Wednesday, March 23, 2016

মায়া

দিন চারেকের ভ্রমণ শেষে ব্যাগ গুছিয়ে বেরিয়ে আসার সময় শূন্য ঘরের দিকে চেয়ে বুকের মধ্যে মোচড় দিল। মেয়েকে বলি, দেখ দুদিনের জন্য আসা, তবু কোথায় যেন মায়া পড়ে যায়। সেও সায় দেয় আমার কথায়।

অমন আমার প্রত্যেকবার হয়, যখনই কয়েকদিন একই হোটেলের ঘর ছেড়ে অন্য কোথাও যাওয়ার জন্য রওনা দিই। তা লেহ্‌-র সেই ফ্রি আপেলের হোটেল হোক কী আন্দামানের পোর্টব্লেয়ারের অথবা সদ্য ফেলে আসা পুরী। আমার জীবনের ওই যে কয়েকটা মুহূর্ত রয়ে গেল ওই ঘরে, বারান্দায়, নীচের খাওয়ার ঘরে, ম্যানেজার কী রান্নার ঠাকুরের সঙ্গে গল্পে, দরজা পেরিয়ে গলিটায় পড়েই ডানহাতের চায়ের দোকানে, আরও এগিয়ে সমুদ্রের বেলাভূমি শুরু হওয়ার আগেই ডাবের দোকানটার বেঞ্চিটায়, বেলাভূমি ধরে আরও এগিয়ে সমুদ্রের ধারের সারি সারি পাতা চেয়ারে, সাগরের জলে ভেজা বালিতে, রাতের অন্ধকারে ভেসে আসা সাদা রঙের ফেনায় আর বাতাসের নোনা গন্ধে। ওই যে স্বর্গদ্বারে শ্মশানে চিতার ধিকিধিকি আগুন জ্বলছিল, ওরই পাশ দিয়ে গলির পথে, সমুদ্রের ধারের দোকানগুলোয়, জগন্নাথের মন্দিরের ভেতরে দাঁড়িয়ে কোণার্কের স্থাপত্যের সঙ্গে তুলনা করছিলাম যখন, চৌষট্টি যোগিনী মন্দিরের বয়স্ক গাইডটির কাছে যখন তৃতীয়বার মূর্তিগুলোর নাম শুনছিলাম আর এত ছোট পরিসরে মুক্ত আকাশের নীচে ঝাঁ ঝাঁ রোদ্দুরে অদ্ভুত এই মন্দির-মূর্তি আর ঠিক তার আগে ধৌলিতে অশোকের শিলালিপি দেখে আমার স্বভাবগতভাবে যথারীতি আশ্চর্য হচ্ছিলাম, অবাক হচ্ছিলাম রঘুরাজপুরের শিল্পীদের কুশলতায় আর পিপলির ঝলমলে সব হাতের কাজে - আমার সেইসব মুহূর্তগুলো যে রয়ে গেল ওইখানের মায়ায়।

যাওয়ার সময় দেহখানাও রেখে যেতে হবে। অথচ কত মায়া! মায়ার কোনও নারী-পুরুষ ভেদ নেই, দেশ, জাতি, ধর্ম কিচ্ছু নেই। আছে শুধু বড় অদ্ভুত এক অনুভব। কারোর বা মায়া তার চৌহদ্দিটুকুর মধ্যেই আর কারোর মায়া সারা পৃথিবীর ধূলিকণা, মানুষজন, পশুপাখির প্রতি। কুয়াশামাখা ভোরের একটা মায়া আছে, যেমন আছে শীতের শেষ বিকেলের রোদের অথবা বৃষ্টি শেষের ভেজা মাটির সুবাসে। কোনও কোনও মানুষের চোখের তারাতেও অদ্ভুত এক মায়া থাকে। মায়া থাকে গাছের পাতার সবুজে আর তার বুনোগন্ধে।

