Sunday, September 13, 2015

অসুখ

তোমার অসুখ করলে
বাড়িটা কেমন একটা নিস্তব্ধ হয়ে যায়।
যেন, ছেলেবেলায় সেই মায়ের অসুখের মত।
অনেক বেলা পর্যন্ত শুয়ে আছ তুমি,
বোজা চোখের নীচে একরাশ ক্লান্তি।
যেন মা আজ ভাত রাঁধতে পারেনি।
যেন পৃথিবীটাই থেমে গেছে খানিকক্ষণের জন্য।
চিন্তা করলে মায়ের মতই ধমক দিয়ে ওঠো,
কিচ্ছু হয়নি আমার, তুই পড়তে যা।
আমি তো করেই যাই আমার যা যা অকাজ।
ওরই মাঝে মার আশেপাশে ঘুরঘুর করি,
ওই তো ঊঠে বসেছে মা, ওই তো হাসছে।
অথবা তোমার আশেপাশে...।
বোধহয় পৃথিবীতে কারো কারো অসুস্থতা
অন্য কাউকে কাউকে এমনি অসহায় করে তোলে।

আর তাই প্রার্থনা করতে থাকি, তাড়াতাড়ি সেরে ওঠো তুমি।

Saturday, September 12, 2015

ফিনিক্সের জন্ম

কবিতা যদি না হতে পারিস,
হয়ে যা ক্ষুধার অন্ন।
না যদি হতে পারিস প্রতিবাদের গান,
ক্ষতি নেই, চোখের জল হোস মানুষের।

আর যদি কিচ্ছু না হতে পারিস
অনেকটা বেহিসাবী আগুন হয়ে যা।
পুড়িয়ে দে সামনে যা পাবি -
লোভ, হিংসা, হয়তো ভালোবাসাও।

তোর-আমার সেই ছাই থেকে ঠিক একদিন ফিনিক্স জন্ম নেবে দেখিস।

কোমলগান্ধার

অনেক অনেকদিন পর কোমলগান্ধার দেখছিলাম। তিনটে প্যারাসিটামল, কোমলগান্ধার, এবং রাত জেগে লেখা।

আসলে অনেকদিন ধরেই কিচ্ছু ভালোলাগছেনা। এই দেশ, ওই দেশ, এই রাজ্য, এই রাজনীতি, এই ক্রিপলড বেঁচে থাকা।

সাতচল্লিশের দেশভাগে আমরা ফেলে এসেছিলাম সেই 'নিশ্চিন্দি'। দেশভাগের ফসল আমরা নই, আমাদের আগের প্রজন্ম।

অথচ ছোটবেলা থেকেই যতবার কোমলগান্ধার দেখেছি, ভৃগুর কন্ঠস্বরে শুনেছি, পদ্মার ওই পাড়ে আমার দেশ।

আমার জন্ম এখানেই, এদেশেই, পশ্চিমবঙ্গে।

আমি দারিদ্র্য দেখেছি, কষ্ট দেখেছি, যদিও তার আঁচ তেমনভাবে লাগেনি।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় আমি বেশ ছোট।

গত কয়েক দশকে হুড়মুড়িয়ে বদলে গেল সবকিছু। আমাদের দেখা, অনুভব, চাওয়া।

ক্লাসলেস সোসাইটির যে লড়াইয়ের কথা আর গান শুনে বড় হলাম, দেখলাম তা প্রতিদিন আরো বাড়ছে।

সাহিত্য-সংস্কৃতি, সঙ্গীত-নাটক যা কিছু ছিল লড়াইয়ের হাতিয়ার সবই আজ বাজারে বিকোয়।

আসলে এখন সবকিছুই বাজার সর্বস্ব।

রাজনৈতিক দলগুলোও বাজার দখলের লড়াইয়ে নেমেছে কাদার তাল হাতে নিয়ে।

এখনো ভাগ্যিস এরপরেও কেউ কেউ ভৃগুদের মতো লড়াই করে, কেউ কেউ নিঃস্বার্থে মরে।

একটিমাত্র মানুষ আমাদের পথ দেখাতে পারত, একটি মাত্র মানুষ, যাঁর গান অল্পবয়সে আমাদের পথ দেখিয়েছিল। সেই মানুষটি নিজেও বড় কনফিউসড। অথচ সেই মানুষটি যদি তাঁর গিটার হাতে গান গেয়ে ডাক দিতেন, হতেই পারতেন হ্যামলিনের বাঁশিওয়ালা। তিনিও সস্তা গিমিকে ভুললেন।

