Sunday, September 6, 2015

আমি ভালোবাসি

অনেক যুদ্ধক্লান্ত মানুষের দেশ নেই, ঘর নেই, পরিচয় একটাই - 'শরণার্থী'। অনুভূতি একটাই প্রতিমুহূর্তে বেঁচে থাকার বিপন্নতা।

এই যুদ্ধ অন্য কারা করেছে তারা নয়। কাদের কাছে শরণ নেবে তারা? কোথাও তো কোনো ভালোবাসার ঘর নেই, ভালোবাসার দেশ নেই। সবাই এবার হিসেব করতে বসবে কার দেশে কত শরণার্থী গেল, আরও কত লোকের দায় বাড়ল। সে দেশের লোকেরা ভাববে, শঙ্করার খাবার জোটাবে কে? আমাদের ভাগে কম পরবে তো।

কোন পূর্বকাল থেকে মানুষ হেঁটে আসছে - একা। জোট বাঁধলো, পরস্পরের বিরুদ্ধে ধর্ম, অর্থ, দল এমন নানা অস্ত্র ধরল, যুদ্ধ করল। তারপর আবার হাঁটছে - একা। পরস্পরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে আর একা একা হেঁটে যাচ্ছে।


হাত ধরতে পারল না আজও। বলতে পারল না - 'আমি ভালোবাসি'

আমার কিছু কথা ছিল

যাকে নিতান্ত অপ্রয়োজনীয় কথা ঘন্টার পর ঘন্টা বলে যাওয়া যায় অথবা লিখে যাওয়া যায় তার নাম 'বন্ধু'। এইরকম বন্ধু সাধারণত হয় না। অল্পবয়সে আমার এরকম দু'জন ছিল অসাধারণত। তাদের একজন কয়েকবছর হল কথা বা লেখার সীমানার বাইরে চলে গেছে। আর আরেকজন হারিয়ে গেছে জীবনের বাঁকে।

মাঝে মাঝে খুব অপ্রয়োজনীয় কথা বলতে ইচ্ছে করে, আবোল তাবোল। রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে অথবা কাগজ-কলম নিয়ে বসে।
ভাবি কথারা যদি সত্যিই নদী হত, তাহলে নৌকো ভাসাতাম যার নাম 'চিঠি'। ঠিক পৌঁছে যেত 'বন্ধু'র কাছে। এখন কথাগুলো মুহূর্তে সাগর পেরোয়, কিন্তু কোথ্থাও পৌঁছায় না। তাই ভেবে ভেবে লিখতে হয়, লিখতে লিখতে ক্লান্ত হই। তবু দিনের শেষে মনে হয় বলা হলনা কিছুই।

আসলে কথারা কোথাও পৌঁছায় না। যেতে যেতে তার মানে বদলে যায়, রঙ-রূপ সব বদলে যায়।
কথারা আর খামের আদরে আসে না, কথারা আর পথে পথে ভাসে না। কথারা কেবল টুকরো টুকরো শব্দ হতে হতে ভাঙতে থাকে। আর সবাই খুঁজতে থাকে কথার মানে, কথার লাভ আর কথার ক্ষতি।