আমার মেয়ে কলকাতার থেকে অজন্তা-রাজস্থান সর্বত্র রাস্তার কুকুরের গায়ে-মাথায় হাত বোলায়। ছানা দেখলে, মা না বকলেই কোলে তুলে নেয়। পুরীর সমুদ্রের তীরে এন্টারটেনমেন্টের জন্য যে উট নিয়ে ঘুরে বেড়ায় মালিকেরা, তাদের মুখ কেন পুরো আটকে দেওয়া সেই নিয়ে খুব রেগে গেছে সে। জিজ্ঞাসা করে জানা গেল, উট নাকি কামড়ায়! কিন্তু রাজস্থান থেকে লাদাখ কোথাও উটের এমন দশা দেখিনি। খামোখা পুরীর উটেরা কেন কামড়াবে আমাদের মাথায় কিছুতেই ঢুকল না!

ফিরে এসে ঘরে বসে শুনি পাড়ায় দোল খেলার হইচই।

গত প্রায় দশ বছরেও এর সঙ্গে আমার কোনও যোগাযোগ তৈরি হয়নি। পুজো হয়, দোল হয়, মাঝে মাঝে ফাংশানও হয়। পাড়ার পুরোনো মানুষজনের পরস্পরের মধ্যে খুব ভালো মেলামেশা। আমাদেরও ডেকেছেন। কিন্তু আমি কখনও কোথাও মিশতে পারি না বা পারিনি আমার বসবাসের চৌহদ্দিতে।

বোধহয় পথেই আমার মায়া।

বাড়ি ফিরে খবরের কাগজের পাতা ওলটাতে গিয়ে মনে হল, এই যে এতগুলো সম্পূর্ণ অপরিচিত মানুষকে বোমায় ছিন্নভিন্ন করে দিল, যারা মারল আর যাদেরকে মারল তাদের মধ্যে এই মৃত্যুটুকু ছাড়া কোনদিন কোনও বিদ্বেষের সম্পর্ক ছিল না। ভালোবাসার সম্পর্কও ছিল না ঠিক।
কিন্তু এতগুলো মানুষকে নির্দ্বিধায় মারতে একটুও কি মায়া হল না ওদের? ওরাও যে মানুষ ছিল।

আর এইসব লিখতে লিখতেই বীরেনরা সদলবলে আবির নিয়ে হাজির।
এবার রঙের মায়ায়...

Thursday, March 17, 2016

ভালোবাসার মৃত্যু ও বিশ্বাসের জন্মের কাহিনি

পুরোনো বাড়ির নোনাধরা দেওয়ালে যে শিকড় গজিয়েছিল, সেই গাছের নাম রেখেছিলাম ভালোবাসা। নিতান্ত অবহেলাতেও বসন্তে তার সারা শরীর জুড়ে কচিপাতা এসেছিল। বাড়িটা রঙ হল নতুন করে। পুরোনো গাছের শেকড় উপড়ে তার সবুজ ডাল মুচড়িয়ে সে এক হইহই কাণ্ড। ছেঁড়া শেকড়ের দু-একটা রক্তাক্ত গোড়া রয়ে গিয়েছিল ইট-কংক্রিটের অনেক গভীরে। রঙের তীব্র গন্ধে তাদের নিশ্বাস আসছিল বন্ধ হয়ে। এতসব ঝড়ঝাপটা সামলিয়ে কোনোমতে বেঁচে রইল একটি শিকড়। হঠাৎ একদিন বৃষ্টি এল, সারারাত ধরে তুমুল বৃষ্টি। জলে ভিজতে ভিজতে খুশিতে হেসে উঠল সে। পরদিন ভোরবেলায় একটা কচি ডাল দুটো-একটা পাতার কুঁড়ি মাথায় নিয়ে খুব ভয়ে ভয়ে রঙের আস্তরণ সরিয়ে সূর্যের দিকে মুখ তুলল। সেই থেকে ওর নাম রেখেছি বিশ্বাস।