বাকি সবাই নিজেদের ইমেজ নিয়ে ব্যস্ত - লেখায়, কথায়। সাধারণ মানুষের কথা ভাবতে তাঁদের বয়েই গেছে। যেটুকু নিজেদের ইমেজের জন্য প্রয়োজন তা বাদে। তাঁরা যতই ভালো কথা বলুন, লিখুন, ব্যক্তি হিসেবে ঘৃণ্য।

আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষের এখনো ভাত জোটেনা, অধিকাংশ মানুষের মাথায় ছাত নেই। অধিকাংশ মানুষ ইন্টারনেট বা কমপিউটারের ব্যবহার জানেন না। এটাই আমাদের দেশ।

এই দেশ, এই বাংলা এত বছরে না শিক্ষায়, না স্বাস্থ্যে না খেতে পাওয়ায় কোথাও এগোয়নি। এখনো অল্পবয়সে বিয়ে হয়, পণ নেওয়া হয়, নারী শিক্ষার হার খুব খারাপ, এই তালিকার কোথাও শেষ নেই।

রাজনীতি, শিক্ষা, সংস্কৃতির মেলবন্ধনে একটা সমাজ এগোতে পারে। তাকে সবচেয়ে বেশি সাহায্য করতে পারে মিডিয়া।

অথচ সব উলটো হচ্ছে। আমরা ক্রমশঃ পিছন দিকে যাচ্ছি, অবক্ষয়ের দিকে।

ঊনবিংশ শতকে, বিংশ শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত সমাজ বদলের লড়াইয়ের মধ্যে একটা হারমনি ছিল। নির্দিষ্ট শত্রু  ছিল। এখন আমরা নিজেরাই নিজেদের সবচেয়ে বড় শত্রু। আমরাই শোষণকারী, আমরাই শোষিত, ক্লাস কনসেপ্টটাই আগাপাশতলা গেছে গুলিয়ে এই খোলা বাজার অর্থনীতিতে।

আগে তাই নিজেদের ভেঙে ফেলতে হবে। নাহলে ক্ষমতায় যেই আসুক ঘটনাক্রম একই থাকবে।

রাজনীতি, শিক্ষা, সংস্কৃতি এবং সর্বোপরি মিডিয়া প্রাণপণে আমাদের চোখে ঠুলি এঁটে সমস্যার থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে আমাদের, প্রাণপণে মদত দিচ্ছে এই ক্লাস ডিফারেন্সকে।

আগে নিজের আয়নাটাকে ভাঙতে হবে। এটা কিন্তু শেষপর্যন্ত পারে কবিতা, গান, নাটক, ভালোবাসা।

অনেকদিনপর কোমলগান্ধার দেখতে দেখতে সেই সুমনের গানই কানে ভাসে - 'এক ধরণের বিদ্রোহ হল কবিতা, একধরণের বিদ্রোহ হল গান, একধরণের বিদ্রোহ ভালোবাসা, ভেঙেচুরে সব খানখান'

অনসূয়ার মনের মতোই বিভক্ত বাংলার নাম আর কোনোদিনও 'কোমলগান্ধার' হবে না জানি।

Friday, September 11, 2015

আত্মহননের সাতকাহন

যেকোনো হত্যাই ঠিক নয়, এমন কী নিজেকেও, এই কথা তীব্রভাবে মানি। তবে আত্মহত্যাকে অপরাধ বলা না হোক। বরং কেউ আত্মহত্যা করতে গিয়ে বেঁচে উঠলে তার পাশে দাঁড়াক অন্যেরা।

আমার মনে হয় একধরণের মানুষ থাকেই যারা আত্মহত্যাপ্রবণ। যারা ব্যর্থ প্রেম বা জীবনের অন্য কোনো ব্যর্থতায় বা যেকোনো কারণে বা বিনা কারণে আত্মহত্যা করে। আত্মহত্যার কথা মনে করলেই আমার অন্যতম একজন প্রিয় কবি সিলভিয়া প্ল্যাথের কথা মনে পড়ে। সিলভিয়া দশ বছর বয়স থেকে আত্মহত্যা করার চেষ্টা শুরু করেছে, শেষপর্যন্ত সফল হয় বোধহয় তিরিশের কোঠায়। খুব বেশি সৃষ্টিশীলতার আকাঙ্খাও অনেকসময় আত্মহননের কারণ হয়ে ওঠে বৈকি। এও নিজের আবেগ প্রকাশের একটা অংশ।

