Wednesday, September 30, 2015

জীবন-মরণের সীমানা ছাড়ায়ে

ছোট থেকেই রবীন্দ্রসঙ্গীত আমার পরম বন্ধু। কবে থেকে যে গল্পের বইয়ের মতো গীতবিতান পড়তাম মনেও পড়ে না। উচ্চারণ স্পষ্ট হওয়ার আগেই 'দেবতোতো' বিশ্বাসের গান শুনি। আমার চিরকালীন প্রিয় দেবব্রত, সুচিত্রা মিত্র এবং অবশ্যই আমার মায়ের গান। মা নিজেও একসময় সুচিত্রা মিত্রের ছাত্রী ছিলেন। আমার যেটুকু যা গান শেখা সবটাই মায়ের কাছে। ছেলেবেলা থেকেই দুঃখে-সুখে আমার আশ্রয় রবীন্দ্রসঙ্গীত। একেবারেই যাকে বলে রাজদ্বারে-শ্মশানে চ...। মায়ের গানের কথা লিখতে গেলে তো মহাভারত হয়ে যাবে। একবার মনে আছে, মা দোতলায় গান শেখাচ্ছে, আমি সিঁড়ির একদম নীচে দাঁড়িয়ে আছি। শুনে শুনে তখনই তুলে ফেললাম, আমার বড় প্রিয় গান - 'নিবিড় ঘন আঁধারে জ্বলিছে ধ্রুবতারা, মন রে মোর পাথারে হোস নে দিশেহারা'। আহা শেষের লাইনগুলো কী অপূর্ব - 'রাখিও বল জীবনে রাখিও চির আশা, শোভন এই ভূবনে রাখিও ভালোবাসা।' ভাগ্যিস আমার এমন একটা মা যে আমাকে রবীন্দ্রনাথকে উপলব্ধি করতেও শিখিয়েছে। নাহলে বাঁচতাম কী করে?

আমাদের বিয়েতে কোনো অনুষ্ঠান হয়নি। কেবল আশীষদা আর আমি গান গেয়েছিলাম আর ঝুমলাদিদি আর আমার এক বন্ধু সারু নেচেছিল। আমার খুব ভালো লেগেছিল এই অংশটা। আশীষদার গলা ভারী চমৎকার।

কালান্তরে থাকতে সি পি আই-এর নেতৃস্থানীয় কারোর এক স্মরণসভায় গান গাইতে হবে। অফিসে কল্যাণদা যথারীতি চেঁচিয়ে যাচ্ছেন কে গান করবে? কেউ একটা গান জানে না কী আশ্চর্য! আমি অনেকক্ষণ চুপ। ভাবছিলাম কেউ যদি হাত তোলে। কিন্তু কেউ আর হ্যাঁ বলে না। অগত্যা বললাম, আর কেউ না গাইলে এ অভাগা আছে। 'আছে দুঃখ আছে মৃত্যু' গেয়েছিলাম। প্রমোদ দাশগুপ্ত ভবনে মনে আছে। আমার আবার অমাইক গলা কী না। উতরে গেছিল আর কী। শুধু মায়ের কাছে ছাড়া কারোর কাছে শিখিনি এতে লোকজন একটু আশ্চর্যই হয়েছিল। এইজন্য আমি চিরকাল বাথরুমে গাই। যদিও বাথরুমে গাওয়ারও রিস্ক আছে। বিষ্ণুপুরে হস্টেলে থাকতে একতলার সব ঘর, রান্নাঘর পেরিয়ে বাথরুমে বসে রাত্তিরে যদি একটু শান্তিতে গলা ছেড়েছি কী ব্যস, থামা থামা। একমাত্র শ্বশুরবাড়িতে তিনতলার ছাদে গান করলে একতলায় নামলে টুনুমা বলত, বেশ গাইছিলি।

