Monday, May 2, 2016

ঈশ্বর

যদি ঈশ্বর হও, এসো হাত ধর আমাদের এখনও অনেকটা পথ হাঁটতে হবে। খুব ক্লান্ত, অবসন্ন হলেও এখনও অনেকটা পথ বাকি আছে। এসো হাত ধর  নরক না স্বর্গ কোন দিকে নিয়ে যাবে, সে একান্তই তোমারই ইচ্ছে। সে পথে শত্রুর আঘাত আমাকে খণ্ড খণ্ড করবে কিনা অথবা বন্ধুর হৃদয় জুড়ে দেবে সব ভাঙাচোরা, তা পছন্দের ভারও তোমার ওপরেই ছেড়ে দিলাম।

যদি ঈশ্বর হও, এসো, হাত ধর।

Sunday, May 1, 2016

ছন্দ

যাকে নির্মাণ করেছিলাম কলমের কালি আর শব্দ দিয়ে, অনেক অনেক শব্দের ভিড়ে কোথায় যেন হারিয়ে গেল। জীবনের বাঁকে যেমন হারিয়ে যায় ছেলেবেলার স্মৃতি অথবা ঝমঝমিয়ে নামার আগে হাওয়ার টানে যে ফোঁটাটা মিলিয়ে গিয়েছিল রুক্ষ ঠোঁটের ওপর।

খুঁজছি যেমন করে নিজের ছায়া অথবা প্রতিধ্বনিকে খুঁজে ফেরা যায়।

কিছুতেই আর ছন্দ মিলছে না।

এক একটা দিন

একেকটা দিন খুব নস্টালজিক হয়। যখন সেই দিনটার সঙ্গে কিছু স্মৃতি জুড়ে থাকে। স্মৃতিরা আসলে পড়া হয়ে যাওয়া পুরোনো বইয়ের মতো। মাঝে মাঝে আবার উলটে পালটে পড়া। কোনও পাতায় বুকমার্ক দেওয়া থাকে। কিছু পাতা আবার কখনওই পড়তে ইচ্ছে করে না আর।

একেকটা দিন খুব নস্টালজিক হয়। যখন তার সঙ্গে কিছু গান জুড়ে থাকে। কিছুটা ছোটবেলা। হেমাঙ্গ বিশ্বাস, ক্যালকাটা ইয়ুথ কয়ার। টেপ বাজে সকাল-দুপুরে। অথবা মায়ের উদাত্ত গলা। আমরাও গলা মেলাই নাম তার ছিল জন হেনরী...। জন হেনরীর পাথর ভাঙার ছবি গানের শব্দ আর সুরে চোখের সামনে স্পষ্ট হয়। মেরী ম্যাকডালিনের দুঃখে ছোট্ট বুকের ভেতরটা থমথম করে। একদম শেষে পৌঁছে বাবা তার আসবে না, আর না..., মা যখন একটু গলাটা ভেঙে দিয়ে হায়, হায়, হায়, হায়... টানটা দেয়, তখন সেই থমথমটা চোখ দিয়ে গড়িয়ে আসে যেন।

বড় হয়ে সুমনের প্রথম দিককার সেই সব গানগুলোর পরেই বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কবিতার গানের কথাগুলো ঠিক তেমনভাবেই নাড়া দিয়েছিল, পাথরে পাথরে নাচে আগুন। অনেকদিন পর অন্যরকম সুরে সুমনের গলায় শুনলাম জন হেনরী

গান বেঁচে থাকবে। সুর হয়তো বদল হবে কখনও, নতুন এক্সপেরিমেন্ট হবে। কিন্তু এই গানে যে দিন বদলের সুর থাকে তার অর্থ কেবল সুমনের একটি গানেই প্রতিধ্বনিত হতেই থাকে, আমি গান গাইলাম...যা ছিল আগের মতো রয়ে গেল...।

তবু গান তো গাইতেই হবে...

খুঁজি কোথায় কৃষ্ণচূড়ার একটি কুঁড়ি পাঁপড়ি মেলে...

ছবিটি

কথারা সব ঘুমে জড়িয়ে আসে। মাথার মধ্যে ঝিমঝিম নূপুর বাজে। শব্দগুলো ভাসতে থাকে সাদা-কালো থেকে জলরঙে।

চোখের পাতায় লেগে থাকে জলকুচি...।

রাতের মায়া আদর মাখতে মাখতে শব্দরঙা কাব্যবালিকা হারিয়ে যায় পাগলের প্রলাপ আঁকা বনে।


থাকে শুধু মুখোমুখি বসিবার...

রোজ তার সঙ্গে কথা বলি, কথোপকথনই বলা যায়। দিনরাত্তির। বিষয় থেকে বিষয়ান্তরে চলে যাই প্রতি মুহূর্তে। আজ, আগামীকাল, এই সময় অথবা ভালোবাসা, খুব গরম, ব্যথা করছে অথবা আরও যে কোনও কিছুই। অধিকাংশ সময়েই মতে মেলে না, বিস্তর কথা কাটাকাটি চলে। একেকদিন আবার দিব্য ভাব। যখন পুরোনো দিনের গল্প করতে করতে আমরা হস্টেলে বসে অমলেটের গন্ধ পাই অথবা জন্মদিনে মায়ের হাতের পায়েসের। মে দিন কী রবীন্দ্রনাথের জন্মদিনে ছোটবেলায় মায়ের সঙ্গে গাওয়া গানের কথা মনে পড়ে যায়। একসঙ্গে গলা মেলাই যখন আনমনে তখনও। অথবা ফ্রিজ থেকে খানিকটা দুধ, কী আধভাঙা একটা সন্দেশ মুখে পুড়ে দিই তখনও আমরা হয়ত একমত। হয়ত কথাটা বলা এইজন্যই যে সন্দেশের ক্ষেত্রে একটা দ্বন্দের অবকাশ থাকে বৈকি। একমাত্র কাজ করার সময় টের পাইনা সে কী করে। বোধহয় কাজ। কবিতা লেখার সময় আমার আগে আগে ফস ফস করে শব্দগুলো বলতে থাকে। যত বলি, দাঁড়া একটু ভাবছি...।