Wednesday, March 16, 2016

ওষুধ খাওয়ার ঝকমারি

রাতের মোট সাতটা ওষুধের মধ্যে সুগারের একটা, প্রেশারের দুটো, ফাইব্রোমায়ালজিয়ার তিনটে আর সাইক্রিয়াটিক ড্রাগ একটা। দিনে আবার সুগারের দুটো ওষুধ আছে যার একটা হচ্ছে রাতের ওষুধ আর দিনের অন্য ওষুধটার মিক্স কম্বিনেশন। এটা দেখতে অনেকটা রাতের ওষুধটার মতো। আবার প্রেশারের একটা ওষুধ আর ফাইব্রোর একটা ওষুধ প্রায় একইরকম দেখতে। মানে ব্যাপারটা অনেকটা দাবা খেলার কালো ঘরের গজ আর সাদা ঘরের গজের মতো। হয়তো দেওয়া উচিত ছিল সাদা গজ আর উল্টোদিকের ঘোড়াটা, ঘোড়া যদিবা ঠিক গেল গজ গেল উলটে। ব্যস আর যায় কোথায় ঘোড়া, মন্ত্রী সব খেয়ে সে এক যাচ্ছেতাই কাণ্ড। তাই আমি রাতের ওষুধ খাওয়ার সময় সাধনার মতো বসি। খেয়ে উঠে কিছুটা ফাঁক। মানে এরপর অনেকটা জল গিলতে হবে তার প্রস্তুতি। এরপরে কী কী ওষুধ খেতে হবে সেগুলো বাক্স থেকে বের করে একদিকে জড়ো করা। এই সময় থেকে কারোর কোন কথা বলা চলবে না। দু-একদিন উত্তর দিতে গিয়ে ভুল ওষুধ খেয়ে ফেলেছি। এরপরে ঠিক ঠিক সিঙ্গল বা ডাবল বের করা। এরও একটা সিকোয়েন্স আছে সুগার, প্রেশার, ফাইব্রো, সাইক্রিয়াটিক। এরপরে একটা করে বিষয়ের ওষুধ একটি বা দুটি, যেটা যেমন, তা খেয়ে সেইটা বাক্সে তুলে রাখা। মানে একটা একটা দান দেওয়ার মতো। সবকটা শেষ হলে একটি বৃহৎ দীর্ঘশ্বাস। যাক, আজকের মতো খেল খতম।

যে রাতে মোর দুয়ারগুলি!

গতকাল রাত্তিরে খুব ঝড়-বৃষ্টি হয়েছিল। আর তখনই ঈশ্বর এসেছিলেন আমার ঘরে।

সকালে ঘুম থেকে উঠে ঝকঝকে রোদের দিকে চেয়ে ভাবছিলাম স্বপ্নটা বেশ।

তারপরেই জানতে পারলাম শেষরাতে প্রবল শিলাবৃষ্টি হয়েছে।

দরজা তো দূরের কথা কোনও জানলার আধখানা কাঁচ পর্যন্ত ভাঙেনি বন্ধ থাকায়।

ভারী দুঃখ হল ঈশ্বর বেচারার জন্য শেষরাত্তিরে প্রবল বৃষ্টিতে ভিজে, মাথায় শিলের বাড়ি খেয়ে কাঁপতে কাঁপতে ফিরে গেছেন।


আর কোনদিনও এই রিস্ক নেবেন!

নিঃশব্দ?