তবে যে গানের কথা মাঝে মাঝেই মনে পড়ে তা হল বাবার স্মরণসভায় ইরাবতীর গাওয়া গান। ইরাবতীর গলা ভারী মিস্টি। তার ওপর গানদুটোও খুব অদ্ভুত বেছেছিল। প্রথম গানটা গেয়েছিল, 'ছিন্ন শিকল পায়ে দিয়ে', আর তারপরে 'যারে নিজে তুমি ভাসিয়েছিলে'। বাবার মৃত্যুর পর সেই প্রথম চোখ দিয়ে জল পড়েছিল আমার। পরে আবারও ওদের বাড়িতে গিয়ে গানদুটো শুনেছি, অন্য গান ছাড়াও। যতবারই শুনি ওর মুখে, ততোবারই চোখে জল আসে আমার।

ইরাবতী আশীষদা আর ঝুমলাদিদির মেয়ে, অমিতাভ কাকা মানে কবি অমিতাভ দাশগুপ্তের নাতনী।

রবিবাবুর গান

আজ সকালে রবিবাবুর গান শুনলাম বিচিত্র গলায়, বিচিত্র সুরে কিম্বা অসুরেও বলা যায়। তাই তাকে রবীন্দ্রসঙ্গীত বলা যাবে না অন্ততঃ আমার বিচারে। অনেককাল আগে রবিবাবু যখন ঠিক রবি ঠাকুর হয়ে ওঠেননি, তাঁর গান নানারকমভাবে গাওয়া হত। কিন্তু সেসব সামান্য যা শুনেছি তা গান বলেই বিবেচ্য। আর এখন তাঁর গান নিয়ে যা হচ্ছে তা বাংলা গানের ব্যর্থতার আরেকটা দিগন্ত বলা যায়। রবীন্দ্রনাথের গান নিয়ে বহু আগেই পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে জাত গিয়েছিল দেবব্রত বিশ্বাসের। অথচ সেই কাজ একমাত্র তাঁরই সাজে। এবং তার সবকটিই সার্থক রবীন্দ্রসঙ্গীত। দেবব্রত যখন বলেন, ভেঙ্গেছ দুয়ার এসেছ জ্যোতির্ময় - তখন দিব্য সেই জ্যোতির্ময়কে দেখা যায়, অনুভব তো করাই যায়। দেবব্রত যখন গেয়ে ওঠেন, আকাশ ভরা সূর্য তারা তখন মনের আকাশে সূর্য-তারা সব টপাটপ জ্বলে ওঠে। দেবব্রত যখন ডাক দেন, শুধু তোমার বাণী নয় গো হে বন্ধু হে প্রিয়, মাঝে মাঝে প্রাণে তোমার পরশখানি দিও, তখন সে বন্ধুর সাধ্য কী, সব বক্তৃতা ফেলে তাড়াতাড়ি হাজির হয় প্রাণের মাঝে। অথচ এমন দেবব্রতকে 'ব্রাত্য' করা হয়েছিল রবীন্দ্রসঙ্গীতের দুনিয়ায়। আর আজ যারা রবিবাবুর গান নিয়ে ইয়ার্কি মারছে, নিজেদের লেখবার মত কলমের জোর নেই, গাইবার মত গলায় সুর নেই আর রবীন্দ্রসঙ্গীত বোঝার অনুভব শক্তি নেই তাদেরকে কী বলা যায় ভেবে পাই না, অথচ সর্বত্র তারা বেজেই যাচ্ছে, বেজেই যাচ্ছে। বাঙালির তালবোধ কোনোকালেই নেই, সুরটাও যাচ্ছে এবারে।

ছোটবেলায় প্রতিদিন আমরা গল্পের বই পড়ার মত গীতবিতান পড়েছি। অধিকাংশ গানই মুখস্থ ছিল, অনেকগুলো কন্ঠস্থও। আমি তো বাথরুম সিঙ্গার। কিন্তু যারা রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইতে চায় তাদের উচিত আগে কথাগুলো হৃদয়ে উপলব্ধি করা, সুরকে মরমে পৌঁছানো। আগে তো দেবব্রতর পায়ের নখের যুগ্যি হতে হবে, তারপরে এক্সপেরিমেন্ট। ভীষ্মলোচন শর্ম্মাদের জ্বালায় বেচারা রবি শর্ম্মার অবস্থা একেবারে যাচ্ছেতাই।


সত্য সেলুকাস...