মাঝে মাঝে খুব অপ্রয়োজনীয় কথা বলতে ইচ্ছে করে আজও।

অথবা নদীতে কাগজের নৌকো ভাসাতে।

অথবা বন্ধু বলে কাউকে খুব ভালোবাসতে।

Saturday, September 5, 2015

বেঁচে থাকার মুহূর্ত কুড়োনো

বছরে একবার করে আমাকে ফিজিওথেরাপি করাতেই হয় নিজেকে সচল রাখতে। কখনো পুরোনো মুখেদের সঙ্গে দেখা হয়, কখনোবা নতুনদের সঙ্গে ভাব জমে ওঠে। আজ পিয়ালির সঙ্গে কথা হচ্ছিল। কোথায় যেন থাকে ভুলে গেলাম, রোজ ট্রেনে করে উল্টোডাঙায় এসে সেখান থেকে লেকটাউন। আমায় জিজ্ঞাসা করছিল, বাড়িতে জন্মাষ্টমী আছে কীনা। বললাম, জন্মাষ্টমী কেন, কোনো ঠাকুরই নেই আমাদের বাড়িতে। জিজ্ঞাসা করল, সত্যি? বললাম, একদম সত্যি। কোনো ঠাকুরে আমি বিশ্বাস করিনা গো, মানুষকে ভালোবাসাই ঈশ্বর সাধনা। সারাজীবন ধরে সেইটাই চেষ্টা করে যাচ্ছি। কতটা পেরেছি বা পারছি জানিনা। ও বলল, জানো, আমি যখন কোনো মন্দিরে যাই, তখন ঠাকুরের কাছে যা দিই, তার থেকে বেশি দিই বাইরে যারা ভিক্ষা চায় তাদের। 

তারপর আমায় একটা ঘটনা বলল -
'রোজ বিধাননগর স্টেশন দিয়ে আসি তো, দেখি একটা খুব ছোট্ট বাচ্চাকে বসিয়ে রেখেছে সামনে একটা বাটি দিয়ে। বাচ্চাটার এখনো ভালো করে কথাও ফোটেনি, ভিক্ষা দাও বলতে পারেনা, আধো আধো স্বরে কী বলে। দূরে ওর বাবা-মা দাঁড়িয়ে থাকে, আমি দেখেছি। ওর বাবা-মা-ই এটা ওকে দিয়ে করায়, ওর ভিক্ষার পয়সা নিশ্চয় নিয়েও নেয়। তাও আমি রোজ ওকে কিছু না কিছু দিই, যেদিন যা থাকে, এক টাকা-দু'টাকা। যেদিন একটু বেশি থাকে আমার কাছে সেদিন দশ টাকাও দিই। কিন্তু রোজ কিছু না কিছু দিই ওকে।'

পিয়ালির কতই বা বয়স হবে, মনে হয় কুড়ির ঘরের প্রথম দিকে, বাড়ির আর্থিক অনটনের জন্যে হয়ত কোনো কোর্স করে নিয়ে এই চাকরি করে, কতই বা রোজগার হবে, বাড়িতে এখন আরও তিনটে পেসেন্ট আছে বলল। আমার সঙ্গে মাঝেমধ্যেই গল্প হয় ওর সঙ্গে, ওদের সঙ্গে। আমার পিছনে লাগে ওরা নিয়মিতই। আমিও হাসি। বলে সকলের সঙ্গে তো এরকম করা যায় না, কিন্তু তোমার সঙ্গে করা যায়। বলি, তা বেশ।

কাউকে ভিক্ষা দেওয়া উচিত কী অনুচিত এই নিয়ে আমি এখনো কোনো সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারিনি। অধিকাংশ সময় দিইনা, মাঝে মধ্যে দিয়ে ফেলি। আর মাঝে মাঝেই মনে হয়, নিজেই বেকার মানুষ, চাট্টি ভিক্ষা জুটলে ভালো হয়।

আসলে এইসব পিয়ালিদের দেখে আমি রোজ ভালো থাকতে শিখি, বাঁচতে শিখি নতুন করে।


আর কয়েকদিন আগে মেয়ের প্রজেক্টের জন্য চাইল্ড লেবার সংক্রান্ত বিভিন্ন লেখার পাতা ওল্টাচ্ছিলাম। দুধের শিশুর হাতে ভিক্ষাপাত্র কি শিশুশ্রমের মধ্যে পড়ে? সেটাই ভাবছি শোনার পর থেকে।