আসলে শব্দ ছাড়া কিচ্ছু প্রায় নেই। এই প্রায় শব্দটা বোধহয় খিদে শব্দটার জন্যই। শব্দ আছে বলেই তোমার-আমার দেশ আছে ধর্ম আছে পতাকা আছে পার্টি আছে ভোট আছে চুরি আছে ডাকাতি আছে ঘুষ আছে গণহত্যা আছে ধর্ষণ আছে রাজনীতি আছে আত্মহত্যা আছে যুদ্ধ আছে ভালোবাসা আছে ঘৃণা আছে যৌনতা আছে। অথবা কিচ্ছু নেই। কারণ কিছু কিছু মানুষের এর কোনটাই থাকে না। যাদের জন্য মানুষ শব্দ ব্যবহৃত হয়না বলেই মানুষ হয়ে ওঠে তারা। অথবা কিছুই হয়না। মাথার ওপর পাখা ঘোরে বাতাসে শব্দের আলোড়ন সৃষ্টি করে। ছেলেবেলায় জানলার ধারে কান পাতলে রেলগাড়ির চাকায় সব কথা সব শব্দ সব গান শোনা যেত। সেই কবে স্কুলে পড়তে ফিজিক্সের মাস্টারমশাই টিউনিং ফর্কে আওয়াজ তুলে শব্দের বিজ্ঞান বোঝাতেন। সেদিন আমার মেয়ে স্কুল থেকে ফিরে খুব রেগে বলল, ওদের স্কুলের ছেলেদের বিভাগটা নাকি নাম ডোবাবে। কীরকম জিজ্ঞাসা করতে জানায়, স্কুল থেকে কোথায় একটা নিয়ে গিয়েছিল, সেখানে অন্য সব স্কুল সব প্রশ্নের কেমন চমৎকার উত্তর দিয়েছে আর যেই না ওদের ছেলেদের জিজ্ঞাসা করা যে শব্দ কী করে হয়, একজন সঙ্গে সঙ্গে দুহাতে তালি বাজিয়ে বলেছে, এইভাবে। আমি শব্দ করে হেসে বলি, এক্কেবারে ঠিক বলেছে তো।

শব্দ নিয়ে ভাবতে গেলেও সেই রবি ঠাকুরকেই মনে পড়ে যায় আবারও। সেই যে আমি কবিতার শেষে বলেছিলেন, তখন দূরে দূরান্তে অনন্ত অসংখ্য লোকে লোকান্তরে এ বাণী ধ্বনিত হবে না কোনখানেই। সেই আর কী আমি যদি নাই থাকলাম, হাততালিটা দেবে কে? কিন্তু এদিকে মানুষে মানুষে ছুড়ি-বোমার শব্দের প্রতিধ্বনিতে মানুষ শব্দটা টুকরো টুকরো থেকে গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে বহু শতাব্দী প্রাচীন চিত্রের মত বেমালুম নেই হয়ে যাচ্ছে। অজন্তার ক্ষয়ে যাওয়া বোবা অথচ গল্প বলা ছবিগুলোর সামনে দাঁড়ালে কেমন অতীত আর অনিবার্য ভবিষ্যত একসঙ্গে ফুটে ওঠে চোখের সামনে। আরও একশো-দেড়শো বছর পর শূন্য গুহাগুলো নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে থাকবে। আর এই শব্দময় পৃথিবীতে শব্দ আরও শব্দ জমতে জমতে আমরা কবে একদিন নিঃশব্দ হয়ে যাব।
হয়ত সেদিনও কোথাও টিনের চালে বৃষ্টি পড়বে।

কিন্তু সেদিন আর কারো খিদে পাবে না। অথবা কবিতা লেখা হবে না।


Tuesday, March 15, 2016

লিখতে লিখতে লিখতে লিখতে...

