Tuesday, August 29, 2017

ধর্মাবতার, বিচার চাইছি ৩০ বছর পর


আমার হাতে এফ আই আর এর কোনও নথি নেই। নেই হাসপাতালের রিপোর্ট।

যদিও সাক্ষীরা বেঁচে আছে। সাক্ষ দিক অথবা না। সকলেই তো সত্যি বলতে পারে না। তাহলে পৃথিবীটা অন্যরকম হতো।

আছে স্কুলে দেওয়া ডাক্তারের সার্টিফিকেট-এর একটা কপি। সেইসময়ের যাবতীয় ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন, ই ই জি রিপোর্ট, স্কুলের রেজাল্ট,আমার ডায়েরি।

সর্বোপরি বেঁচে আছে আমার কলম।

তিরিশ বছর আগে স্কুলের কিছু শিক্ষিকার চক্রান্তে এবং এক অন্যায় ঘটনায় আমি মারা যেতে পারতাম। কিন্তু মরিনি। মারা গেছে সেই সংস্থা, যার হাতে ছিল সেই স্কুল। এটাই বাস্তব। মূলে ছিল উত্তরা বসু ও গৌরী আচার্য।

সেই ঘটনা আমার মনে এতটাই প্রভাব ফেলেছিল যে যার জন্য আমার জীবনের নানা ক্ষেত্রে বারবারই মনে হয়েছে আমাকে কেউ মেরে ফেলতে চাইছে। এবং বিনা কারণে আমাকে যে মারতে চাইছে তাকে আমি ছেড়ে দেব না।

এত বছর পরে আমার এই মনোভাবের শিকড় খুঁজে পেয়ে যখন সেই জায়গার লোকজনকে জানালাম, তখন আমাকে সেই গ্রুপ থেকে সরিয়ে দিল।

যেন এভাবেই মেরে ফেলতে পারবে আবারও।

ওরা ভুলে গেল আমার হাতে কলম আছে।

আর সিলভিয়া প্ল্যাথ বলেছেন, যে কোনও কিছুই লিখে ফেলা যায়।

তিরিশ বছর আগে বছর ১১-১৫ বছরের একটি মেয়ের ওপর যে ধারাবাহিক মানসিক অত্যাচার হয়েছিল হিন্দুস্থান কেবলস স্কুলে তা আমি লিখব। সর্বত্র লিখব।

এইটাই আমার প্রতিবাদ। প্রতিশোধও। যদি আইনি লড়াই করা যেত, তাহলে বলতাম, ধর্মাবতার, আমার হারিয়ে যাওয়া সময়, আমার যন্ত্রণার দিনগুলির বদলে আনন্দ, আমার সুস্থতা ফিরিয়ে দেওয়া হোক। আমি এই বিচারই চাই।