প্রথম শিক্ষক

অধিকাংশের জীবনেই প্রথম শিক্ষক বাবা বা মা। আমারও হয়ত তাই। কিন্তু বাবা বা মা আমায় পড়াচ্ছে এমন কোনো স্মৃতিই আমার নেই। ছোটবেলায় আমাকে কেউ পড়াচ্ছে এটা সবসময়েই একবছরের বড় দাদার কথাই মনে করিয়ে দেয়। মানে ও যখন 'ড়ড়াই' আর আমি 'ললাই' বলি সেই বয়স থেকেই আমাকে শেখাতে এবং ভুল সংশোধন করতে ব্যস্ত থাকত নিয়মিত। আমার এখন তো মনে হয় নিশ্চয় অ আ ক খ শিখেই আমাকে শেখাতে বসেছিল। সেটা মনে নেই অবশ্য। তবে ক্লাস টুয়েলভ পর্যন্ত সায়েন্স ওর কাছেই পড়েছি। 

মনে আছে ও বাবার কাছে অন্য ছাত্রদের সঙ্গে বসে পড়ত। আর সেভেন-এইটে পড়তে দেওয়ালে রবার ছুঁড়ে ছুঁড়ে খেলত আর মা পরীক্ষার আগে পেছন থেকে সংস্কৃত পড়াত। আমাকেও পড়িয়েছে তো বটেই। কিন্তু আমার স্মৃতি জুড়ে শুধুই দাদার পড়ানো আর পড়া না পারলে মাথায় চাঁটি। ও যদি দুটো-তিনটে স্টেপ জাম্প করে অঙ্ক করায় তাহলে অঙ্কে নিতান্ত কাঁচা আমিই বা কী করি। রোজ একবার করে ঘোষণা করত, আর তোকে পড়াবই না। আবার পরেরদিন হাঁক পাড়ত, অঙ্ক বই খাতা নিয়ে আয় তাড়াতাড়ি। গ্রাজুয়েশনে জুওলজি নিয়ে আমার সবচেয়ে আনন্দ হল আর দাদার কাছে অঙ্ক করতে অথবা চাঁটি খেতে হবে না।

তবে শুধুই চাঁটিই তো আর নয়। ভীষণ নার্ভাস আমি মাধ্যমিকের অঙ্ক পরীক্ষার দিন কেঁদেকেটে বমি করে একশা। পরেরদিন ফিজিকাল সায়েন্স পরীক্ষা, অথচ বিছানা থেকে ওঠার ক্ষমতা নেই। দাদা পাশে বসে সবটা পড়ে বুঝিয়ে তৈরি করে দিল, পরেরদিন পরীক্ষা দিয়ে এলাম। মাধ্যমিকের রেজাল্ট বেরিয়েছে, দাদাকেই জানতে যেতে হবে। উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার সময়েও হস্টেল থেকে চলে আসতে হয়েছিল, রেজাল্ট দেখতেও ওই গিয়েছিল।


আমার স্মৃতিতে তাই দাদা-ই আমার প্রথম শিক্ষক।

Friday, September 4, 2015

তালাক তালাক তালাক

কেন মুসলিম বিবাহবিচ্ছেদ আলাদা করে মুসলিম ল বোর্ডের অধীনে থাকবে এটা আমার মাথায় ঢোকেনা। কেন সাধারণ বিবাহবিচ্ছেদের মতো উভয়পক্ষীয় হওয়ার কোনো সুযোগ থাকবেনা। একবিংশ শতকেও মুসলিম মেয়েদের অনেক ছোটবেলায় বিয়ে হয়। এখনও তাদের বোরখা পড়ে থাকতে হয়।

মুসলিম সমাজে প্রকৃত শিক্ষার অভাব এর মূল কারণ। ধর্মান্ধতার জন্ম দেয় প্রকৃত শিক্ষার অভাব। আর তার শিকার হয় নারী সমাজ।

পশ্চিমী দুনিয়ায় কালো মেয়েদের অবস্থা এবং অবস্থানের মতোই আমাদের সমাজে মুসলিম মেয়েদের অবস্থা এবং অবস্থান। একে নারী, তাই সে পুরুষ শাসিত সমাজের শিকার, তায় মুসলিম, তাই সে হিন্দু বিদ্বেষের শিকার, এবং সর্বোপরি সে মুসলিম নারী, তাই মুসলিম সমাজের শিকার।