সেই কবে ছোট্টবেলায় মা হাতে ডায়েরি আর পেন দিয়ে বলেছিল, লেখো। সেই থেকে যা পাই হাতের কাছে তাতেই লিখি। যা মনে আসে তাই লিখি। ডায়েরি, খাতা, সাদা বা রুলটানা কাগজ, খবরের কাগজ বা ছেঁড়া কাগজের টুকরো, মেয়ের স্কুলের পুরোনো খাতার শেষের দিকে খালি পৃষ্ঠা, পুরোনো হলদে হয়ে যাওয়া ছোটো রাইটিং প্যাডের পাতা, দোকান থেকে কিনে আনা ঝকঝকে রাইটিং প্যাড, ডেস্কটপে ওয়ার্ড ফাইলে, ল্যাপটপে, নেটবুকে, ফোনের নোটে। নাহ্‌, কিচ্ছু বাদ দিই না। আমার সর্বগ্রাসী কলম, কলম না পাওয়া গেলে পেন্সিল আর এছাড়া কী বোর্ড কেউ রেহাই পায় না আমার হাত থেকে। লিখতে লিখতে খাতা ফুরায়, ডায়েরি ফুরায়, নেটবুক দেহ রাখে, তবু আমি থামি না। যেমন, এখন যে নেটবুকে লিখি তার বিস্তর ঝামেলা আছে। প্রথমতঃ কারসরটা যখন ইচ্ছে, যেখানে ইচ্ছে চলে যায়। মানে আমি লিখতে গিয়ে 'আ' পড়ল ঠিক জায়গায় তো একলাফে পাঁচলাইন উঠে গিয়ে কোন একটা শব্দের ফাঁকে গিয়ে 'মি' দিব্বি বসে পড়ল। এবার বোঝো ঠ্যালা। 'আমি' ভেঙে গেলে জোড়া দেওয়া কি সহজ কর্ম? এরজন্য বার তিনেক তাকে দোকানে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। ফলে তার কী-বোর্ড বারদুয়েক, মাউস প্যাড আর স্ক্রিন একবার বদল করা হয়েছে। মানে অনেকটা সেই পুরোনো ছাতার গল্পের মতো। এছাড়াও কারসর যাতে সরে না যায় সেইজন্য বিশেষ সফটওয়ার ইনস্টল করা হয়েছে। এরপরেও সে লাফায় বটে, কিন্তু কম। মানে সহ্য করে নেওয়া যায়। এর পাশাপাশি আরেকটা গভীর সমস্যা হল, লেখার বেশ কিছুটা নিজেই মাঝে মাঝে সিলেক্ট করে ডিলিট করে দেয় মুহূর্তের মধ্যে, যেন ওর ইচ্ছেমতো আমায় লিখতে হবে। কী ভাগ্যিস 'আন ডু' অপশন আছে। ওর সাজেশন নিতে আমার ভারী বয়েই গেছে। ওই সমস্যা খানিক মিটে যাওয়ার পর তার নতুন বায়না হয়েছে কথায় কথায় হ্যাং করে যাওয়া। মানে গভীর ভাব নিয়ে তাকে খুলে বসলাম তো লিখল মাইক্রোসফট ওয়ার্ড নট রেসপন্ডিং। এবার লাও ঠেলা। রেসপন্ড করতে করতে গোটাকতক কাজ, বাথরুমে যাওয়া, রান্নাঘরে একবার ঘুরে আসা সব হয়ে গেল। ভাব তো ডানা মেলে উড়ে চলে গেল, এবার যাও ধরে আনো তাকে। তাই হাতের কাছে মোবাইল ভরসা। নোটে লিখেই যাই দিন-রাত যখন যা মনে আসে, আধখানা কবিতা থেকে বাসে করে যেতে যেতে পথের দেখা। এর কিন্তু কোন ব্যাকআপ নেই। আসলে আমার অধিকাংশ লেখার কোন ব্যাকআপ নেই। মাঝে মাঝেই পুরোনো লেখার খোঁজে হারিয়ে যাওয়া খাতার সন্ধান করতে করতে বাড়ি মাথায় করি। কিছু পাই, কিছু পাইনা। এরা আমার অধিকাংশ লেখার মতোই অপ্রকাশিত। একমাত্র এক খাতা কবিতা আছে, বিভিন্ন ডায়েরির পাতা থেকে টুকে রাখা। যদিও সেও আমার নিজের কাজ নয়। আমার ধৈর্যই নেই অত।

