Wednesday, September 9, 2015

ঈশ্বর এবং বুদ্ধিজীবি

ঈশ্বর লোকটি ভীষণ সুবিধাবাদী এবং প্রয়োজনমত তাঁর অবস্থান বদলান। ঈশ্বর ভীষণ মেপে কথা বলেন, ভেবে কথা বলেন, কারণ তাঁর প্রতিটা কথার মূল্য রয়েছে সাধারণ মানুষের কাছে। ঈশ্বর লালের সমালোচনা করে সবুজ হন, তারপর সবুজের সমালোচনা করে কোনো একটা নিজস্ব নেই রঙে বদলে নেন নিজেকে। কারণ লাল বা সবুজের থেকে অনেক বড় ঈশ্বরের নিজস্ব অবস্থান এবং তাঁর নিরাকার নিজস্ব রঙ। তাঁকে ঘিরে অজস্র ভক্তের দল স্তবগান করে। অবিশ্বাসীদের তিনি মধ্যে মধ্যে সীমিত দয়া দেখিয়ে থাকেন যাতে তাঁরা নিজেদের ভুল বোঝে অথবা নিন্দা করতে না পারে। কিন্তু স্তব যাঁরা করেন না, তাঁদেরকে খুব নম্র এবং ভদ্রভাবে আপন বৃত্তের বাইরে রাখেন। যারা উচিত কাজ করেন না তাঁরা শাসক হলেও কঠোর সমালোচনা করেন। তিনি জানেন, এতে তাঁর বিপদের কোনো আশঙ্কা নেই, ঈশ্বর তো সবসময় বিপদসীমার উর্দ্ধেই থাকেন, বিপদসীমায় থাকে সেইসব মেয়েরা এবং মানুষেরা যারা সমাজের নীচের তলায়। ঈশ্বর দীনভাবে থাকলেও মানুষ জানে তিনি আপারক্লাস সিটিজেন, যাঁদের সামান্য কিছু সমালোচনা ছাড়া আর কোনো আঁচড় পড়ে না গায়ে। ঈশ্বর শাসকের কঠোর সমালোচনা করেন, সেই শাসক লাল বা সবুজ যাই হোক না। ভক্তের দল তালে তালে মাথা নাড়ায় এবং ঈশ্বরের টি আর পি বাড়ে।


ঠিক এইজন্য ঈশ্বর অথবা বুদ্ধিজীবি কাউকেই বিশ্বাস করিনা আমি।

হোমওয়ার্ক

কালান্তরে কাজ করার সময় রোজ সকালে উঠে হোমওয়ার্ক করে যেতাম। মানে টিভি চালিয়ে সেদিনের প্রধান প্রধান খবরগুলো দেখে যাওয়া একঝলক অথবা তলার স্ক্রোলগুলোতে চোখ বোলানো। একেকদিন ইচ্ছে করত না, সেই তো একই খবরের এপিঠ আর ওপিঠ। সেদিন না পড়াশোনা করেই ইস্কুল থুড়ি অফিস যাওয়া।

সহকর্মী অমিতদা ছিলেন খবরের জাহাজ এবং অসম্ভব ভালো মনের মানুষ। পড়া না করে গেলে অমিতদার শরণাপন্ন। কিছুক্ষণের মধ্যেই অল্পকথায় পড়া তৈরি করে দিতেন।

সেই অমিতদাও কালান্তর ছেড়েছিলেন জানি, কিছুদিন টিভির এক চ্যানেলে ছিলেন। তারপরে আর খবর নেই। শেষবার ফোনে খুব অদ্ভুত কথাই কিছু একটা বলেছিলেন। কেমন একটা নিরুদ্দেশের সুর ছিল তাতে, জীবনের প্রতি অভিমানেরও।

আমার স্বল্পকালীন কর্মজীবনে যেকজন সত্যিকারের সাংবাদিককে দেখেছি তাঁদের মধ্যে অমিতদা অন্যতম। কিন্তু বাস্তবে অনেক কম মেধার মানুষ স্রেফ ধরতাইয়ের জোরে উন্নতি করেছে আর হারিয়ে গেছে অমিতদারা।

ভাগ্যিস এখন রোজ ন্যাশনাল আর ইন্টারন্যাশনাল নিউজ লিখতে হয়না, তাই টিভি বন্ধ করে রাখলেই চলে।

শুধু কাগজের পাতা ওল্টালে খবরের মান দেখে অমিতদাকে মনে পড়ে খুব।


ভাবি গেল কোথায় মানুষটা?