আমেরিকান সাহিত্য পড়তে গিয়ে দেখেছি কালো মেয়েরা সাদা এবং কালো উভয় সমাজের পুরুষদের বিরুদ্ধে যেভাবে কলম ধরেছে, তা পড়তে পড়তে শিউরে উঠতে হয়। মুসলিম নারীদেরও নিজেদের কথা বলতে হবে নিজেদেরই। কিন্তু সেখানেও তারা দুর্ভাগ্যের শিকার। তাদের শিক্ষার সুযোগ খুবই সীমিত, আরও কম কথা বলার।

মাবেয়া খাতুনকে মনে পড়ে আমার। আমাদের সঙ্গে স্কুলে পড়ত। মধ্যমেধার এই মেয়েটি খুব ভালো সেলাই করত। ক্লাস নাইনে বিয়ে হয়ে যায়। আমায় বলেছিল, বিয়ে করার একটুও ইচ্ছে নেই ওর, আরও পড়াশোনা করার ইচ্ছে। নাহ্‌, স্কুলের চৌহদ্দির মধ্যে আর কোনোদিনই দেখিনি মেয়েটাকে। কোথায় আছে জানিনা, কটা ছেলেমেয়ে সামলাচ্ছে অথবা তালাক, তালাক, তালাক ঘটেছে কিনা।

মুসলিম যে পুরুষরা তুলনায় আধুনিক হয় তাদের কিন্তু এই সমাজ পরিবর্তনের দায়িত্ব অনেকটাই বর্তায়। যার মূল আছে নারী শিক্ষা প্রসারে। এক্ষেত্রে শিক্ষার অর্থ লিটারেসি নয় অবশ্যই, এডুকেশন।

রাজনৈতিক দলগুলি কিছু করবে না। মুসলিম ভোটের ঝোল টানার প্রয়োজন আছে সবারই। করতে হবে মানুষকেই।

Wednesday, September 2, 2015

আজীবন



তোমার সঙ্গে শেষ পর্যন্ত লড়ে যাব -
মানব না একটা কথাও।
তোমার জন্য শেষপর্যন্ত লড়ে যাব -
কিছুতেই মানব না কোনো বিরোধীতাও।

লড়াই যখন তোমার সঙ্গে আমার -
তুমি সততই বিরোধীপক্ষ।
লড়াই যখন অন্য কারোর সঙ্গে -
সবার আগে তোমার হাত আমিই ধরব জেনো।

এভাবেই লড়ে যাব একেবারে একা বা একা একা দুজনেই।
ঝগড়া চলছে চলবে বেঁচে আছি যতদিন।
লড়াই চলছে চলবে বেঁচে আছি যতদিন।
আর এভাবেই আজীবন বন্ধু হয়ে থাকব।


বিরিঞ্চিবাবা

১)
স্বর্ণাক্ষরে চাকরি করতে পুজোসংখ্যার লেখার জন্য চিত্রশিল্পী শুভাপ্রসন্নের বাড়ি গিয়েছিলাম। উনি লিখতে পারবেন না, অনুলিখন করতে হবে। বেশ বড় সাজানো বাড়ি। ঢোকার মুখে জলে ফুলটুল কীসব ভাসছে। ঘরে অজস্র আর্টের জিনিস। প্রত্যেকটা ঝকঝক করছে। বসার ঘর দেখলেই তাঁর আর্থিক সাচ্ছল্যের একটা সম্যক পরিচয় পাওয়া যায়। সময়টা ছিল নন্দীগ্রাম ঘটনার ঠিক পরেই পরেই। প্রসঙ্গটা উনিই তুললেন। আমি শুনলাম, শুনেই গেলাম। মনে হল, ফাঁকা কথাগুলো যেন এই সাজানো সচ্ছ্বল ঘরে হাস্যকরভাবে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। উনি বিদেশ ভ্রমণের গল্প বলছিলেন একটু আগে, সেটাই বেশ মানাচ্ছিল। এটা শুনতে শুনতে আমার খুব হাসি পাচ্ছিল, ভীষণ হাসি...। সেই থেকে লোকটাকে বড় ঘেন্না লাগে আমার।