একেকদিন শরীরটা বেশ ভালো ঠেকে। বলি এই দ্যাখ কেমন আজকে তোর বলার আগেই কত কিছু করে ফেললাম। ভারী খুশি হয় সে। একদম অমলিন খুশি। তবে শরীর ভালো থাকলে তার দেখা কম পাওয়া যায়। আজকাল একটু কিছুক্ষণ কাজ করলেই খুব কষ্ট হয়। একেকদিন মাথা ঘোরে, একেকদিন অন্যকিছু। রাস্তায় আসতে আসতে বলি, দূর ভাবতে পারিস, বছর দুয়েক আগেও আমি...। অম্লানবদনে বলে, কী মুশকিল, এখনও তো পারছিস, এখনও। স্রেফ এইটা মনে রাখ। আগের দিনগুলো নেই, কেটে গেছে। একেকসময় কিচ্ছু করতে ইচ্ছে করেনা, ঝিমোতে থাকি, আমায় নাড়া দিয়ে বলে, লেখ, বলি, না। ফের নাড়া দিয়ে বলে, তাহলে একটু হা-পা নাড়া, ব্যায়াম কর, তাও বলি না। শেষে রেগে গিয়ে বলে, দূর ঘুমা তাহলে, আমি চললাম। কী আর করি ঢুলতে ঢুলতে কিছু একটা করতে শুরু করে দিই, যতক্ষন না পুরোপুরি ঘুমিয়ে পড়ছি। ঘুম ভেঙে দেখি হাত আড়ষ্ট, গায়ে ব্যথা। বলি, নড়তে পারছিনা। বলে, আরে ওঠ, ওঠ নড়তে পারছিনা বললে হবে? তোর এই ওজন নাড়াবে কে? ব্যাজার মুখে উঠি। ছুটির দিন হলে ঝগড়া করে শুয়ে থাকি, চিৎকার করে বলি, উঠব না উঠব না, বিচ্ছিরি পৃথিবীটা। সে বলে, পৃথিবীর তো আর খেয়ে দেয়ে কাজ নেই যে বিচ্ছিরি হবে, আসলে তোর না ওঠার ফন্দি। যতই বলি, চুপ। মুখের ওপর হাসে। এই হাসাটাই ওর বড় বাজে স্বভাব ছোট থেকে। অনেকবার বলেছি হাসিস না, একদম বাজে স্বভাব তোর। তবু শেষপর্যন্ত সবেতেই হাসবে। এবং আমাকেও হাসাবে।

অল্পবয়সে যখন আমার কোনও বন্ধু ছিল না, তখন একবার চিঠি লিখেছিলাম ওকে। এখনও লিখি মনে মনে, রোজ।

খুব একা লাগলে, ডাকি, ডেকেই যাই, আয়, আয়, আয়...
ব্যস, আর কোনও সাড়া নেই।
মনের মধ্যে কেবল সেই ডাক একটা কক্ষ থেকে আরেকটা কক্ষে ধাক্কা খেতে খেতে ফিরে আসে।


আর এই আমিটা চুপ করে অপেক্ষা করে থাকি, কখন আবার সেই আমিটা ফিরে আসবে...।

মেঘদূত

বেদনারা অলক্ষিতে কখন ভালোবাসার সীমানা পেরিয়ে যায়। মেঘ জমে রামগিরি শিখর চূড়ায়। 
বৃষ্টি পড়ে না।
রুক্ষতার ফাটল শুধু একা একা বাড়ে।

ঈশ্বর

আরও আরও অন্ধকারের দিকে হাঁটতে হাঁটতে চলেছি, পরস্পরের থেকে দূরে আরও দূরে, যতদূর বিস্তৃত হতে পারে ঘৃণার দীর্ঘ করতল। বদলে যাচ্ছি ভিন্ন ভিন্ন অচেনা দ্বীপে। যে দ্বীপে কোথাও কোনো ঘাস অথবা আলো নেই। নেই কোনো সুপেয় ধারা। রুক্ষ বেলাভূমি ছুঁয়ে শুধু বারবার ফিরে যায় লোনা জল। আমাদেরও গহনে লোনা জল বাড়তে থাকে প্রতিদিন। বাড়তে বাড়তে একদিন সেও মাথা ছাড়িয়ে যায়।


আরও আরও অন্ধকারের দিকে হাঁটতে হাঁটতে আমরা সকলেই একে একে হাতে তুলে নিচ্ছি কুঠার। এভাবেই যাবতীয় ধর্মীয় বিপক্ষ নির্মূল করেছিল পরশুরাম। এভাবেই পরস্পর হত্যা করতে করতে শেষ হয়েছিল যদুকূল। সেই হত্যালীলা যে দেখেছিল একমাত্র, আশ্চর্য তারই নাম নাকি ঈশ্বর!