Tuesday, September 29, 2015

দায়িত্ব অথবা থ্রিলারও বলা যেতে পারে/ হরি দিন তো গেল সন্ধ্যা হল পার কর আমারে

যেচে পরের মানে অপরের দায়িত্ব নেওয়া এবং যেচে গালে চড় খাওয়া অনেকটা সমার্থক। অনেকসময় চড়টা নিলেও খেতে হয় আবার না নিলেও। অন্ততঃ আমার নিজের অভিজ্ঞতাটা একেবারেই তাই।

বর্তমান -

আমার ঠিক পরপরই শঙ্করীদির ভাইরাল জ্বর ইত্যাদি হয়েছিল। আমি বারবার ডাক্তার দেখাতে বলেছিলাম তিনি দেখাবেন না। প্রথম কদিন কিনে খেয়েই চলল। আমার নিজের প্রায় বছরখানেক ধরে টানা একের পর এক এবং গত কয়েকমাস ধরে প্রায় প্রতিদিন ভুগে যে অবস্থা তাতে খুব বাধ্য না হলে রান্না করার মতো অবস্থায় নেই। এর আগে হয়েছে, যখন উনি আমাদের বাড়িতে থাকতেন না, আমার অসুখ করলে মেয়ে আর মেয়ের বাবা মিলে সামলে নিত। এখন উনি কাউকে কাজ করতেও দেবেন না, আবার সামান্য কিছু করতে বললেই উদয়াস্ত আমাকে মুখ করে যাচ্ছেন। একবারও মনে পড়ছে না যে উনি মাত্র কয়েকদিন অসুস্থ আর আমার টানা চলছেই। কারণ আমি মুখে কষ্ট হচ্ছে বলতে পারছি না, তাই ওনার ধারণা আমি দিব্য সুস্থ। উনি সারাদিন এই করে যাচ্ছেন আর আমি নিজেরই বাড়িতে চোরের মতো দিন কাটাচ্ছি। একবার রান্নার কথা বলেছিলাম, তো বললেন আমি নাকী অনেক বাসন করি, যেন আমি বাসন মাজতে পারব না। কী যে জ্বালা, পাছে ম্যালেরিয়া,ডেঙ্গু হয় তাই মায়ের জন্য রাখা বিছানা-মশারিও ছেড়ে দিয়েছি। তারপরেও গাল খেয়ে বেঁচে আছি।
এখন প্রায় বাড়ি থেকে পালাতে পারলে বাঁচি গোছের অবস্থা আমার।

