Sunday, May 1, 2016

এক একটা দিন

একেকটা দিন খুব নস্টালজিক হয়। যখন সেই দিনটার সঙ্গে কিছু স্মৃতি জুড়ে থাকে। স্মৃতিরা আসলে পড়া হয়ে যাওয়া পুরোনো বইয়ের মতো। মাঝে মাঝে আবার উলটে পালটে পড়া। কোনও পাতায় বুকমার্ক দেওয়া থাকে। কিছু পাতা আবার কখনওই পড়তে ইচ্ছে করে না আর।

একেকটা দিন খুব নস্টালজিক হয়। যখন তার সঙ্গে কিছু গান জুড়ে থাকে। কিছুটা ছোটবেলা। হেমাঙ্গ বিশ্বাস, ক্যালকাটা ইয়ুথ কয়ার। টেপ বাজে সকাল-দুপুরে। অথবা মায়ের উদাত্ত গলা। আমরাও গলা মেলাই নাম তার ছিল জন হেনরী...। জন হেনরীর পাথর ভাঙার ছবি গানের শব্দ আর সুরে চোখের সামনে স্পষ্ট হয়। মেরী ম্যাকডালিনের দুঃখে ছোট্ট বুকের ভেতরটা থমথম করে। একদম শেষে পৌঁছে বাবা তার আসবে না, আর না..., মা যখন একটু গলাটা ভেঙে দিয়ে হায়, হায়, হায়, হায়... টানটা দেয়, তখন সেই থমথমটা চোখ দিয়ে গড়িয়ে আসে যেন।

বড় হয়ে সুমনের প্রথম দিককার সেই সব গানগুলোর পরেই বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কবিতার গানের কথাগুলো ঠিক তেমনভাবেই নাড়া দিয়েছিল, পাথরে পাথরে নাচে আগুন। অনেকদিন পর অন্যরকম সুরে সুমনের গলায় শুনলাম জন হেনরী

গান বেঁচে থাকবে। সুর হয়তো বদল হবে কখনও, নতুন এক্সপেরিমেন্ট হবে। কিন্তু এই গানে যে দিন বদলের সুর থাকে তার অর্থ কেবল সুমনের একটি গানেই প্রতিধ্বনিত হতেই থাকে, আমি গান গাইলাম...যা ছিল আগের মতো রয়ে গেল...।

তবু গান তো গাইতেই হবে...

খুঁজি কোথায় কৃষ্ণচূড়ার একটি কুঁড়ি পাঁপড়ি মেলে...

ছবিটি

কথারা সব ঘুমে জড়িয়ে আসে। মাথার মধ্যে ঝিমঝিম নূপুর বাজে। শব্দগুলো ভাসতে থাকে সাদা-কালো থেকে জলরঙে।

চোখের পাতায় লেগে থাকে জলকুচি...।

রাতের মায়া আদর মাখতে মাখতে শব্দরঙা কাব্যবালিকা হারিয়ে যায় পাগলের প্রলাপ আঁকা বনে।


থাকে শুধু মুখোমুখি বসিবার...

রোজ তার সঙ্গে কথা বলি, কথোপকথনই বলা যায়। দিনরাত্তির। বিষয় থেকে বিষয়ান্তরে চলে যাই প্রতি মুহূর্তে। আজ, আগামীকাল, এই সময় অথবা ভালোবাসা, খুব গরম, ব্যথা করছে অথবা আরও যে কোনও কিছুই। অধিকাংশ সময়েই মতে মেলে না, বিস্তর কথা কাটাকাটি চলে। একেকদিন আবার দিব্য ভাব। যখন পুরোনো দিনের গল্প করতে করতে আমরা হস্টেলে বসে অমলেটের গন্ধ পাই অথবা জন্মদিনে মায়ের হাতের পায়েসের। মে দিন কী রবীন্দ্রনাথের জন্মদিনে ছোটবেলায় মায়ের সঙ্গে গাওয়া গানের কথা মনে পড়ে যায়। একসঙ্গে গলা মেলাই যখন আনমনে তখনও। অথবা ফ্রিজ থেকে খানিকটা দুধ, কী আধভাঙা একটা সন্দেশ মুখে পুড়ে দিই তখনও আমরা হয়ত একমত। হয়ত কথাটা বলা এইজন্যই যে সন্দেশের ক্ষেত্রে একটা দ্বন্দের অবকাশ থাকে বৈকি। একমাত্র কাজ করার সময় টের পাইনা সে কী করে। বোধহয় কাজ। কবিতা লেখার সময় আমার আগে আগে ফস ফস করে শব্দগুলো বলতে থাকে। যত বলি, দাঁড়া একটু ভাবছি...।