Saturday, August 19, 2017

দ্য মার্ভেলস


হুগো-র ছবি এঁকেছিলাম। কিন্তু হুগো-কে নিয়ে লিখিনি। কী আশ্চর্য! অথচ কী বই, কী সিনেমা দুটোই অদ্ভুত ভালো লেগেছিল। তেমনই ভালো লাগল ব্রায়ান সেলজনিক-এর নতুন বই দ্য মার্ভেলস।
একটা বিষয়ে নিশ্চিন্ত হলাম যে যাক, সারাক্ষণ কল্পনার জগতে আমি একাই থাকিনা এই বুড়োবয়সে। আরো আরো লোকজনও থাকে। আর তেমনই এক মানুষ ডেভিস সারভার। আপন মনের কল্পনাকে রূপ দিতে লন্ডনের বুকে এক পুরোনো বাড়ি কিনে তাকে এমন অ্যান্টিকভাবে সাজিয়ে ফেললেন যেন সময় পিছিয়ে গেল একশো বছর। আর সেই বাড়িতে থাকা এক কাল্পনিক পরিবারকে নিয়ে তৈরি করলেন যেন এক রূপকথার গল্প। হ্যাঁ, বইয়ের দু পাতার মধ্যে নয়, সত্যি ত্রিমাত্রিক কী চতুর্মাত্রিক এক গল্প তৈরি করেছিলেন ডেভিস। তাঁর একটাই দুশ্চিন্তা ছিল যে, তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে ফুরিয়ে যাবে, স্তব্ধ হয়ে যাবে সেই কাহিনির গতি। কিন্তু কী আশ্চর্য জুটে গেল অমনি খেপা আর এক বন্ধু ডেভিড মিলনে। ডেভিস এর মৃত্যুর পর এক ট্রাস্টের মাথা এই ডেভিড পরম যত্নে বাঁচিয়ে রেখেছে প্রিয় বন্ধুর স্মৃতি সেই গল্পবাড়িটি। আর এই গল্প বাড়িটি নিয়ে লেখায় আঁকায় দুই মলাটের ভেতর চমৎকার আর এক গল্প বানিয়ে ফেললেন ব্রায়ান। যে গল্পে ডেভিসের কাল্পনিক চরিত্র জার্ভিস হয়ে গেল সত্যিকারের আর সৃষ্টি করলেন নতুন এক কাল্পনিক পরিবারের মার্ভেলস।
পুরো গল্পেরই মূল কথা তুমি যদি দেখতে পাও তাহলে সবই আছে, আর না পেলে কিছুই নেই। সত্যিই গল্পের দুনিয়া আমার মতো মানুষের কাছে তো তাই?


মনে হচ্ছে, মনে পড়ছে


গত কদিন ধরে কয়েকটা দৃশ্য বড্ড মনে পড়ছে। ছোটবেলার কয়েকটা দৃশ্য। কিন্তু আমার কাছে যার গুরুত্ব আছে, অন্যের কাছে আছে কি? তবু লিখতে ইচ্ছে করছে।

কেন মনে পড়ছে সেটাই আগে বলি। তারপরে দৃশ্যগুলো।

১) গতকাল নারী শিক্ষা সমিতিতে বসে আড্ডা দিচ্ছিলাম। দিতে দিতে ক্রমশ: খানিক কথা বলতেই শুরু করলাম। মাথায় ঘুরছে রীতাদির দেওয়া বক্তৃতার বিষয় - নিবেদিতা আর অবলা বসুর সম্পর্ক। একবছর ধরে পড়ছি তো পড়ছি। নিবেদিতাকে অনেক জানা যায়। যদিও মানুষ নিজের স্বার্থে কাউকে কাউকে মহামানব বানিয়ে তোলে। আবার অন্যদিকে অবলার প্রায় কিছুই জানা যায় না। একে তো এই দুই ভয়ানক মুশকিল। তার ওপর জগদীশচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ, বিবেকানন্দ এত সব বড় বড় মানুষদের ভিড়। একটু এদিক ওদিক হয়েছে কী..! কিন্তু সত্যি খোঁজার মধ্যে ভারী একটা আনন্দ আছে। অনেকটা রহস্য উন্মোচনের আনন্দ। আর আরো ভালো লাগে যখন দেখি বলার পরে এক দিদি বলে ওঠেন, দময়ন্তী এত ভালো বলে, ও বললে ওঠা যায় না। রীতাদিও খুশী হয়ে ওঠেন।

আর আমার মনে পড়ে একটা বারো-তেরো-চোদ্দো বছরের মেয়েকে। যে পড়া করে এসেছে। প্রতিদিনই আসে যতই শরীর খারাপ থাকুক না কেন। তাকে দাঁড় করিয়ে পড়া জিজ্ঞাসা করা হল। তার মুখ দিয়ে কিছুতেই কথা বেরোচ্ছে না, বেরোচ্ছে না। এমন কী সে যে জানে এটাও না। হাই বেঞ্চে ঘুঁষি মারছে একটা একটা, একটা একটা শব্দ বেরিয়ে আসছে। শিক্ষিকাদের ধৈর্য কোথায় শোনার? বসে পড় ঠিক আছে। পরের জন উত্তরটা বল। রাগে অপমানে মেয়েটার মুখ লাল হয়ে যাচ্ছে। নাহ, কোনো বন্ধুও নেই সাহস যোগানোর...