Tuesday, September 8, 2015

হেই মা দুগগা

বারাসাতে রিঙ্কু বাঁচাতে পারেনি নিজেকে। তাকে বাঁচাতে গিয়ে ভাই রাজীবকে মরতে হয়েছিল। মুন্না কিন্তু নিজের সম্মান বাঁচিয়েছে নিজেই। কিন্তু তারপরে কী হবে কাহিনির শেষে জানা নেই। গুন্ডারা চিরকাল ক্ষমতার পোষ্য। আগে তবু খানিক রাখঢাক থাকত, ইদানীং নির্লজ্জভাবে প্রকাশ্য। পুলিশও তথৈবচ।

শেষপর্যন্ত মুন্না থাকবে না তাকে এরপর খুঁজে পাওয়া যাবে না, জানিনা। কারণ সে প্রকাশ্যে প্রতিবাদ করেছে। অর্থাৎ রুমাল থেকে বেড়াল হয়েছে।

হেই মা দুগগা তোমার দশভূজে অস্ত্র মিছাই...।

তোমার মচ্ছব থুড়ি পুজো আসছে আর প্রতিবাদী দুগগারা ওদিকে হারিয়ে যাচ্ছে, মরে যাচ্ছে।

জাগো...তুমি জাগো...।

ছেঁড়া ঘুড়ি অথবা শৈশব-কৈশোর

একটা ছেলে ট্রেন ধরতে মায়ের সঙ্গে স্টেশনে যাচ্ছিল হনহনিয়ে, পিঠে স্কুলের ভারী ব্যাগ। তার সমবয়সীই আরেকটা ছেলের পিঠ ভর্তি ছিল ঘুড়ি আর লাটাইয়ে। সে ছুটছিল একটা কাটা ঘুড়ি ধরতে একা একাই।

এই দৃশ্য আমি দেখিনি, পিয়ালী দেখেছে। পিয়ালী বেশ দেখতে পায়। দেখার চোখ তো সবার থাকে না। পাশাপাশি দুটো দৃশ্য ওকে বিস্মিত করেছে। আসলে বিস্মিত হতে পারলে সাদা-কালো অথবা রঙিন সব দৃশ্য দেখা যায়। টিভি, ইন্টারনেট দেখতে দেখতে বিস্ময় হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের। তাই দেখতে পাইনা আমরা।

আর আমি দেখছিলাম হারিয়ে যাওয়া শৈশব আর কৈশোর।

আমাদের সন্তানদের অনেককিছু আছে। অথচ মাঠ নেই, গাছ নেই, আকাশ নেই, আরও অনেককিছু নেই। তারা রাত জেগে ফেসবুক, হোয়াটস অ্যাপ, আরও কী কী করে, সকালে ঢুলতে ঢুলতে স্কুলে যায়, অথবা বাড়িতে থাকলে দশটা-বারটা পর্যন্ত ঘুমায়। সারা পৃথিবীতে ওদের বন্ধু ছড়িয়ে থাকে, অথচ ওরা বড্ড একা।

আমার মেয়ে বই পড়তে ভালোবাসে, ভালোবাসে কল্পনা করতে। বাস্তবে তা কোথায় গিয়ে ভাঙবে জানি না। জানি ধাক্কা খায়, সামলায় অনেকটাই নিজের মতো করে। অধিকাংশের মধ্যে কিন্তু এই কল্পনাও নেই। বাস্তব পৃথিবী তাদের হিংস্র করে তুলছে। তারা সন্তুষ্ট নয় কিছুতেই, পেলেও আর না পেলে তো বটেই।