একেকদিন শরীরটা বেশ ভালো ঠেকে। বলি এই দ্যাখ কেমন আজকে তোর বলার আগেই কত কিছু করে ফেললাম। ভারী খুশি হয় সে। একদম অমলিন খুশি। তবে শরীর ভালো থাকলে তার দেখা কম পাওয়া যায়। আজকাল একটু কিছুক্ষণ কাজ করলেই খুব কষ্ট হয়। একেকদিন মাথা ঘোরে, একেকদিন অন্যকিছু। রাস্তায় আসতে আসতে বলি, দূর ভাবতে পারিস, বছর দুয়েক আগেও আমি...। অম্লানবদনে বলে, কী মুশকিল, এখনও তো পারছিস, এখনও। স্রেফ এইটা মনে রাখ। আগের দিনগুলো নেই, কেটে গেছে। একেকসময় কিচ্ছু করতে ইচ্ছে করেনা, ঝিমোতে থাকি, আমায় নাড়া দিয়ে বলে, লেখ, বলি, না। ফের নাড়া দিয়ে বলে, তাহলে একটু হা-পা নাড়া, ব্যায়াম কর, তাও বলি না। শেষে রেগে গিয়ে বলে, দূর ঘুমা তাহলে, আমি চললাম। কী আর করি ঢুলতে ঢুলতে কিছু একটা করতে শুরু করে দিই, যতক্ষন না পুরোপুরি ঘুমিয়ে পড়ছি। ঘুম ভেঙে দেখি হাত আড়ষ্ট, গায়ে ব্যথা। বলি, নড়তে পারছিনা। বলে, আরে ওঠ, ওঠ নড়তে পারছিনা বললে হবে? তোর এই ওজন নাড়াবে কে? ব্যাজার মুখে উঠি। ছুটির দিন হলে ঝগড়া করে শুয়ে থাকি, চিৎকার করে বলি, উঠব না উঠব না, বিচ্ছিরি পৃথিবীটা। সে বলে, পৃথিবীর তো আর খেয়ে দেয়ে কাজ নেই যে বিচ্ছিরি হবে, আসলে তোর না ওঠার ফন্দি। যতই বলি, চুপ। মুখের ওপর হাসে। এই হাসাটাই ওর বড় বাজে স্বভাব ছোট থেকে। অনেকবার বলেছি হাসিস না, একদম বাজে স্বভাব তোর। তবু শেষপর্যন্ত সবেতেই হাসবে। এবং আমাকেও হাসাবে।

অল্পবয়সে যখন আমার কোনও বন্ধু ছিল না, তখন একবার চিঠি লিখেছিলাম ওকে। এখনও লিখি মনে মনে, রোজ।

খুব একা লাগলে, ডাকি, ডেকেই যাই, আয়, আয়, আয়...
ব্যস, আর কোনও সাড়া নেই।
মনের মধ্যে কেবল সেই ডাক একটা কক্ষ থেকে আরেকটা কক্ষে ধাক্কা খেতে খেতে ফিরে আসে।


আর এই আমিটা চুপ করে অপেক্ষা করে থাকি, কখন আবার সেই আমিটা ফিরে আসবে...।

মেঘদূত

বেদনারা অলক্ষিতে কখন ভালোবাসার সীমানা পেরিয়ে যায়। মেঘ জমে রামগিরি শিখর চূড়ায়। 
বৃষ্টি পড়ে না।
রুক্ষতার ফাটল শুধু একা একা বাড়ে।

ঈশ্বর

আরও আরও অন্ধকারের দিকে হাঁটতে হাঁটতে চলেছি, পরস্পরের থেকে দূরে আরও দূরে, যতদূর বিস্তৃত হতে পারে ঘৃণার দীর্ঘ করতল। বদলে যাচ্ছি ভিন্ন ভিন্ন অচেনা দ্বীপে। যে দ্বীপে কোথাও কোনো ঘাস অথবা আলো নেই। নেই কোনো সুপেয় ধারা। রুক্ষ বেলাভূমি ছুঁয়ে শুধু বারবার ফিরে যায় লোনা জল। আমাদেরও গহনে লোনা জল বাড়তে থাকে প্রতিদিন। বাড়তে বাড়তে একদিন সেও মাথা ছাড়িয়ে যায়।


আরও আরও অন্ধকারের দিকে হাঁটতে হাঁটতে আমরা সকলেই একে একে হাতে তুলে নিচ্ছি কুঠার। এভাবেই যাবতীয় ধর্মীয় বিপক্ষ নির্মূল করেছিল পরশুরাম। এভাবেই পরস্পর হত্যা করতে করতে শেষ হয়েছিল যদুকূল। সেই হত্যালীলা যে দেখেছিল একমাত্র, আশ্চর্য তারই নাম নাকি ঈশ্বর!