অতীত -

এতো তাও অল্পের ওপর দিয়ে যাচ্ছে, এর আগে তো দায়িত্ব না নেওয়ার জন্য প্রায় এক ভদ্রমহিলার আত্মহত্যার চার্জ ঘাড়ে পড়েছিল বা এখনো পড়ে আছে। আমার এক অতি বড়লোক ননদ ছিলেন যিনি সামনে লক্ষ টাকার হীরের হার দেখাতেন তাঁর মধ্যবিত্ত আত্মীয়স্বজনকে। শুনেছি ভাইয়ের বউ খুব খারাপ হওয়ায় ভাইয়ের কপালের কথা ভেবে অনেক চোখের জলও নাকী ফেলেছেন। বাড়িতে আমার থেকেও বেশি দায়িত্ব নিতে হয় অবশ্য আমার এক জা-কে। সম্প্রতি দায়িত্ব নেওয়ার ক্রমাগত চাপে বেচারি কিছুদিন হল মানসিক অসুস্থই হয়ে পড়েছে। যাইহোক আমার অনেক সৌভাগ্য যে এই ননদ কখনো আমার বাড়িতে থাকেনি। কারণ ওই জায়ের কাছেই শুনেছি তাদের বাড়িতে কী কী কান্ড করেছে। সে বছর আমার জায়ের ছেলের মাধ্যমিক ছিল। তারমধ্যে শ্বশুরবাড়ির সবচেয়ে বড় জেঠিশ্বাশুড়ির এখন-তখন অবস্থা। এই ভদ্রমহিলা অল্পবয়সে যৌথ সংসারে এসে চিরকাল লাঠি ঘুরিয়ে গেছেন। এমনকী আমার ওই জায়ের ওপর চিরকাল অকথ্য অত্যাচার করে গেছেন। নিজের সন্তান ছিল না বলে অন্যদের সন্তান সহ্য করতে পারতেন না। অথচ বাড়ির সকলেই দেখেছি বিস্তর ভক্তিশ্রদ্ধা করত। কারণ এই পরিবারটা যখন বাংলাদেশ থেকে চলে আসে তখন নাকী তাঁরা স্বামী-স্ত্রীই সব করেছিলেন। কিন্তু এরজন্য  তৃতীয় পুরুষ পর্যন্ত সবাই কেন হাতজোড় করে থাকবে তা আমার মোটা মাথায় ঢোকেনি। আমি ছোট থেকেই মায়ের কাছে শুনেছি মায়ের দাদু ডঃ বেণীমাধব বড়ুয়ার বাড়িতে পার্টিশনের আগে পরে প্রচুর আশ্রিত ছিল। কিন্তু সেটা খুব স্বাভাবিক হিসেবেই তখনকার দিনে মনে করা হতো। দৈবক্রমে এদের বড়জেঠুও ছিলেন বেণীমাধব বড়ুয়ার তেমনই একজন আশ্রিত। এবং তাঁর চাকরিবাকরি করে কলকাতায় থাকা সবই হয়েছিল আমার মায়ের দাদুর কল্যাণে। একথা তিনি আমাকে নিজের মুখেই বলেছিলেন। তাই ভাবলুম এদের বরং আমার মায়ের দাদুর প্রতিনিধি হিসেবে আমার ওপরে কিঞ্চিৎ কৃতজ্ঞতা থাকা উচিত। কিন্তু দেখলাম না কোনদিনই। তবে আমার ওই জা-টা বড্ড বোকা, তাই চিরকাল পড়ে পড়ে মার খেল। আমাকেও কোনদিন বলেনি, তাহলে আজ ওর এই অবস্থা হতো না। যাইহোক, সেই জেঠিশ্বাশুড়ি তো এসে পড়লেন শেষ অবস্থায় আমাদের কাছে। মরণাপন্ন রোগী বাড়িতে ওদিকে আমার মেয়ের অ্যানুয়াল পরীক্ষা চলছে।

এদিকে তার কয়েকমাস আগে থেকে আমার সেই ননদ প্রতিদিন ফোন করছেন তাঁর দাবী যে স্বামীর মৃত্যুর পর ছেলে তাঁর ওপর অত্যাচার করছে তাই ভাই তাকে উদ্ধার করুক। প্রায় মাস তিন-চার ধরে দিনে চার-পাঁচবার কয়েক ঘন্টা করে ফোন চলছে। সে একেবারে থ্রিলার গল্পের মত। ছেলে সম্পত্তি কেড়ে নিয়েছে, এখন মেরে ফেলতে চায় ইত্যাদি। যতদিন অর্থ ছিল ততদিন অবশ্য আমাদের বিশেষ খোঁজটোঁজ করতেন না। কলকাতার দুটো ফ্ল্যাট বেচে তার তিনগুণ সাইজের দুটো ফ্ল্যাট কিনেছিলেন বাঙ্গালোরে, আর বেনারসে নিজেদের বাড়ি। যত দায়িত্ব যথারীতি আমাদের দুই পরিবারের। তবে এতদিনে আমার ওই জায়ের মাথায় বিন্দুমাত্র বুদ্ধি খুলেছিল, আমায় বলল, এনে বৃদ্ধাশ্রমে রাখুক, খরচা দিক সে যাইহোক, বাড়িতে রেখো না। তুমি যেরকম, কিছুদিন পরে তোমাকেই বাড়ি থেকে বার করে দেবে। তাই ছেলেমেয়ের পরীক্ষার ইত্যাদি বলে আমরা দুজনেই একটা বিষয়ে চুক্তি করলাম যে কিছুতেই বাড়িতে রাখব না, একদিনের জন্যও না। বাড়ির অন্যদের চোখে দায়িত্ব নিতে না চাওয়ায় খারাপ তখন আমরা হয়েই গেছি, দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে মানুষ তো মরিয়া হয়েই যায়। তারমধ্যে বাড়িতে একজন মারা যাচ্ছে, কী ভয়ানক অবস্থা।
বড় জেঠিমা মারা গেলেন। সেই খবর পেয়ে ওই ননদ নাকী খুব কান্নাকাটি করেছিল, স্বাভাবিক মায়ের মতো তো। যাইহোক তাঁকে জানানো হোলো যে আমরা কেউ তাঁকে এক দিনের জন্যও বাড়িতে থাকতে দিতে রাজি নই। পরেরদিন তাঁর বন্ধ ঘর থেকে সিরিয়াস অবস্থায় উদ্ধার করা হয়, হাসপাতালে মারা যান। এটা তাঁর ছেলের বয়ান। আমরা রাজি হলে হয়তো বেঁচে যেতেন তাই বুঝলাম আমরা দুজনে। এটা হত্যা না আত্মহত্যা জানিনা, দায়ী কে তাও না? তবে তালিকায় আমাদের দুই জায়ের নাম আছে তা বুঝেছি।