২)
‘আমাদের ছুটি-র হয়ে শঙ্খ ঘোষের সাক্ষাতকার নিতে গেছি। তার আগে মায়ের সুবাদে একদিন গিয়েছিলাম ওনার বাড়িতে। ছাদ পর্যন্ত বই, দারুণ লেগেছিল। ভদ্র ব্যবহার, ভালো। শঙ্খ ঘোষের গদ্য এবং কবিতা আমার সবসময়ই খুব ভালোলাগে। সাক্ষাতকার মুখে দেবেন না। প্রশ্ন লিখে দিয়ে যেতে বললেন, লিখে উত্তর দেবেন। তাই সই। আমার সাক্ষাতকার নেওয়ার অভিজ্ঞ মন বলল, মুখে বললে আলগা শব্দ দু’একটা বেরিয়েই আসতে পারে, খুব সতর্ক হলেও। লিখে দিলে সে সুযোগ নেই। আর শঙ্খ ঘোষ এখন বাঙালি বুদ্ধিজীবিদের মধ্যে অন্যতম। কাজেই ‘আমাদের ছুটি’-র মত অতি ক্ষুদ্র, তুচ্ছ একটা পত্রিকাতেও তিনি কী বলছেন সেটা খুব বুঝেশুনেই বলতে হবে। লিখিত সাক্ষাতকার আনতে গিয়ে ছবির কথা বললাম। কিছুতেই রাজি হলেন না। ওনার বক্তব্য ওনার অনেক ছবি পাওয়া যায়, যেকোনো জায়গা থেকে নিয়ে নিতে। আমাদের ছবি তুলতে দেওয়ার মতো সময় ওনার নেই।
কিন্তু ‘আমাদের ছুটি’-তে কোথাও থেকে নিয়ে ছবি প্রকাশিত হয়না। হতে পারি আমরা খুব ক্ষুদ্র, খুব তুচ্ছ, কিন্তু আমাদের নিজস্ব কিছু এথিকস রয়েছে। ছবি ছাড়াই সাক্ষাতকার প্রকাশিত হল। সেটা দেখার কোনো আগ্রহও দেখালেন না শঙ্খ ঘোষ। সত্যিই তো ওনার মতো মানুষের সাক্ষাতকার কত নামীদামী পত্রিকায় বেরোচ্ছে, আমরা তো চুনোপুঁটি। কিন্তু কেন ওই সাক্ষাতকারের সঙ্গে ছবি নেই তা নিয়ে আমাদের অনেকবার পাঠকদের জিজ্ঞাসার মুখে পড়তে হয়েছে। বলেছি, প্রথম সংখ্যা তো তাই কিছু ত্রুটি রয়ে গেছে আমাদেরই।

৩)
বর্তমানে বাংলা ভ্রমণলেখিকাদের মধ্যে মূলতঃ পরিচিত মুখ নবনীতা দেবসেন। তাঁর লেখার সরসতা আমার খুব ভালোলাগে। কিন্তু যখন লেখার প্রতি ছত্রে ছত্রে ‘আমি’ এবং আবার ‘আমি’ থাকে তখন ক্লান্ত লাগতে শুরু করে ভীষণ। অমর্ত্য সেনের কোনো লেখায় নবনীতার উল্লেখ থাকে কিনা জানিনা, কিন্তু নোবেল পাওয়ার পর থেকে নবনীতার লেখার পাতায় পাতায় অমর্ত্যের কথা পড়তে পড়তে আমার আরও ক্লান্ত লাগে। তা হোক তবু সাক্ষাতকার একটা নেওয়া যেতেই পারে বলে যোগাযোগ করলাম। প্রথমে সময় হবে না ইত্যাদি। আসলে এই তুচ্ছ পত্রিকা, কে পড়বে, কে জানবে আর কী...। কারণ তারমধ্যেই তিনি বহু কিছু করছেন কাগজে দেখি মাঝেমধ্যে। যাইহোক বিনীতভাবে জানাই ই-মেল-এ প্রশ্ন পাঠাতে পারি সময় করে উত্তর দিলেই হবে। যাহোক প্রশ্ন পাঠাই। বেশ কয়েকবার তাগাদা দেওয়ার পর উত্তর আসে দায়সারা, দু’তিনটে প্রশ্নের দু’এক কথায় সংক্ষিপ্ত জবাবের পর লেখা - তোমার প্রশ্নগুলো বেশ ভালো, আমার বইগুলো দেখ, উত্তর পেয়ে যাবে। দাঁতে দাঁত চেপে বলি, আপনার ছবি লাগবে, আপনি যদি পাঠিয়ে দেন বা আমরা গিয়ে তুলে আনতে পারি। উত্তর এল, ওসব ছবি-ফবি দিতে পারব না। ও যোগাড় করে নাও। নাহ্‌, সাক্ষাতকার প্রকাশ করিনি আমরা। ওই যে আমাদেরও একটা এথিকস আছে, যত তুচ্ছই হই না কেন।