২) আমি যে কাজেরই ভাবনার কথা বলি, অধীরদা বলেন, আছি। আমি না বললে তবেই তুমি অন্য কোথাও যাবে। অন্য একটি বিশেষ সম্মানজনক প্রতিষ্ঠান থেকেও ফোন আসে, আমার কাজের বাছাই ইংরেজি অনুবাদ হবে।

ভারী আনন্দ হয়, কিন্তু ওই আবার মনে পড়ে।

মনে পড়ে যায় সেই বারো-তেরো- চোদ্দো-পনেরো বছরের মেয়েটার কথা। ভারতবর্ষের ভ এর গোল্লা থেকে যে কিছুতেই বেরোতে পারছে না, হাতটা কেবল ঘুরে যাচ্ছে, ঘুরেই যাচ্ছে। তারপর মাধ্যমিক এসে গেছে। একটানা দশ মিনিটের বেশি পড়তে পারে না। দশ মিনিট পড়লে, দশ মিনিট বিশ্রাম। খাতার পেছনে রোজ গোটা গোটা করে লেখে, আমাকে পারতেই হবে। ইতিহাস পরীক্ষার দিন। লিখতে লিখতে যন্ত্রণায় হাত জড়িয়ে আসছে। পাশে রাখা মলম মেখে আবার লেখা। নাহ, তাও একটা প্রশ্ন ছেড়ে দিতেই হল।

কয়েক বছর পরের কথা। পার্ট ওয়ান চলছে। পরীক্ষার আগেই তেড়ে জ্বর, ম্যালেরিয়া। অলরেডি দু বছর নষ্ট হয়ে গেছে, ড্রপ দেওয়া যাবে না। ওদিকে হাত অবশ হয়ে যাচ্ছে, দুটো হাতই। ওষুধ, গরম জলের সেঁক। বটানি পাস পরীক্ষা, শেষ করা যাবে না, আর হাত-মাথা চলছে না। বেরিয়ে বাস স্ট্যান্ডে এসেই অজ্ঞান। অপরিচিত একজন জল ভেবে ও আর এস নিয়েই চোখে-মুখে ছিটান। ফিজিওলজি পাসের আগের দিন তিনবার ১০৫ জ্বর। তৃতীয়বারে জ্বর নামছে না। ইঞ্জেকশন দিতে গিয়ে স্থানীয় ডাক্তারেরও হাত কেঁপে যাচ্ছে। জ্বর নামতেই মেয়েটার মনে হল ফেল করে যাব? পাঁচটা প্রশ্ন লিখতে হবে। ছটা পড়ে যাই। কী ভাগ্যিস ঠিক ওই ছটাই এসেছিল।

৩) এর চেয়েও আশ্চর্য প্রস্তাব নিয়ে আমার পাশে দাঁড়িয়েছেন দুই অধ্যাপক। তাঁদের কথায় তুমি এমন একটা কাজ একা একা করেছ মা। কী অসম্ভব একটা কাজ করেছ। তোমার জন্য কিছু করতে পারলে ভীষণ ভালো লাগবে।

মনে পড়ছিল সেই ছোট মেয়েটাকে আবারো। যত ভালোই পরীক্ষা দিক ভুগোলের দিদিমণি কান ঘেঁষে পাস করাবে। বাংলা ইংরেজিতে শেষপর্যন্ত অন্য স্কুলে গিয়ে স্কুল টপার হলেও এই ইস্কুলে কম নম্বর সে পাবেই। কিছুতেই তাকে নম্বর দেওয়া হবে না।

মনে পড়ে কলেজ শেষের দিকে সে টিউশনি খুঁজছে অথবা চাকরি...। কিচ্ছু পাচ্ছে না। কাউকে চেনেই না সে। মুখ ফুটে বলা তো দূর। ওদিকে বাবা বলেছে আর পড়াতে পারবে না...