আত্মহত্যার অনেকটাই থাকে সামাজিক কারণ। তাই ধর্ষিতা অথবা পণ দিতে না পারা মেয়ে দিনের পর দিন হুমকিতে অথবা অপমানে আত্মহনন করে। খিদের জ্বালা অথবা স্ত্রী-সন্তানদের মুখের অন্ন না জোটাতে পেরে আত্মহত্যা করে কত শ্রমিক, কৃষক তার ক'টা আর খবরে প্রকাশ হয়? ঋণের জ্বালা সহ্য করতে না পেরে কতজন একা বা সপরিবারে আত্মহত্যা করে।

আত্মহত্যার কারণ যেখানে সামাজিক, সেখানে আশপাশের মানুষের অথবা সমাজের একটা বড় ভূমিকা থেকেই যায়।

অল্পবয়সীদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা বাড়ছে। এটা কিন্তু বাড়ছে উচ্চ মধ্যবিত্ত এবং উচ্চবিত্ত পরিবারের মধ্যে। নিম্নবিত্ত পরিবারের ছেলেমেয়েদের জীবনে অল্পবয়স থেকে না পাওয়া এবং লড়াইটা অনেক বেশি থাকে তাই আত্মহত্যার চেয়ে তারা বেঁচে কিছু পেতে চায়। যেমন, সেই মেয়েটি যাকে পড়াশোনা করার অপরাধে তার গায়ে আগুন লাগিয়ে দিয়েছিল নিজের বাবাই। তারপরেও বেঁচে উঠে পিসির বাড়ি চলে গিয়ে আবার পড়াশোনাই করছে সে। এই কাহিনির পরবর্তী কী হল মাঝে মাঝেই জানতে ইচ্ছে করে।

উচ্চ মধ্যবিত্ত বা উচ্চবিত্ত পরিবারের ছেলেমেয়েদের অভাববোধ নেই কিন্তু তৈরি হয়েছে একটা বিস্তীর্ণ একাকীত্ব। এই একাকীত্বকে যারা সৃষ্টিশীলতায় কাজে লাগাতে পারে তারা ভাগ্যবান। বাকিদের কাউকে কাউকে ভিন্ন পথ খুঁজতে হয়। কেউ আন্তর্জালে বন্ধুত্ব খুঁজে পায়, কেউবা আত্মহননে মুক্তি। ছেলেমেয়েদের সাফল্যের চাকায় জড়িয়ে দেওয়াটাও একটা বড় কারণ বৈকি, কতজন আর নিজের মতো করে বাঁচতে পারে? কিছু বেহিসাবী বাবা-মায়ের সন্তানেরা ছাড়া।

দীর্ঘ অসুস্থতা অথবা লাগাতার ডিপ্রেশন অনেকসময়ই আত্মহত্যার খুব স্বাভাবিক কারণ হয়ে উঠতে পারে। এক্ষেত্রেও আশেপাশের মানুষরা যদি সমালোচনার বদলে তাদের বুঝতে চেষ্টা করে তাহলে হয়তো বেঁচে থাকাটা সম্ভব হয়ে ওঠে।

আমার মনে হয় একবারই তো মানুষ বাঁচে তাই যতদিন সম্ভব বেঁচে থাকাটা জরুরি। বেঁচে থাকার সবসময়েই কিছু না কিছু ইতিবাচক দিক থেকেই যায়।

তবে অনেকসময় মানুষ জেনে বুঝে অন্যের জন্যে বা সমাজের জন্যেও আত্মহত্যা করে। যেমন প্রতিবাদ করলে নিশ্চিত মরব জেনেও অনেকে প্রতিবাদ করে যায়। দেশের সেনাবাহিনীতে যারা নাম লেখায় তারাও নিশ্চিত জানে রাজায় রাজায় যুদ্ধ হলে প্রাণ যাবে তাদের মতো উলুখাগড়ারই। এগুলোও একধরণের আত্মহত্যা বৈকি।

অনেক ঘটনাতেই মনে হয় যেন ঠান্ডা মাথায় আত্মহত্যা। আমার তো মনে হয় সুস্থ মস্তিস্কে কেউ কাউকে এমন কী নিজেকেও হত্যা করতে পারে না। অন্ততঃ কয়েক মুহূর্তের জন্যে হলেও হয়তো সে সুস্থ মস্তিষ্কে থাকে না। তবে এটা ঠিক বলতে পারব না।

কেউ আত্মহত্যা করেই ফেললে তারপরে সেই ঘটনায় কে খুশি হল, কেই বা দুঃখিত, তা ব্যক্তি মানুষটির কাছে তখন অপ্রয়োজনীয়। বরং যতদিন মানুষ বেঁচে আছে, তার পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করাটা ভালো।