স্কুল-কলেজে এই হিংসার চিত্র বাড়ছে। বিদেশে তো অল্পবয়সীরা বন্দুক নিয়ে খুন করছে সহপাঠীদের। সেখানেও কিন্তু অদ্ভুত একটা ব্যাপার কাজ করছে। ইদানীং ইয়ং অ্যাডাল্ট গোত্রের একধরণের ফিকশন খুব জনপ্রিয় হচ্ছে যেখানে অল্পবয়সী ছেলেমেয়েরা হাতে নানারকম অস্ত্র নিয়ে খেলা করছে অথবা তথাকথিত দুষ্টের দমন। তারসঙ্গে যৌনতাও আসছে অবাধে। এইসব গল্প থেকে পপুলার সিনেমা তৈরি হচ্ছে। আমাদের এখানে যদিও গল্প বা সিনেমার থেকেও বাস্তব পাওয়ার ইচ্ছেটা কাজ করে অনেক বেশি। এরজন্যে আমরা তো দায়ী বটেই। আমরাই তো স্কুলব্যাগ নিয়ে পিছনে ছুটেছি নিত্যদিন - স্কুল, সাঁতার, আঁকা, ক্যারাটে, গান - বাপরে বাপ।


অথচ আমরা নিজেরা একদিন কাটা ঘুড়ির পিছনে ঢের বৃথা সময় নষ্ট করেছি।

লুচি- আলুরদম

আমার মেয়ে ক্লাস থ্রি পর্যন্ত যে স্কুলে পড়েছিল সেখানে ফেস্টের সময় বাড়ি থেকে কাউকে আলু, কাউকে পেঁয়াজ, কাউকে তেল, কাউকে ময়দা এসব নিয়ে যেতে হত। আর বড় মেয়েদের আবার সেসব নিয়ে বাড়ি থেকে লুচি, আলুরদম এসব বানিয়ে আনতে হত। তারপর ফেস্টের সময় সব্বাইকে লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে সেই লুচি-আলুরদম আবার কিনে খেতে হত।

টিভি আমি প্রায় সর্বক্ষণ দেখি - কালো। মানে বন্ধ থাকে আর কী। মাঝে মাঝে সিনেমা দেখার জন্যে চালাই। মাঝে মাঝে শঙ্করীদি বাংলা সিরিয়াল দেখে তখন পারলে অন্য ঘরে পালাই। পড়লাম
, সরকারের তরফ থেকে ওই লুচি-আলুরদমের মতো রিয়েলিটি শো শুরু হবে টিভিতে। ভাবছি ঘরে ঘরে স্টার জলসার সঙ্গে পাল্লা দিতে পারবে তো? সাংহাতিক ফ্যামিলি ড্রামার কাছে কোথায় লাগে বাণিজ্যের এই অন্তঃসারশূন্য বিজ্ঞাপন। তবে বিরোধীরা খুব মন দিয়ে দেখবেন। কারণ তাঁদের আমলে সরকারি অর্থ অর্থাৎ জনগণের টাকা নয়ছয় হলেও তা যে এমন বুক ফুলিয়ে করা যেতে পারে সেটা ভাবনায় কুলোয়নি। আমজনতা স্টার জলসায় বাংলা সিরিয়াল দেখবেন, বিরোধীরা দাদাগিরি দেখবেন আর আন্দোলনের নতুন নতুন ছক কষবেন।

সব রাজনৈতিক দলই সাধারণ মানুষকে বোকা ভাবে। আসলে মানুষ ঠকে আসছে চিরকাল জেনে বুঝে, উপায় নেই বলে। তাই বলে সে বোকা কে বলল? সেই যে ইংরেজিতে একটা প্রবাদবাক্য আছে না, ফ্রম ফ্রাইং প্যান টু ফায়ার - আমাদের সেই হাল হয়েছে।


আর আমি বলি কী, আকাশটাকে দেখো, টিভি দেখোনা...।

Monday, September 7, 2015

ঋণ

মায়ের ঋণ শোধ করা যায় না এটা একটা খুব প্রচলিত সত্য। কিন্তু আমি দেখেছি জীবনে কারোর ঋণ শোধ করা যায় না।