Friday, April 29, 2016

গ্রেভইয়ার্ড

অনেকদিনের পুরোনো লাইব্রেরি, যেখানে নিয়মিত বিশেষ কেউ যায় না, টিমটিম করে আলো জ্বলে, একজন লাইব্রেরিয়ান একা বসে খবরের কাগজের পাতা ওলটান আর তার মাথার ওপর অনেকদিনের পুরোনো পাখাটা ক্যাঁচ ক্যাঁচ করে ঘুরতে থাকে, কেমন একটা কবরখানার স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়। চতুর্দিকে বড় বড় পুরোনো কাঠ আর কাঁচের আলমারি, কাঁচগুলো একটু ঘসা ঘসা হয়ে এসেছে, তার ভেতরে অজস্র বই, পুরোনো নথিপত্র ঠাসাঠাসি করে রাখা, যেন সামথিং বারিড ইনসাইড এমনই অনুভূতি হয়। অনেক অনেক মৃত কাগজ, মৃত শব্দের ভারে চেপে নিথর বসে রয়েছে। পুরোনো, খুব পুরোনো একটা গন্ধ লেগে রয়েছে বাতাসের গায়ে।

সেইখানে কাগজ-কলম নিয়ে বসে পুরোনো বই, নথিপত্রের পাতা ঘেঁটে একটা-দুটো করে শব্দ লিখছি কাগজে, খাতায়। শব্দগুলো প্রাণ পেয়ে যেন নড়েচড়ে উঠছে। আরও লিখে যাচ্ছি, প্রাচীন কাহিনি নতুন করে, প্রাচীন সব লেখকের নাম উঠে আসছে জীবন্ত শব্দে...।

অতীতের সঙ্গে, মৃতের সঙ্গে জীবিতের যোগসূত্র স্থাপিত হচ্ছে। হারিয়ে যাওয়া নামেরা বেঁচে উঠছে শব্দ আঁকড়ে ধরে। প্রাচীন আলমারির ভেতর থেকে ভেসে আসা দীর্ঘশ্বাস যেন বলছে অনাগত দিনের মানুষ তোমার জন্যই আমরা অপেক্ষা করছিলাম। ছেলেবেলায় পড়া বিভূতিভূষণের ডায়েরির পাতা মনে পড়ছে।

একশো বছর পর আমিও অমনি কোথাও মৃত শব্দের আখরে চাপা পড়ে যাব। তখনও হয়ত কেউ আসবে মৃত আর জীবিতের যোগসূত্র স্থাপন করতে...। প্রাচীন গন্ধ মাখা ঘরে ধুলো সরিয়ে ভেঙে ভেঙে আসা পাতা ওলটাবে...


আর আমি নিঃশব্দে অপেক্ষা করব আর একবার বেঁচে ওঠার জন্য...

কিশোর সাহিত্য

ইংরেজিতে কিশোর থুড়ি ইয়ং অ্যাডাল্ট সাহিত্যের রমরমাটা ইদানীংকালে হয়ত হ্যারি পটারকে কেন্দ্র করেই শুরু হয়েছিল। কিন্তু সেটার ফর্মটা আরও কম্প্যাক্ট হয়েছে, পরপর দুটো বই পড়ে বেশ বুঝতে পারলাম। বইদুটোই আমাকে বেশ আচ্ছন্ন করেছে নীল গেইমান-এর গ্রেভইয়ার্ড বুক আর ক্রিস ওয়েস্টউডের মিনিস্ট্রি অফ প্যান্ডিমোনিয়াম। সবচেয়ে আশ্চর্যের হচ্ছে ভাবনার বৈচিত্র্য। বেসিক থিম মূলতঃ এক। খারাপ এবং ভালোর লড়াই এবং তাতে ভালোর আপাত জয়। কিন্তু পটভুমিকা এত বিচিত্র এবং এতরকম তার অন্তরার্থ...। মহাকাশ থেকে কবরখানা সর্বত্রই যে অল্পবয়সী মন ঘুরে বেড়াতে পারে, অর্থ খুঁজতে পারে জীবন এমন কী মৃত্যুরও সেইটা খুব মনে হয়। কিশোর মনের চাহিদা এবং বিস্তৃতি উভয়ের জন্যই ভালো। আমারই এই বয়সে পড়ে আশ্চর্য সব অনুভূতি হচ্ছে। বইগুলো ভাবায়।