সাংবাদিকতা করতে এসেও তাই।

মনে পড়ে যায় একা গবেষণার তিক্ত ঘটনাগুলো।

৪) বছর দুয়েক আগে হাসপাতালে ভর্তি। হস্টেলের পুরোনো বন্ধুরা খোঁজ নিচ্ছে। ফিরে এলে কুড়ি বছর পর প্রথম গেট টু গেদারটা বাড়িতেই হল। খোঁজ নিচ্ছে আমাদের ছুটির বন্ধুরা। আবার এই কয়েকদিন আগে হাসপাতালে ভর্তি হলাম। অভিষেক হাজির হল। হাসপাতালেই আলাপ হল আমাদের ছুটির এই তরুণ লেখক ভ্রাতৃপ্রতিম অভিষেকের সঙ্গে। ফোন করে খোঁজ নিচ্ছে নিয়মিতই নতুন পুরোনো বন্ধুরা।

সাদা দেওয়ালের দিকে তাকিয়ে একটা তেরো বছরের মেয়ের কথা মনে পড়ছিল। ব্রেস্ট টিউমার অপারেশন হয়ে বাড়িতে দেড়মাস। নাহ, দেখতে আসা তো দূরের কথা কেউ খোঁজ পর্যন্ত নেয় না। সারাদিনে সব মিলিয়ে ২১টা ওষুধ। দেওয়ালে নিজে চার্ট বানিয়ে রেখেছে। দেখে দেখে খায় আর জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকে। যে জানলায় কোনদিনও কোনো দইওলা আসবে না।

আরো দু বছর পর স্কুলেরই গন্ডগোলে আবার হাসপাতালে। মাধ্যমিকের ঠিক আগে। নাহ, এবারেও খোঁজ নিল না কেউ। খোঁজ নিল যখন এক বছর পর অন্য স্কুল থেকে মাধ্যমিক পাস করল, তার রেজাল্ট জানতে চেয়ে সেখানে ফোন গেল পুরোনো স্কুল থেকে।

আজকাল মনে পড়ে, বড্ড মনে পড়ে। যখন বিছানা থেকে উঠতে পারি না, ক্লান্ত লাগে, ব্যথা করে সেইসব দিনগুলো মনে পড়ে যখন অনেককিছু সত্ত্বেও হেঁটে চলে বেড়াতাম।

কিন্তু কাজ তো সবে শুরু করেছি। এখনও অনেকটা পথ বাকি।

Monday, August 14, 2017

মনখারাপের জানলার পাশে


মনখারাপের জানলায় দাঁড়িয়ে দেখি

বর্ষা পেরোয়, রোদ্দুর ওঠে, জমাট বাধে শীত;