নিজের উদ্যোগে লেখা প্রকাশ করাও আমার হয়ে ওঠে না। হতে পারে স্রেফ আলসেমী। ওই একত্রিত কবিতার খাতাটা দেখার পর বাবা বেশ কিছু কবিতা বিভিন্ন ছোট পত্রিকায় পাঠিয়েছিল। সেসব প্রকাশিত হয়েছিল। আর খুব ছোটবেলায় একটা কবিতা স্থানীয় পত্রিকায় বাবা দিয়েছিল, বেরিয়েছিল। কিছু কবিতা প্রকাশের পর কিছু গল্প দিলাম। সেও বেরোলো, কিন্তু ইতিমধ্যে আমার উৎসাহ আবার ফুরালো। আসলে ছোটবেলায় যাই লিখি, বাবা-মা বলত, আরও ভালো লেখ, তারপরে ভাবা যাবে। আমার আর আমার বন্ধু সারুর দুজনেরই ছিল একই মুশকিল। ওর বাবা লেখেন আর আমার মা-বাবা উভয়েই। ফলে বাড়িতেই পরীক্ষক। দুজনের আলাপ হয়েছিল একটা গল্প-কবিতার আসরে। মানে বাবা-মায়েরা মঞ্চে আর আমরা দুজনে ফ্যা ফ্যা করে ঘুরে বেড়াচ্ছিলাম। তারপরে চিঠিতে দুজনেই দুজনকে এই ব্যক্তিগত ক্ষোভ জানাতাম। ওর বাবা পাস করায় না তো আমার বাবা-মা। যাইহোক ভাবতে ভাবতে বড় হয়ে গেলাম, কিন্তু লেখা ছাড়তে পারিনি। কলেজে হস্টেলে থাকতে বালিশের তলায় টর্চ থাকত। নাহ্‌, বাথরুম যাওয়ার জন্য নয়, রাতে উঠে বই পড়া বা লেখার জন্য। কখন ঘুমের মধ্যে লেখা বিড়বিড় করবে, ঘুম ভেঙে সঙ্গে সঙ্গে না লিখলে ভাব পালিয়ে যাবে না বুঝি? বড় হওয়ার পর লেখা প্রকাশ নিয়ে একেবারেই মাথা ঘামাইনি। কিছুদিন কাগজে চিঠিপত্র লিখলাম। তারপর সে পর্বও চুকে গেল। তবে এই সূত্রেই হয়ত সাংবাদিকতায় চলে এলাম। সেও আরেক যুদ্ধের গল্প। কিন্তু ভ্রমণ-এ চাকরি করার সময় রোজ মনে হত, দূর কী সব রাবিশ লিখছি। শুধু সময় নষ্ট। এরকম বিশ্রী মনোভাব নিয়ে কতদিন আর কাজ করা যায়, করলাম না। কিন্তু তারপরেও লিখে যাই। লিখতে লিখতেই আমাদের ছুটি হল। তারপরে মাথায় ঢুকলো পুরোনো ভ্রমণকাহিনি। বাবার পরেই যিনি লেখা প্রকাশের জন্য ঠেলা দিলেন, তিনি অবলা বসু। ভদ্রমহিলা আমাকে এত জ্বালিয়েছেন যে বলার নয়। অতএব তাঁর এবং আমার প্রথম বই একসঙ্গে বেরোলো। এবার এনাকে দেখে বাকিরাও তাগাদা দিতে শুরু করল। এদিকে ফেসবুকের পাতায় এত বকবক করছি দেখে বন্ধুরা ব্লগ খুলতে বলল। ফলে ওদিকে আমাদের ছুটি, এদিকে যা-ইচ্ছে-তাই  আর তারসঙ্গে আমাদিগের ভ্রমণ বৃত্তান্ত আমার কোমর গেল, পিঠ গেল, ইদানীং ঘাড়ও যাচ্ছে, মাথা তো কবেই গেছে...তবু লিখে যেতেই থাকছি...।

