Thursday, October 27, 2016

পুড়ছে

কোথাও কিছু পুড়ছে।
ছাইয়ের গন্ধ বাতাসে
কাগজের মতো উড়ছে।
পুড়ছে, কেবল পুড়ছে।
ছাইয়ের গন্ধ শূন্য হৃদয়ে
বেদনার মতো উড়ছে।
পুড়ছে, তোমার-আমার জীবনে
চিরকালই কিছু পুড়ছে।
ছাইয়ের গন্ধ বাতাসে
উড়ছে, কেবল উড়ছে।

সেইসব শব্দ অক্ষর বর্ণমালারা...

শব্দের কি অশ্রু থাকে? বর্ণমালার চোখে কাজলের দাগ? কবিতার ঠোঁটে অভিমানের কুঞ্চন? বেদনার আভাসে তারা ভাসে কি মেঘমালায়? অথচ এইসব প্রশ্নের উত্তর তার সেই লন্ঠনের আলোর রেখায় এঁকে কবেই হারিয়ে গিয়েছিল পাগলের প্রলাপ আঁকা বনে। যার মুঠোয় ছিল বৃষ্টির হীরে-মানিক কুচি।

বাজে বাজে রম্যবীণা

মা সুর বাঁধছে তানপুরায়। হারমোনিয়ামটা আগে বাজিয়ে নিচ্ছে। তানপুরার একেকটা কান ধরে আলতো মোচড়। একটা শব্দ তারপর তারের আওয়াজ। না, ঠিক লাগছে না, মাথা নাড়ছে না বাচকে, তারপর তানপুরার লাউয়ের খোলার ওপরে আটকানো কড়িগুলো আলতো করে এগোচ্ছে, পেছোচ্ছে। চুপ করে বসে দেখছি। মাথায় আঁকছি হয়ত ছবিটা। অথবা দুষ্টুমি করে আঙুল ঢুকিয়ে দিচ্ছি হারমোনিয়ামের পেছনের কাপড় লাগানো গোল গোল ফুটোগুলোয়। উলটোদিকের বেলোটা খুলে দিচ্ছি কখনও। মা বারণ করছে সুর বাঁধতে বাঁধতে। আর আমি ভাবছি কখন ওই হলুদ তারটা বাঁধা হবে আর টঙ করে আওয়াজটা কানে আসবে। ওটা আমার খুব প্রিয়। তারপরে মা হয়ত আমাকে বাজাতে দেবে তানপুরাটা। নিজে হারমোনিয়ামটা নেবে। অথবা শুধু তানপুরা বাজিয়েই গান হবে, মা-ই বাজাবে হয়ত। আমি তো সুর শুনে খালি গলায় তুলে নিতে পারি যখন তখন, কিন্তু বাজনায় রপ্ত করতে কঠিন লাগে। সেপটিক টনসিল বারবার। পরীক্ষক বলেছিলেন, গাইলে একমাত্র এই মেয়েটারই হবে।
'বাজে বাজে রম্যবীণা বাজে...'

মা দোতলায় গান শেখাচ্ছে ছাত্রছাত্রীদের। ওরা কেউ তুলতে পারছে না। কতবার ভেঙে ভেঙে শেখাচ্ছে মা - 'তোদের রথের চাকার সুরে আমার সাড়া পাইনি গো পাইনি...।' সিঁড়ির নীচে দাঁড়িয়ে গাইছি মায়ের সঙ্গে গলা মিলিয়ে, 'তরীতে পা দিইনি, আমি পাড়ের পানে যাইনি গো যাইনি...।'
বৃষ্টি পড়ছে বাইরে। 'আমার নিশীথ রাতের বাদলধারা...' আর অন্ধকারের অন্তরধন আমার প্রাণমন ঢেকে দিচ্ছে। আমার চোখে জল - 'আমি চাইনে তপন, চাইনে তারা...।'

মীরার ভজন গাইছে মা, ' চাকর রহসু বাগ লাগাসু, নিশদিন দরশন পাসু, বৃন্দাবন কী কুঞ্জবনমে তেরে লীলা গাসু' - আর আমি দেখতে পাচ্ছি অবন ঠাকুরের রাজকাহিনির মতো মীরা চাবির গোছাটা সেই রাজপুত প্রেমিকের হাতে তুলে দিচ্ছে - প্রেম না করলরে, বিনা প্রেমসে, প্রেম না মিলল রে। ওই তো পথে নেমে গেল মীরা। মায়ের গলায় ভেসে আসছে - 'তাত মাত বন্ধু ভ্রাত আপনান কোঈ...'। ওদিকে কবীরের সুর শুনছি - 'মন মোহি গঙ্গা মন মোহি যমুনা, মন মোহি ধ্যান করে...।' ঈশ্বর মিলেমিশে যাচ্ছেন না ঈশ্বরের সঙ্গে, ভালোবাসার সঙ্গে। জন হেনরির সুরেও তখন তাঁকেই শোনা যায়।

খুব মনখারাপ মনখারাপ। স্কুলে বড্ড কষ্ট। শরীরও খুব খারাপ। আর লড়তে পারছি না। মা গান শেখাচ্ছে, 'জানে গুণি গুণকো নিরগুণ কেয়া জানে, জানে বলি বল কো, নিরবল কেয়া জানে?' সত্যিই তো ওরা কী জানে কেমন করে ভারতবর্ষের 'ভ'-এর থেকে বেরোনো যায় না। আমার হাত গোল্লাটায় ঘুরতে থাকে, ঘুরতেই থাকে, এবারে ঠিক তুলে পরের অক্ষরটা লিখতে পারব, ঘড়ির কাঁটা এগিয়ে যাচ্ছে...'জানে হরি বল গজ মুশক কেয়া জানে...'