তারপর আবার গ্রীষ্ম আসে প্রখর দাবদাহে।

আমার গরাদের ছায়াগুলো শুধু বদলে বদলে যায়।

বদলে যায় বৃষ্টি ভেজা পর্দা আর সোয়েটারের হাতার রঙ।

জানলার বাইরে ব্যস্ত মানুষজন, ফেরিওয়ালার ডাক

এইসবই কেমন বদলে বদলে যায়।

কোনো গাছ কাটা পড়ে বেমালুম, রাস্তা চওড়া হয়,

ওরই ফাঁকে দু-একটা সবুজ কচি পাতা বাতাসে মাথা দোলায়।

গলির মোড়ের দোকানটা উঠে যায়,

ডানদিকের টালির চালের ঘর ভেঙে চারতলা ফ্ল্যাটবাড়ি গজিয়ে ওঠে কবেই যেন।

এইসব দেখতে দেখতে মনখারাপের জানলার পাশে অনন্তকাল কেটে যায় আমার।

তারপর একদিন নিজেকেও আর চিনতে পারি না।

Tuesday, July 25, 2017

যারা আর একটি মৃত্যুর জন্য কাঁদছে তাদের প্রতি


বিশ্বাস কর, আমরা কিন্তু ঠিক ভুলে যাব।

কিছু মানুষ প্রথমটায় শিউরে উঠবে,

আর ছি ছি করবে নিজেকে মানুষ ভেবে।

কেউ বা চটজলদি লিখে ফেলবে আর একটি সময়োপযোগী কবিতা।

অথবা প্রতিবেদন, ভীষণ দুঃখ আর রাগের একটা কাহিনি।

অধিকাংশই অবশ্য এসব কিছুই করবে না,

নির্বিকারে খবরের কাগজের পরের পাতার আরেকটা খবরে চোখ রাখবে

অথবা, টিভি সিরিয়ালে।

আর আমরা সকলেই, যে যাই করি না কেন, দেখো,

কয়েকদিন, নাহয় কয়েকটা মাস, খুব বেশি হলে,

আচ্ছা বছরখানেকই ধরে নিলাম নাহয় -

ঠিক ভুলে যাব।

ভুলে যাব যে, এখনও এ পৃথিবীতে রাক্ষসেরা বেঁচে আছে

এবং তারা কচি মাংস খায়,

আর তাদের দেখতে অবিকল মানুষের মতোই।

এইসবই ভুলে যাব দেখো, ভালোভাবে বেঁচে থাকার মতো

অনেক জরুরি কাজে ব্যস্ত হতে হতে

একেবারেই ভুলে যাব।

শুধু কিছুটা সময় অপেক্ষা কর।

আর দেখে নিও তারপর।

ঘুম


এখন ভীষণ ঘুম জমেছে

গাছের ডালে চোখের পাতায়।

বৃষ্টি কিম্বা ঝলমলে রোদ

দিন চলে যায় দিন চলে যায়।

দিন চলে যায় তোমার-আমার

কাজে কিম্বা অকাজ ঠেলে।

বদলায়না কোনও কিছুই

সুখ অথবা অসুখ মেলে।

দিন চলে যায় তোমার-আমার

দিন চলে যায় সক্কলেরই

ভাত জোটে কী না জোটে তাও

ধর্ম নিয়ে মারামারি।

দিন চলে বা নাই চলে আর

খুন অথবা গলায় দড়ি

আসলে খুব ঘুম জমেছে

চোখের পাতা বড্ড ভারী।

ঘুম জমেছে সক্কলেরই

কেউ কিছু আর দেখতে পায়না।

দিন চলে যায় দিন চলে যায়

আসলে দিন যেতেই চায় না।
- অন্যনিষাদ পত্রিকা

Tuesday, July 11, 2017

রবীন্দ্রনাথ একলা ভেজেন আমাকে ভেজান


ছোটবেলায় গীতবিতান পড়তাম রোজ গল্পের বইয়ের মতো। প্রায় সব গানই মুখস্ত হয়ে গিয়েছিল। খুব ছোট্ট থেকে রেডিও বা কিছু পরে টেপ রেকর্ডারে যাঁদের গান শুনতাম তারমধ্যে দেবতোতো বিশ্বাস প্রধান। যদিও পরে প্রিয় হয়ে ওঠেন সুচিত্রা মিত্র। আজও আমি রবীন্দ্রসঙ্গীত শুনলে ফিরে ফিরে আসি এই দুজনের কাছে।

গান শিখেছি একমাত্র মায়ের কাছেই। তাও এলোমেলো। অন্য অসুস্থতা বাদ দিলেও সেপটিক টনসিল ছিল বড় বাধা। রেওয়াজের ধৈর্যও সেরকম না। চিরকালই সর্ব ঘটে কাঁঠালি কলা।

সারা বছর তো তাঁকে মনেই পড়ে সুখে-দুঃখে। একসময় ছেলেবেলায় রবি ঠাকুর আর বিভূতিভূষণই ছিলেন প্রিয় বন্ধু, অমলের ঠাকুরদাদার মতো। আর তো কেউ ছিল না আমার অসুখ সারাতে। আজ অবশ্য একেকসময় রবি ঠাকুরও আর পারেন না। তবু তাঁকে মনে পড়ে, বর্ষা এলে আরও মনে পড়ে। রবি ঠাকুর-ছেলেবেলা-বর্ষা-মা সব যেন মিলেমিশে যায়।