আর ওই বড় জেঠিমা তাঁর সম্পত্তির কানাকড়িও শ্বশুরবাড়ির কাউকে দিয়ে যাননি। আমি অবশ্য চিরকাল শুনে এসেছি আমার মেয়ের বাবা নাকী তাঁর নিজের ছেলের মতো! তা শেষসময়ে সেটা নিজের চোখেও দেখলাম। আর যে মেয়েটা সারাজীবন মার খেল তার ভাগ্যেও কিছু জুটবে না সেটা বেচারী সহ্য করতে না পেরে অসুস্থই হয়ে পড়ল এই অসম্মানে। তাঁর পরেও সেই জেঠিমা নিত্য পুজিত।

বাব্বা যৌথ পরিবারের খুড়ে খুড়ে নমস্কার।

ভবিষ্যত -

এখনও আছেন এক মাসি। তিনি বিয়ে করেননি। নিজের টাকা প্রচুর এবং যথেচ্ছ নয়ছয় করেন। আমার অসুখের সময় এসে ফোঁস ফোঁস করে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে গেলেন আমি তো একাই থাকি, আমাকে কে দেখে। অথচ যখনি দরকার-অদরকার হয় বউমা আজ থাকব। কী মুশকিল, আমি কি ওনাকে বিয়ে করে ছেলেপুলে হতে বারণ করেছিলাম? আমাকে লোকে যদি একটু যত্ন-আত্তি করে তারজন্য কম পরিশ্রম তো করিনি, বিয়ে করেছি খেটেখুটে, মেয়ে হয়েছে। কষ্ট না করলে কেষ্ট পাওয়া সোজা নাকী?

এনার শেষসময়ে আমার হাল কী দাঁড়ায়, কতটা দাগী আসামী তাই ভাবি মাঝে মাঝে!


হরি দিন তো গেল, সন্ধ্যা হল, পার করো আমারে...

লেগে যা লেগে যা

ইদানীং প্রায়ই দেখি নিজেদের মধ্যে গোষ্ঠীদ্বন্দ্বে পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতাসীন দলের লোকেরা মরছে। এভাবে কিছুটা ময়লা সাফ হলে মন্দ না। তবে মরে অবশ্য সবসময়েই উলুখাগড়ার দল। নেতারা এ সি ঘরে বসে রাজ্য চালান। আহা, তাঁদের নিজেদের মধ্যে একটু ভালোরকম লেগে যাক, বেশ ধপাধপ ধপাধপ মরতে থাকুক। লোকসংখ্যা যত্ত কমে তত্ত ভালো।


লেগে যা লেগে যা, নারদ নারদ...