লিখতে লিখতে লিখতে লিখতে... নাহ্‌, আমার লেখক হওয়া হল না। না কবিতা না প্রবন্ধ না গল্প  না মেয়ের স্কুলের রচনা সব মিলিয়ে একে তো ঘোর জগাখিচুড়ি হয়ে বসে আছি, তার ওপরে লেখক হওয়ার জন্য কলম ছাড়া আর যা যা গুণ থাকা দরকার তা উত্তরাধিকার সূত্রেই আমি পাইনি। নাহ্‌, বোধহয় সেই অর্থে অনেক লিখেও আমার মা-ও লেখক নন। মায়ের প্রথম গল্প সংকলনের ভূমিকায় দেবেশ মামা যাই লিখুক, মায়ের গান প্রতুল মুখোপাধ্যায় যতই সুর দিন, মায়ের প্রথম উপন্যাস অশোক জাতক বেরোনোর বহু বহু বছর পর কারো কাছে এমন বই বাংলা সাহিত্যে কমই আছে, আমি পড়ে নিজে কিনে বন্ধুবান্ধবদের মধ্যে বিলিয়েছিলাম এমন পাঠক প্রশংসা শুনে যতই হতবাক হয়ে যাই, আমি কেন মায়ের পরিচয় আগে দিইনি বলে পরশপাথর-এর অরিন্দমদার কাছে যতই বকুনি খাই, আমি জানি আমার মা লেখক হতে পারেননি। কারণ লেখক হওয়ার জন্য ভালো লেখা ছাড়া আর যা যা গুণ থাকে তার কোনটাই মায়ের নেই। এও জানি, প্রায় ষাটের ঘরে পৌঁছে বছর দশেক ধরে একক চেষ্টায় যখন নিঃশব্দে দান্তের ডিভাইন কমেডির বাংলা গদ্যে অনুবাদ করে যাচ্ছেন তখন স্বাভাবিকতই অন্য লেখা কমে আসায় লেখক মহলে একটা অপপ্রচার ঘটেছিল যে মা নাকি লেখা ছেড়ে দিয়েছেন। কে বা কারা এই কাজ করেছেন আমার জানা নেই, তবে যাঁরা জানেন যে মা লেখা ছাড়েননি তো বটেই বরং দুরূহ একটি কাজ করছেন বাংলা সাহিত্যে তাঁরাও এর কোন বিরোধিতা করেননি। মা বলেছেন, আমি আর কী করতে পারি বল, লিখে যাওয়া ছাড়া। হ্যাঁ মা শুধু লিখেই গেছেন। সেই ছোটবেলা থেকে দেখে এসেছি উনুনে মাছের ঝোল চাপিয়ে প্রথম উপন্যাস লেখা বা চোখের জল ফেলতে ফেলতে সেই উনুনেই নিজের লেখা জ্বালিয়ে দেওয়া। এখনও লিখেই যান। সত্তর পেরিয়ে গেছে বেশ কয়েকবছর। কোমর ভেঙেছে, ডান হাত ভেঙেছে, হাই সুগার প্রেশার, স্কিনের অসুখ, অস্টিওপোরেসিস। কিন্তু মা লিখেই যান। ডান হাত ভাঙলে বাঁ-হাতে, চোখের ছানি কাটার পর্ব চলাকালীন একেকবার অন্য চোখটা দিয়ে দেখে। সত্যি বলতে কী মোবাইলে লেখার আইডিয়াটা মায়ের থেকেই নেওয়া। দান্তেকে কিছুদিন তুলে রেখে আবার একটা উপন্যাস শেষ করেছে্ন। গল্পও বেশ কয়েকটা এদিকে ওদিকে আবার বেরিয়েছে। ফাল্গুনীদার ওয়েব পত্রিকায় কবিতাও দিয়েছেন।

লিখতে লিখতে লিখতে লিখতে... আমি বুঝেছি আমার দ্বারাও মায়ের মতো লেখক হওয়া হবে না। তবু লিখতেই থাকব। ইদানীং হাতের গাঁটে গাঁটে ব্যথা হচ্ছে। ভয় করে, লেখা বন্ধ হয়ে যাবে না তো কোনদিন। ভীষণ ভয় করে আজকাল যখন সকালে উঠলে পুরো শরীর আড়ষ্ট হয়ে থাকে। লিখতে পারব তো? এই একটাই ভয় আমার।


কারণ শেষ পর্যন্তই আমি লিখে যেতে চাই। মানে লিখতে লিখতে লিখতে লিখতে...