৪)
এদিক থেকে দেবেশ মামা তুলনায় অনেক ভালো। অন্ততঃ এই ধরণের কোনো মানসিকতা আমি দেখতে পাইনি। শুধু ছোট থেকেই দেখেছি একদম খাওয়ায় না। মনে হয় এইজন্য ওনার পপুলারিটি এত কম। শঙ্খ ঘোষের বাড়িতে গেলে প্রচুর খাওয়ান। অনেক মানুষের আড্ডাও জমে ওখানে। সেই ছোটবেলায় দেখেছি আমরা কলকাতায় এলে দেবেশমামা যখন কখনো সখনো গেস্টহাউসে মায়ের সঙ্গে দেখা করতে আসতো কোনোদিন হাতে করে আমাদের জন্যে কিচ্ছু আনেনি। তাই আমি নাম দিয়েছিলাম শুকনো মামা। কিছুদিন আগে আমার বইটা আর মায়ের একটা বই দিতে গিয়েছিলাম বাড়িতে। আমার ধারণা আমি প্রথমবার গেলাম। মা যদিও বলল, নাকি আগে গেছি, কে জানে বাবা, এরকম না খাইয়ে রাখলে ঠিক মনে থাকত আমার। একে তো কানে শুনতে পায়না এখন, সে এক বিড়ম্বনা, তার উপর আমার ভয়ানক খিদে পেয়ে গিয়েছিল। লোকে তো বাড়িতে কেউ এলে চা-বিস্কুট দেয়, ওমা কতক্ষণ ভাবলাম বুঝি এই দেবে এই দেবে, আর দেয়ই না। অনেকক্ষণ বাদে প্রায় ওঠার সময় জিজ্ঞাসা করল, কিছু খাবি? তোর মিস্টি খাওয়ার বারণ নেই তো? বোঝো ঠ্যালা! ওদিকে পেটেয় ছুঁচোয় ডন দিচ্ছে...। লোকে তো অন্ততঃ এক প্লেট মিস্টি এনে খাও খাও করে তবে একথা বলে। আমার আবার মুখ দিয়ে মিথ্যে বেরোতে চায় না। দাঁত-মুখ চিপে বলি, না খাব না, সুগার আছে। আমার এদিকে খিদে পেলে কেমন পাগল পাগল লাগে। তারপরে জিজ্ঞাসা, ডিমটিম খাসতো, ওমলেট খাবি, না বারণ আছে? নিতান্ত নিরুপায় আমি বলি, বারণ আমার বিস্তর কিছুতে আছে, সে প্রায় না খেয়ে থাকলেই হয়, ও বাদ দাও অত আমি মানিনা, দাও কী দেবে। যাইহোক অমলেট আর জল খেয়ে ধড়ে প্রাণ এল। বাইরে বেরিয়েই একটা দোকানে ঢুকে তাড়াতাড়ি কিছু খেয়ে নিলাম। বাড়ি ফিরে মাকে হুমকি দিই, আর আমি যাচ্ছিনা দেবেশ মামার বাড়ি। এরপর কখনো যদি যাইও তাহলে এক পেট খেয়ে তবে যাব। মা বলল, এরকম তো ছিল না দেবেশদা, আমাদের নাটকের রিহার্সালের সময় কত খাওয়াতো। আই বলি, রেখে দাও তোমার খাওয়াতো, আমি তো জম্মে দেখলাম না, সাধে কী আর বলি শুকনো মামা। তবে খেতে না দিক দেবেশমামার শেষ প্রকাশিত বইটা দিয়েছে। তাতেই আমি খুশি – যা পাওয়া যায় আর কী।