বাজারি লেখা

আজকাল লেখালেখি করে সম্মান অথবা অর্থ পেতে গেলে দু'তিন রকমের নিয়ম নিষ্ঠাভরে মেনে চলতে হয়। হয় বাজারি হতে হবে, নয় বুদ্ধিজীবী হতে হবে, নাহলে অন্ততঃ বুদ্ধিজীবী বা রাজনৈতিক ধামাধরা হতে হবে। নাহলে ভালো লিখলেও প্রকাশকেরা পুছবে না। তাঁরা দৌড়াবেন তুলনায় নিম্নমানের বাজারি লেখার দিকে অথবা প্রচারের আলোকে থাকা বুদ্ধিজীবীদের দিকে। আমার সুচিত্রা ভট্টাচার্য কী তিলোত্তমা মজুমদারের অধিকাংশ লেখাই খুব নিম্নমানের লাগে। কিন্তু এঁরাই জনপ্রিয়, যাকে বলে হটকেক। আমার মায়ের নাম পর্যন্ত অধিকাংশ মানুষই জানেন না। অথচ বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ লেখিকা এই তকমা পাওয়ার যোগ্যতা তাঁর কলমে আছে। কিন্তু তিনি বাজারি লেখা লেখেন না। এ সি ঘরে বসে সাধারণ মানুষের জন্যে চোখের জল দেখিয়ে লেখেননি, বরং যাঁদের কথা লিখেছেন তাঁদের সঙ্গে সত্যিকারের মিশেছেন তাঁদের মুখে নিজের ভাগের ভাত তুলে দিয়েছেন। দেশ-বিদেশ ঘোরার মত অর্থ তাঁর কোনোদিনই ছিল না। কোনোদিন কারোর ধামা ধরেননি। অতএব তিনি মারা গেলে কোথাও এক কলমও লেখা হবে না, বাংলা সাহিত্যে গেল গেল রব উঠবে না। তাই যখন কোনো প্রকাশক অথবা লেখক আমার মায়ের নাম আলপনা ঘোষ বলিনি কেন জিজ্ঞাসা করেন, আমিই আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞাসা করি আপনি চেনেন নাকি তাকে? মানে তাঁর প্রকাশিত বইয়ের তালিকায় কিন্তু মায়ের বই থাকে না।


আমার মাকে নিয়ে আমি অন্ততঃ খুবই গর্বিত। কারোর কাছেই কলম বেচেনি বলে। আর বাংলা সাহিত্যে বেঁচে থাকতে সত্যিকারের সম্মান খুব কমই পেয়েছেন গুণীজনেরা। এ আর নতুন কথা কী। একমাত্র দেবেশ মামা আর রুশতীদিকে দেখেছি মায়ের লেখার সত্যিকারের কদর করতে, আর কাউকে নাহ্‌।

Monday, September 28, 2015

স্বপ্নের ফেরিওলা

এদিকে তো রাজকন্যা গুলিসুতো খেয়ে ফেললো থুড়ি ডিজিটাল ইন্ডিয়া হয়ে গেলো। ভাত-ডাল, নিদেনপক্ষে জলও জুটবে না, ওদিকে আন্তর্জালে দেশ ছাইল। মন্ত্রীমশাই বিদেশে গিয়ে এমন ভেল্কী দেখাচ্ছেন, সত্যি এযাবত কেউ স্বপ্নেও ভাবেনি। ওই যাহ্‌, স্বপ্নের কথা বলতেই মনে পড়ে গেল, কেষ্টপুরে মেয়েকে নিয়ে বাসের জন্যে দাঁড়িয়ে আছি আর মাইকে দিদির স্বপ্ন বাজছে। দিদি স্বপ্ন দেখছেন আর দেখাচ্ছেন - আগামী বর্ষায় আর ভেনিস নয়, কলকাতা লন্ডন হচ্ছেই হচ্ছে। শুধুই স্বপ্ন দেখে যেতে হবে্‌...। যেত্তেই হবে...। ধুত্তোর মাথার মধ্যে কেমন ক্রমশঃ চিড়বিড় করাটা বাড়ছিল, এমনিতেই শরীরটা জুতে না থাকলে মাথা একটুতেই গরম হয়, তারমধ্যে একদিনে এত ওভারডোজ!

ভাগ্যিস বাসটা এসে গেল। বক্তার গলা টিপে দিতে ইচ্ছে করছে সেই মুহূর্তে চেঁচিয়ে মেয়েকে বলছিলাম।


যাকগে, এ যাত্রা বেঁচে গেল। ফের যদি স্বপ্ন স্বপ্ন বলবি তো তোর একদিন কী আমার একদিন এই না বলে...

