্য সরকার দোষীদের শাস্তি দেবেন বলছেন। ঈশ্বরকে পাবেন কি?

বোধহয় এইজন্যই কখনও প্রকৃত দোষীদের শাস্তি হয়না। ক্ষমতাবান আর ঈশ্বর বোধহয় এইখানে সমার্থক হয়ে যায়।

ব্লাড সুগার থাকায় রক্ত দিতে পারিনা, এই ব্যাপারটা মাঝে মাঝেই আমাকে খুব যন্ত্রণায় ফেলে।