তবে আমার এখন আবার সত্যিকারের বন্ধু আছে। যারা অসুখ করলে নার্সিং হোমে হাজির হয়, না পারলে রোজ ফোন করে। এরাই তো আমার স্বজন। এরমধ্যে এক বন্ধু ফোনে বলল, তুমি যে আগে গান গেয়ে পাঠিয়েছিলে তোমার সেই গলা আর কথা বলার গলা আলাদা তাই না? বলি, ওই তো মুশকিল আমার দুটো গলা। আর কোনটাই আমার বলে লোকে বোঝে না। ফোনে কথা বললে ভাবে বুঝি আমার মেয়ে কথা বলছে আর অমায়িক গলায় গান গাইলে তো আরও চিত্তির। এই বলে ভারী দুঃখের কথা শোনাই তাকে।

আমি একটা বিশেষ কারণে মঞ্চে গান গাইতে চাইনা। কিন্তু হস্টেলের বন্ধুরা সেসব শুনবে কেন? দিলো আমার নাম লিখিয়ে অন্য কলেজের ফেস্টের একটা গানের প্রতিযোগিতায়। আমি আবার হারমোনিয়াম বাজাতে পারিনা। খোলা গলায় মাইকের সামনে দাঁড়িয়েই গাইলাম, যেমন গাই সর্বত্র বাথরুম থেকে ছাদ কিম্বা বেডরুম। মাইক ছাপিয়ে অমায়িক গলা বেরোলো। অনেকেই গানের মধ্যেই আক্ষরিক অর্থে আওয়াজ দিল, সুচিত্রা মিত্রকে নকল করছে, সুচিত্রা মিত্রকে নকল করছে। প্রচণ্ড খারাপ লাগল। তারপর থেকে পারতপক্ষে কখনও মঞ্চে গাইতে চাইনা। এখনও ঘর থেকে সারা পাড়ায় যখন গলা শোনা যায়, একাধিকবার ফাংশানে ডাক পেয়েছি। সেদিনটা আর বাড়িতেই থাকিনা তাই। আর ভালোও লাগে না এখন। না চর্চায় ছোটবেলার সেই গলাও নেই, শরীরে দম পাই না, বেশিক্ষণ গাইলে চোয়ালের ব্যথা বেড়ে যায়। অথচ নিজের এই গলাটা এতই প্রিয় আমার যে একাধিক ডাক্তার বারবার বলা সত্ত্বেও টনসিল অপারেশন করিনি। এখন তো বাড়তি ফ্যারেঞ্জাইটিস। সেও অনেকদিন।

প্রথম হোস্টেলে রাতে বাথরুমে গান ধরলে হস্টেল শুদ্ধু মেয়ে কমপ্লেন করত ঘুমাতে দিচ্ছিস না বলে। ঘরে বসে গাইলে তো আরও সর্বনাশ। কিন্তু কলকাতায় পড়তে বন্ধুরা ডেকে ডেকে শুনতো। আজ কুড়ি বছর পর যোগাযোগ হওয়ার পর একটি বন্ধু বলল, শুধুমাত্র গানের জন্য সে আমাকে ভোলেনি। এটা যে কতটা আনন্দের লেগেছিল সে আমিই জানি। আর এক ছিল আমার এক জেঠীশাশুড়ি তিনতলার ছাদে গান গেয়ে একতলায় নেমে এলে সবসময় বলতেন, তুই বড় ভালো গাইছিলিস রে।

শরীর খারাপ হলে আর গাইতে পারি না। তারপর একটু সারলে যেই দেখি গলা দিয়ে আওয়াজ বেরোচ্ছে আজও বুঝি এইবার সেরে উঠছিই। আর অমনি দেবব্রত বা সুচিত্রার সঙ্গে গলা মিলিয়ে গেয়ে উঠি অথবা একা একা। সুচিত্রার সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগটা আমার এইটুকু মাত্র। আর মা একসময় ছিলেন সুচিত্রা মিত্রের ছাত্রী। একেকদিন গানের ভুত চাপলে একের পর এক গেয়ে যাই আপনমনে।

কী যায় আসে, আমার কন্ঠ থেকে গান যদি কেড়ে নেয় সময়। কী যায় আসে...

আমার হারিয়ে যাওয়া দিন, আর কি খুঁজে পাব তারে, বাদলদিনের আকাশপাড়ে ছায়ায় হল লীন...