বাংলা কিশোর সাহিত্য কোনওদিনও এর ধারেকাছেও পৌঁছতে পারেনি। হ্যারি পটারের সঙ্গে কেউ কেউ অকারণেই সুকুমার রায়ের তুলনা করে বাংলা কিশোর সাহিত্যের পিঠ চাপড়ানোর চেষ্টা করেছেন। তবুও একমাত্র সুকুমার রায়ই কিছু ইউনিক ভাবনা ভাবতে পেরেছেন। সারা বিশ্বের কিশোর সাহিত্য যখন আলাদা একটা জায়গায় পৌঁছে যাচ্ছে তখন বাংলা কিশোর সাহিত্য মোটের ওপর সেই থোড় বড়ি খাড়াতেই আটকে গেছে। এখানের কিশোর সাহিত্যের বেশ বড় অংশ জুড়েই থাকে খুব কাঁচা গোয়েন্দা কাহিনি।

ইয়ং অ্যাডাল্ট বইগুলোর কমন বিষয় হল, নায়ক এক বা একাধিক সাধারণ ছেলে বা মেয়ে। কিন্তু তার মধ্যে কিছু অসামান্য ক্ষমতা আছে। তার জীবনে কিছু দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা আছে। অনেকক্ষেত্রেই বাবা-মা দুজনেই বা কোনও একজন নেই। আর্থিক অবস্থাও খুব সাধারণ বা খারাপ। কিন্তু এক বা একাধিক অসম্ভব ভালো বন্ধু আছে। এছাড়া ওই ভালো-মন্দের লড়াইয়ে ভালোর জিত সে তো আছেই। এতদিন যেটা আপত্তিকর লাগত যে, বেশ কিছু বইতেই এই অল্পবয়সী ছেলেমেয়েরাই হাতে আগ্নেয়াস্ত্র বা অন্য কোনও অস্ত্র নিয়ে লড়াই করছে এবং তাতে জিতেও যাচ্ছে। এই ব্যাপারটা অল্পবয়সী ছেলেমেয়েদের মাথায় ঢুকে যাওয়াটা মোটেই ভালো নয়। তার ফল খুব খারাপই হয়। কিন্তু শেষ যে বইদুটোর কথা বললাম, বিশেষতঃ শেষটায় লেখক দেখিয়েছেন যে মানুষের মন, ইচ্ছাশক্তি, ভালো ভাবনা খারাপকে ধ্বংস করে দিতে পারে। এটা  যে কোনও অস্ত্রের থেকেও এর শক্তি অনেক বড়। লুসি আর স্টিফেন হকিং-এর জর্জকে নিয়ে লেখা সিরিজটারও মূল বক্তব্য কিছুটা এটাই। লেখকের এই আইডিয়াটা খুবই গ্রহণযোগ্য এবং আধুনিক প্রজন্মের কাছে ভীষণ জরুরি।

আসলে বাংলা কিশোর সাহিত্যে কিশোর-কিশোরীদের হয় আমরা শিশু হিসেবে ভেবে নিই, অথবা বড় হওয়া মানে ইদানীংকালে টিন এজ লাভ স্টোরির নায়ক-নায়িকা হতে পারে এই পর্যন্ত। কিন্তু সে একটি মানুষ, এভাবে ভাবতে চাইনা। তাই গল্পের ফর্মে এবং পটভূমিতে বৈচিত্র্য আসে না। তবে বিদেশি গল্পের নকল করতে গেলে আরও সর্বনাশ। যেমন এনিড ব্লাইটন-এর ফেমাস ফাইভের অতি বাজে নকল পাণ্ডব গোয়েন্দা। যে ছেলেমেয়েরা একবার বিদেশি এইসব কাহিনির রসাস্বাদন করেছে তার কাছে একেবারেই বোকার মতো ঠেকবে।

বাংলা সাহিত্য যতই সমৃদ্ধ বলে অহংকার করি না কেন, বিস্তৃত প্লট, লেখার বৈচিত্র্য কোনওকিছুতেই বিশ্ব সাহিত্যের কোনও ধারারই ধারে কাছে আসে না বলে আমার মনে হয়। তবে কতটুকুই বা পড়েছি আমি। তবু তুলনা মনে এসেই যায়। প্রবন্ধ, কবিতা এবং ঘর-সমাজ বিষয়ক কিছু গল্প-উপন্যাস ছাড়া। আর সবচেয়ে খারাপ অবস্থা বাংলা শিশু-কিশোর সাহিত্য।


ছোটবেলায় মেয়ের হাতে বই তুলে দিতাম। এখন নতুন নতুন বইয়ের খোঁজ ওই আমায় দেয়। এই দুটো বই-ই ও আমায় পড়িয়েছে। ওদের ভালোলাগছে এসব, এইটা জেনেও ভালোলাগে। এইসব বই ওরা আলোচনা করছে, নিজেরাও ভাবছে। এটা পরোক্ষভাবে আগামীদিনে বাংলা কিশোরসাহিত্যকেও হয়ত পুষ্ট করবে। আমাদের কম বয়সে কত কম পড়ার সুযোগ পেয়েছি। এত ভার্সেটাইল লেখা কল্পনাশক্তিকেও রসদ যোগায়।