সেই যে ছোটবেলায় দাদার সঙ্গে খেলা কিম্বা ঝগড়ার ঋণ
, মহুয়া কিম্বা কামিনী গাছের গন্ধের ঋণ, কল্কে ফুলের মধুর ঋণ, স্টেশনের কাকা-কাকিমার ভালোবাসার ঋণ, অশোকাদি আর মৈত্রেয়ীদির ঋণ, বন্ধুদের সঙ্গে কাটানো কিছু মধুর স্মৃতির ঋণ - রুমিয়ার ভালোবাসার আচার খাওয়ানো, দেবীর সঙ্গে ছাতে, ধানের ক্ষেতে ঘুরে বেড়ানো, দুই বন্ধুতে সিনেমা দেখা, বন্ধুদের সঙ্গে দোল খেলা, প্রজ্ঞাজিতের সঙ্গে কলকাতার পথে পথে হাঁটা, মৌসুমীদির সঙ্গে একটা জ্যোৎস্না রাত, নেড়ুর সঙ্গে গোপন কথা, অসুখের সময় ঈপ্সিতার ছোটাছুটি, হস্টেলে বন্ধুদের আমার লেকচার ধৈর্য্য ধরে শোনা, পুজো দিয়ে প্রথমেই প্রসাদটা ঘোরতর অবিশ্বাসী আমার মাথায় ছুঁয়ে হাতে দিয়ে গ্ল্যাক্সোর নিশ্চিন্ত মুখ, দিনের পর দিন রাতে খাওয়া নিয়ে ঘুমন্ত আমার সঙ্গে লড়ে যাওয়া নিবু, বন্ধুদের চিঠির ঋণ, আমার সঙ্গে দীর্ঘ বন্ধুত্ব রাখার মত সাহসের ঋণ মানসের কাছে। আরও আরও কতজনের কথাই তো মনে পড়ে যায় নিত্যদিন।

আমাকে দিনের পর দিন সহ্য করে (এর থেকে ভালো কোনো শব্দ বোধহয় নেই) যারা ভালোবেসে
, বিশ্বাস করে দিন কাটায় তাদের ঋণ তো শুধুই বেড়ে চলে।

ছেলেবেলায় মায়ের মুখে শোনা গান
, বাবার রাজনৈতিক তর্ক, অমিতাভ কাকার মন্দ্রস্বরে কবিতা, কত বই আর সিনেমার চরিত্রেরা সবার কাছেই ঋদ্ধ হয়েছি আমি। রবি ঠাকুর আর বিভূতিভূষনের কাছে ঋণের তো অন্ত নেই আমার।

কেউ সুখ দিয়ে ঋণ বাড়িয়েছে
, কেউবা দুঃখ দিয়ে। দুঃখের ঋণের বোঝা আরও ভারী হয়, সুখের থেকেও।

কত ভোরের কাছে ঋণ রয়ে গেল, কত শেষ বিকেলের কাছে। কত পাহাড়, সাগর, অরণ্যের কাছে হাত পেতে নেওয়া ভালোলাগা আর ফিরিয়ে দেওয়া হয়নি কোনোদিন। পাহাড়ের গায়ে আনমনে যে ফুলটা ফুটেছিল সে যে বিস্ময় দিয়েছিল আমার ঝুলিতে। এইসব মুঠোভরা ভালোবাসা ফেরানো হয়নি তো কাউকেই। ঋণ রয়ে গেছে আকাশ, বাতাস, মেঘ আর বৃষ্টির কাছে। কত রোদ্দুরের কাছে আনন্দের ঋণ রয়ে গেল তার খবর কে রাখে?

আমার অবস্থাটা অনেকটা শিবরামের মতো। হর্ষবর্ধনের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে গোবর্ধনকে শোধ করি আর গোবর্ধনের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে হর্ষবর্ধনকে।


একদিন বলে যাব এবারে নিজেরা বুঝে নাও তোমরা।

Sunday, September 6, 2015

আগামী

সমুদ্রের বালিতে মুখ গুঁজে
যে শিশুর দেহটি পড়ে থাকে
তার পা ধুয়ে দেয় সাগরের জল
আর মাথার কাছে সূর্য নাম লিখে দিয়ে যায় - 'ভবিষ্যত'

যে আগামী ছিল সে অতীত হয়ে গেছে,
যা ভবিষ্যত ছিল, পুরাতনের গর্ভে মৃত্যু হয়েছে তার।

বর্তমানেরা যুদ্ধ করে যাচ্ছে।
বর্তমানেরা খুঁজে যাচ্ছে গৃহ, দেশ, ভালোবাসা, বিশ্বাস।

সমুদ্র শুধু বালিতে রক্ত আর আশার দাগ ধুয়ে দিয়ে যায়।
আর সূর্য অস্ত যায় পশ্চিমাকাশে।