Monday, March 14, 2016

আবারও শব্দকল্পদ্রুম!



শব্দের একটা ভারী মজার ক্ষমতা আছে। শব্দ আঘাত করতে পারে। মাঝে মাঝে তা ইট-পাটকেলের থেকেও জোরে। শব্দ আঘাত করতে পারে সর্বত্র মানুষের মন থেকে সমাজের কোন। বিশেষভাবে কোনও শব্দ বা অক্ষরাবলী ব্যবহার করার জন্য আজ পর্যন্ত কত মানুষের বিচার হয়েছে বা বিচারহীন শাস্তি হয়েছে আমার তার পরিসংখ্যান জানা নেই। তেমনই জানা নেই শব্দের জন্য কত বিপ্লব হয়েছে অথবা কত সম্পর্ক ভেঙেছে গড়েছে। যদিও খিদে শব্দটার মতো আর কোনো শব্দ এত ধাক্কা মারে কিনা তাও আমার জানা নেই। আসলে আমার জানা নেই কিছুই - এই শব্দের মণ্ডলে এলোমেলো ধুলোমাখা শব্দেরা ছড়াতে ছড়াতে কিছু ভেসে আসে মুঠোয়, কিছুবা হারিয়ে যায় শেষ বিকেলের মায়াময় রোদের কণার মতো। ধর্মনিরপেক্ষ শব্দটার মানে যারা কোনওভাবে বোঝেনি তাদের ঘরে ধর্ম কোন আলাদা ধ্বনি জাগায় না। ধর্ম অথবা দেশপ্রেমিক শব্দের চেয়ে খিদে শব্দটা ভারী, আরও ভারী হয়ে শরীরের সর্বাঙ্গে ছড়িয়ে যায়। খিদে শব্দের কোনও রঙিন পতাকাও হয় না। একেবারে রঙহীন ফ্যাকাসে একটা শব্দ সমগ্র অস্তিত্ব জুড়ে দেশ-কাল-পাত্র ভুলিয়ে দিয়ে শুধু কড়া নাড়ে। আর সব শব্দরা চাপা পড়ে যায় সেই সর্বগ্রাসকারী শব্দের ব্যঞ্জনায়। মাঝে মাঝে শব্দের টুকরোরা মাথার ভেতরে আঘাত করে। অনেক অনেক কন্ঠস্বর মিলেমিশে মাথার ভেতর একটা শব্দের লড়াই তৈরি করে, যে লড়াইয়ে শব্দরা কেউ জেতে না, আকন্ঠ ডুবে যেতে যেতে শ্বাস নেওয়ার জন্য নিঃশব্দ হাতড়ে বেড়াই। কখনও বাইরের শব্দেরা এসে মনের শব্দের সঙ্গে বিষম সংঘাত বাধায়। মনের শব্দগুলো জোড়া থেকে খুলে গিয়ে আলগা হাওয়ায় হারিয়ে যায় কোথায়। আবার শব্দ জুড়ে জুড়ে তৈরি হওয়া মায়াময় পৃথিবীতে শব্দরা ভেসে বেড়ায় নিঃশব্দে। কী আশ্চর্য, শব্দ না থাকলে নিঃশব্দের কোনও আলাদা অর্থ থাকত না। নিঃশব্দের গভীরে ডুব দিয়ে তুলে আনা যেত না শব্দের মণিমানিক। নিঃশব্দ তার শব্দবিহীনতা নিয়ে নিবিড়ভাবে কাছে টেনে নিতো না বা দূরে, আরও দূরে সরে যেতে যেতে ভূমণ্ডলের অপর প্রান্তে পৌঁছে দিত না।