বহু বছর পর কানের কাছে বাজতে থাকে - হাউ মেনি রোডস মাস্ট এ ম্যান ওয়াকড ডাউন...

Wednesday, October 19, 2016

ভাবছিলাম

একটা স্বপ্ন দেখছিলাম। একটি মেয়ে দৌড়তে চেষ্টা করছে অথচ কিছুতেই এগোতে পারছে না। অথচ তার পিছনে কেউ তাড়া করে আসছে।

চোখ খুলেও চারপাশে তাই দেখতে পাচ্ছি।

কেন এগোতে পারছে না, প্রশ্নটা এখানেই।

শুধু পুরুষের দিকে আঙুল তুললেই হবে না। ধর্ষণ না হোক, অধিকাংশ বধূহত্যার সঙ্গে জড়িত থাকে মেয়েরাও।

আসলে তারাও ওই এগোতে না পারা...।

অক্ষর অথবা ডিগ্রি কোনও শিক্ষা দেয়না, হয়ত লাঠিখেলা জানত যেসব মেয়েরা এককালে তাদের মানসিক অবস্থান এর চেয়ে ভালো ছিল।

চিরকালই মরে এসেছে। অথচ এখন তো অনেক সহজে বেশি মানুষের কাছে পৌঁছনো যায়। বেরিয়েও আসা যায় সহজে সামাজিক বন্ধন থেকে।
তাহলে মুখ বুজে মরে কেন?

কেন এগোতে পারছে না, আসলে প্রশ্নটা সেইখানেই।

নিজেদেরও প্রশ্ন করা উচিত বইকি। অন্য কারোর দিকে আঙুল তোলাটা ক্রমশ দায় ঝেড়ে ফেলা হয়ে আসছে যে।

মানুষ খারাপ হয়, ভালো হয়। যে কোনও মানুষ।

কিন্তু আমরা এগোতে পারছি না কেন?


আর একটা চিরন্তন প্রশ্ন তো রয়েই যায় – মানুষ খুন করে কেন? ধর্ষণও।

শৈশব

দুপুরের জটিলতা আঁকতে পারিনা। শব্দেরা জন্ম নেয় শেষ রাত্তিরের নির্জনে অথবা ভোরের আলোয়। শিউলি ফুলের মতো লাল বোঁটার লাজুক অক্ষর কুড়োতে কুড়োতে পৌঁছাই রেলব্রিজের নীচের সেই কাশবনে। ছবিতে দেখেছিলাম। চলে যাওয়া যে রেললাইনের গায়ে লেখা আছে ছেলেবেলা।

তোমাকে দেখছিলাম

মেঘ ছিল না। অথচ লাল-নীল অভিমানী বেলুনগুলো উড়ছিল আকাশে। মুঠো খুলে ভাসিয়ে দিতে দিতে হাঁটছিল একা। সমুদ্রের ঢেউ পায়ের পাতা ভিজিয়ে দিয়ে আপনমনে হেসে উঠছিল বারবার। এলোমেলো হাওয়া চুল সরিয়ে চিবুকের ঘাম মুছে ক্লান্ত চোখের পাতা বেয়ে নামছিল সাদা জামায়। বৃষ্টির হীরে-মানিক কুচিরা রোদ্দুরের প্রিজম আঁকছিল তার মুখের পরে, বুকের পরে।

খুব কাছেই কবিতারা কাটাকুটি খেলছিল দিগন্তে  - ছুঁতে পারা আর না ছোঁয়ার ব্যবধানে।

বিসর্জন

না, আমি রিজওনুরের জন্য পথে হাঁটিনি। কারণ হাঁটতে গেলে পথেই থাকতে হয়, ঘরে ফেরা যায় না। ভারতবর্ষের নানা রাজ্যে কত রিজওনুর মরছে প্রতিদিন, কে তার খবর রাখে?

মিতার জন্যও কোনও পিটিশনে সই করিনি। তাহলে এই কদিনে কাগজে এক কলাম, দেড় কলাম ভরালো যে ধর্ষিত, খুন হওয়া, অ্যাসিডে পুড়ে যাওয়া মেয়েগুলো তাদের জন্যও কোনও পিটিশন পেলাম না কেন? আর ওই যে আপনার পাশের গলির মেয়েটি, কাগজে যার নাম আসেনি, যার মৃত্যু দু-চারজন কাছের মানুষ ছাড়া কাউকে নাড়া পর্যন্ত দিল না, তারজন্য?


পিটিশন, মোমবাতি, হাঁটাহাঁটি সব মৃত্যুর পরে হয়। বেঁচে থাকতে থাকতেই কিছু করুক মেয়েগুলো অথবা তার পরিচিত, অপরিচিত জনেরা। এখনও তো অনেকেই বিসর্জনের অপেক্ষায় রয়েছেন।