ব্যক্তিগতভাবে ইউথ্যানাসিয়া আমি সমর্থন করি। কিন্তু সে তো অন্য প্রসঙ্গ।

Thursday, September 10, 2015

আয়না

সাধারণ মানুষের তরফ থেকে প্রত্যেক রাজনৈতিক দলকে কতগুলি বৃহৎ আয়না কিনে দেওয়ার সুপারিশ করছি। নিজেদের মুখ এবং মুখভঙ্গী ভালো করে দেখবার সময় এটা, অন্যের মুখ এবং মুখভঙ্গী দেখার আগে। পরস্পরের গায়ে যে কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি চলছে তাতে নিজেদের চেহারাটা ঠিক কেমন দাঁড়াচ্ছে সেটাও বিবেচ্য।

শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য

এতদিন পর রূপনারায়ণপুর গিয়ে আমার সবচেয়ে যেটা চোখে লেগেছে তা হল, এত বছরেও শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য এই দুটো জায়গায় কোনো নূন্যতম উন্নতি হয়নি। এটা পশ্চিমবঙ্গের সার্বিক চিত্র। শিক্ষিত হওয়া আর সাক্ষরতার মধ্যে ঢের তফাত। রাজনৈতিক দলগুলো শুধুমাত্র সাক্ষরতাকে শিক্ষা বলে চালানোর প্রাণপন চেষ্টা করে যাচ্ছে দীর্ঘদিন যাবত। অথচ বাদবাকী সব সমস্যার মূল এই শিক্ষার অভাব। কোন রাজনৈতিক দলই কিন্তু সাধারণ মানুষের প্রকৃত শিক্ষা চায় না - এরা যত বেশি জানে, তত কম মানে।

অথচ, এই যে লোকসংখ্যা বেড়ে যাওয়া, হিন্দু-মুসলিম বিভেদ, কম বয়সে বিয়ে দেওয়ার রেওয়াজ, মেয়েদের ওপর অত্যাচার, সার্বিকভাবে স্বাস্থ্যের মান উন্নয়ন না হওয়া এমন সমস্ত সামাজিক, অর্থনৈতিক সমস্যার পিছনেই রয়েছে এই প্রকৃত শিক্ষার অভাব। ক্রমশঃ যা দাঁড়াচ্ছে রাজনৈতিক দল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কোথাও আর শিক্ষিত বলে কিছু থাকছে না। ক্রমশঃ শিক্ষিতরা বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতিতে পরিণত হচ্ছে।

নারী শিক্ষার অবস্থা আরো শোচনীয়। যারা লেখাপড়া শেখার সুযোগ পাচ্ছে না তাদের কথা তো বাদই দিচ্ছি, যারা লেখাপড়া শিখেছে তাদেরও একটা বড় অংশই অশিক্ষিতই রয়ে গেছে। ঊনবিংশ শতকের শিক্ষিত বাঙালি মেয়েদের চিন্তাভাবনার কথা যত পড়ি ততই এটা বুঝতে পারি যে এই একশো-দেড়শো বছরে আমরা মানসিকভাবে কতটা পিছিয়েছি।

আবার নতুন করে শিক্ষার প্রসার এবং বিশেষতঃ নারী শিক্ষার প্রসার খুব জরুরি হয়ে পড়েছে।

Wednesday, September 9, 2015

ঈশ্বরের ফাঁসি

ঈশ্বর, আল্লা অথবা গড
যতবার জন্ম নেবে,
ততোবারই তাকে ফাঁসিকাঠে ঝোলাতে পারি।
ভগবান কোনো রাষ্ট্রের অধীনে নেই,
কারোর পৈত্রিক ইয়েও নয়।

ধর্ম নামের নানা রঙের জামাটার তলায়
এক নির্লজ্জ জীব -
যার লক্ষ্য যেকোনো রাজনৈতিক দল অথবা
শক্তিশালী রাষ্ট্রের মতো
ক্ষমতা অথবা বাজার দখল।

টাকা এবং নারীমাংস এই দুটোই
খুব সুস্বাদু ঈশ্বরের কাছে।

দুর্লভ থেকে দুর্লভতম হিংসার জন্য
সহজেই ফাঁসি দেওয়া যায় তাকে।

একমাত্র ঈশ্বরের পুনর্জন্ম হয়
এই পৃথিবীতে।
নানা নামে, নানা রূপে, নানা চরিত্রে।
তাই বারবার ফাঁসিকাঠ প্রস্তুত রাখি

আমরাও।