বিচার

মানুষকে ভালোবাসা যেতে পারে, মন্দবাসাও। কিন্তু কাউকে বিচার না করাই ভালো। জীবনে একজনকে আমি কোনোদিন ভালোবাসতে পারিনি, এমন কী ক্ষমা করতেও পারিনি। ব্যক্তিগতভাবে আমার মনে হয়েছে সে আমার যা ক্ষতি করেছে আজ পর্যন্ত আর কেউ তা করেনি। তিনি আমার মাতৃস্থানীয়া একজন এইটুকুই শুধু বলতে পারি। সেইসময়ে আমার মানসিক স্থিতি পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গিয়েছিল, এবং যে আমি কোনোদিন বড়দের মুখের ওপর কোনো কথাই প্রায় বলিনা, সেই আমিও খুব মন্দ কথা বলেছি এবং খারাপ ব্যবহার করেছি নিয়মিত। তারপর দীর্ঘ চিকিৎসায় সুস্থ হয়ে উঠলেও সেই ঘটনার রেশ আজও আমার মনে আছে। আমার মানসিক স্থিতি নষ্ট হওয়ার জন্য একমাত্র উনিই দায়ী ছিলেন বলিনা, কারণ আমার এপিলেপ্সি এবং হিস্টিরিয়ার দীর্ঘ ইতিহাস ছিল। কিন্তু তাঁর শারীরিক-মানসিক অসুস্থতার কোন দায় বহন করার দায় আমার ছিল না, যা আমাকে বাধ্য হয়ে করতে হয়েছিল। তাঁর শারীরিক অসুস্থতার সময়ে আমার পক্ষে যখন যেটুকু করা যায়, সুস্থ থাকলে করেছি। আমার মৃতদেহ ছুঁতে একটাসময় পর্যন্ত আতঙ্ক হত এমন কী দেখতেও, তাও কাটাতে হয়েছে তার ক্ষেত্রেই। মারা যাবার পর একেবারে মনখারাপ লাগেনি  তা বলব না, যেটুকু লেগেছিল সেটুকু সত্যি ছিল, তা হয়ত একসঙ্গে দীর্ঘদিন বসবাসের পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া হতে পারে। কারণ মৃত্যুর কিছুদিন আগেও যখন আমার হাত ধরে জিজ্ঞাসা করেছেন, তুমি আমায় ভালোবাস তো? আমি চুপ করে থেকেছি, মিথ্যা কথা বলতে পারি না তাই। করুণা হয়েছিল সেদিন এইটুকুই। সেই অর্থে আমি ভীষণ নিষ্ঠুর তো বটেই।

আমি তাঁর জায়গায় দাঁড়িয়ে পরে ভেবে দেখেছি হয়তো ওই আচরণ অস্বাভাবিক ছিল না। যদি অস্বাভাবিককে স্বাভাবিক বলে ভেবে নেওয়া যায়। নিজের জায়গায় দাঁড়িয়ে মনে হয়েছে, এখন হলে ইগনোর করতাম, তখন ফালতুই অতিরিক্ত গুরুত্ব দিয়ে নিজের অসম্ভব ক্ষতি করেছি।

সবচাইতে ক্ষতি হয়েছিল আমার লেখালেখির। যেকোনকারণেই হোক সেইসময় থেকে আমার কবিতা লেখা একেবারে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। গদ্য লেখাতে ফিরতেও সময় লেগেছিল।

এতবছর পর যে মানুষটা আমার কবিতা ফিরিয়ে দিয়েছে তার কাছে আমি অসীম কৃতজ্ঞ। কে জানে একটু একটু করে পুরোনো বাধাগুলো পেরিয়ে আসছি যখন, অল্পবয়সের সেই অস্বাভাবিক দিনগুলোর স্মৃতিও কাটিয়ে উঠব নিশ্চয়।

আমি নিজে ভালো বা সবাইকে ভালোবাসতে পারি এমনটা মনে করিনা কখনোই। ভালোমন্দে মিশিয়েই মানুষ হয়। আমিও মানুষ মাত্র। একেবারেই ছাপোষা।


শুধু বুঝেছি কাউকে বিচার করতে নেই। বিচার করবার কোনো অধিকারই নেই।