৫)
আসলে ছোটবেলায় যখন মায়ের কাছে শুনেছি যে শারদীয় আনন্দমেলাগুলো পড়তে নিয়ে আর একটাও জয়া কাকিমা ফেরত দেয়নি, তখন থেকেই আমি বুদ্ধিজীবিদের ওপর রীতিমতো চটা।

৬)
এখনো পর্যন্ত একমাত্র ব্যতিক্রম মনে হয়েছে অমিতাভকাকাকে। ছোটবেলায় বা বড় হয়েও কলকাতায় অমিতাভকাকা-রত্না কাকিমাদের বাড়িতে অনেকবার থেকেছি। সেই স্মৃতিগুলো কিন্তু বেশ মজার। রাত বারোটার সময়, তাড়াতাড়ি ছোটদের খেতে দিয়ে দাও, কী উদাত্ত কন্ঠে ‘সায়নারা সায়মন’। ‘নিজ হাতে নিজস্ব ভাষায়’ আমাকে দিয়েছিল অমিতাভকাকা, আর একটা রাশিয়ান গল্পের বইয়ের বাংলা অনুবাদ আমাদের দুজনকে। পৃথ্বীশকাকাকে অমিতাভকাকার বাড়িতেই দেখেছি আমি। আবছা মনে আছে। আমাদের বিয়ের কার্ডও পৃথ্বীশকাকার আঁকা। আমাকে স্নেহ করতেন। একেবারে মনে নেই শক্তি চট্টোপাধ্যায়কে। অথচ ওনার তুমুল ডাক, ‘রত্না রত্না’ স্মৃতিতে রয়ে গেছে। কিছুদিন আগে জানতে পারলাম রত্না কাকিমা অবলা বসুর ভাইয়ের নাতনী।

৭)
ভালোলাগে আড্ডাবাজ মানবকাকুকেও। সেই ছোট থেকেই দেখছি যেন একইরকম রয়ে গেছে। অরুণকাকা লোকটা ভালোই ছিল, ছোটবেলায় আমার কবিতা পড়াতাম। আমাকে একটা বই উৎসর্গও করেছিল। কিন্তু একটু ইয়ের দোষ ছিল আর কী।

অতএব,

বুদ্ধিজীবিদের মিছিলে আমি কখনো যাবনা। আসলে আমার মনে হয় কবিতা, গদ্য বইয়ের পাতায় অথবা শিল্পের ভেতর দিয়ে যাঁকে পাওয়া যায় সেটাই ভালো। কারণ সেখানে তাঁরা আমাদের কাছে এত বড় হয়ে ওঠেন যে বাস্তব মানুষটা সেই জায়গায় পৌঁছতে পারেন না। সেখানে খারাপ লাগাটা আরো বেশি হয়ে ওঠে।

আসলে বুদ্ধিজীবিদের মিছিলেরও রঙ থাকে যা আপাতভাবে বোঝা যায় না। সরাসরি রঙ তাও একরকম। এ আরও ভয়ঙ্কর।


আসলে সমাজের উঁচুতলার মানুষদের দূর থেকে দেখাই ভালো। শুধু তাঁরা যখন সাধারণ মানুষের কথা বলেন, তাদের দুঃখ-দুর্দশার কথা আমার কেমন বিশ্রী একটা হাসি পেয়ে যায়...। অনেকটা বিরিঞ্চিবাবা গল্পের ওই ছেলেটার মতো।