Thursday, August 31, 2017

কবিতার জন্ম


যখন কলম তুলে নিই হাতে

শিউলি ফুলের মতো শব্দ কুড়াতে কুড়াতে আসিস।

জানিস তো, বড্ড ভুলো মন,

কখন যে হারিয়ে যায় দুটো-একটা অক্ষর

আর হাতড়াতে থাকি মাথার ভেতরে।

আর তখনি হাত বাড়িয়ে দিস তুই।

আর সেই হাত থেকে অক্ষরেরা

ফিরে আসে আমার গর্ভে।

- বারবার কিন্তু কুড়িয়ে দিতে পারব না।

তাহলে তোর কবিতা থেকে ধার দিস বরং,

ঠোঁট উলটে জবাব দিই আমিও।

- সে তো কবেই দিয়েছি! বিস্ময় দেখে,

আচ্ছা রাগ ধরে আমারও। হেঁকে বলি, তবে যে

ফিরিয়ে নিলি চেয়ে? এমন কথোপকথন চলতেই থাকে অনন্তকাল

আর এইসব শব্দ অক্ষর বর্ণমালারা ধ্বনি-প্রতিধ্বনি হয়ে

আমার মাথার মধ্যে জন্ম দেয় আর একটা কবিতার।

ভুল ভাঙাতে


গত কয়েকদিন ধরে আমার পোস্ট কবিতা ইত্যাদি পড়ে যাঁরা ধরেই নিয়েছেন আমি বড্ড খারাপ আছি, তাঁদের ভুল ভাঙাতেই এই পোস্টাচ্ছি। কিছু অসুস্থতা বাদ দিলে হয়তো জীবনের সেরা প্রোডাক্টিভ সময়ের ভেতর দিয়ে যাচ্ছি। খুব খুশী আছি। আর সেই জায়গায় পৌঁছেচি বলেই নিজের জন্য মুখ খোলার উপযুক্ত সময় বলে মনে হয়েছে।

আগেও বলেছি, এখনো বলছি, কারোর সহানুভূতি, ইস টিস পাবার জন্য কোনোদিন লিখি না। ওমা, সহানুভূতি, ভালোবাসা পাবার সত্যিকারের যখন দরকার ছিল, সুদূর দিগন্তেও কাউকে দেখতে পাইনি। এখন বাপু বিস্তর লোকজন আমাকে ভালোবাসে। আর যারা ভালোবাসে তারা তো আর সহানুভূতি দেখায়না, ভালোইবাসে, অনুভব করে সমস্যাগুলো।

আমার কিছু শারীরিক সমস্যা আছে, সেই রিলেটেড মানসিক সমস্যা। তাতে নিজের কাজ সময়ে করতে না পারলে বেশ চাপ পড়ে। সত্যি বলতে কী গতকাল প্রুফের লাইব্রেরী ওয়ার্কটা শেষ করতে পেরে কী যে ফূর্তি হয়েছে কী আর বলব। সেই আনন্দে আজ বারটা অবধি মানে দুপুর আর কী টেনে ঘুমালাম। সকালে ডেকে তুলে পাঁউরুটি পোচ আর চা খাইয়ে গিয়েছিল অবশ্য কর্তামশাই।

তিরিশ বছর পরে শুনে যাঁরা বুঝতে পারছেন। সামনাসামনি কমেন্ট করছেন, উৎসাহ দিচ্ছেন বা অসুবিধা থাকলে মেসেজ করছেন তাঁদেরকে অসংখ্য ধন্যবাদ। আর যাঁরা এত কিছুর পরেও আমার ভুল খুঁজতে বসছেন তাঁদেরকে বলি, নমস্কার ভালো থাকুন। আমাকে বিরক্ত করবেন না।

তিরিশ বছর আগে গৌরী আচার্য, উত্তরা বসু, অমিতা কী যেন টাইটেল এরা মিলে যে অবোধ বালিকাকে খুন করেছিল, সে আজকের আমি নই। কোনো কোনো মানুষ নিজের চিতার আগুন থেকে নিজেকে গড়ে নেয় ফিনিক্স পাখির মতো। সেটাই এই আমি।

আর নামগুলো লিখতেই কিছু কিছু মানুষের বড্ড গায়ে লাগল। কী মুশকিল আপনার সন্তানের সঙ্গে আজ এই ঘটনা ঘটলে তো এই নামগুলো দিয়েই থানায় এফ আই আর করতেন। কোর্টে তুলতেন ডেকে ডেকে। আমি মাত্তর ফেসবুকে বলেছি বলেই এত্ত গায়ে লাগছে!

আর কেবলস মরে গেছে এই সত্যিটা বলায় যারা বড় বড় মহৎ কথাটথা বলছেন, তাদের বলি, মশাই কেবলস কেন মরল? আপনি তো ওখানেই ছিলেন, তা বাঁচাতে পারলেন না? হঠাৎ আমার কথায় খামোখা ফোঁস ফোঁস করছেন কেন? আমি কি সেই আগেকার দিনের মুনি-ঋষি নাকি? শাপ-টাপ দিয়ে দিলাম আর ফলে গেল? পারেন বাপু আপনারা।

আর সত্যিই, সিলভিয়া প্ল্যাথ যদি 'ড্যাডি' কবিতাটা ওদেশে না লিখে এখানে লিখতেন, আর দেখতে হতো না। বিখ্যাত এই কবিতাটা আমায় এমন নাড়া দিয়েছিল যে আমি তাঁর লেখার ভক্ত হয়ে গেছি।

এই জন্য বলে, সত্যি কথা বললে বন্ধু ব্যাজার।

সেদিন মরে গেলে কিচ্ছু বলতে আসতাম না। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশতঃ বেঁচে তো আছিই আরো বহুকাল বাঁচব, উঁহু ব্যথা আর মাঝে মাঝে উলটে পড়লেও। এমনিতেই এসব বলেটলে বেশ আরামই হয়েছে মনে। এদ্দিন অপেক্ষা করেছি তো। তিরিশ বছর কী আর মুখের কথা মশাই?

আজকে বিকেলে চিংড়ি মাছের মালাইকারী আর পেন্ডিং মুড়িঘন্ট সঙ্গে প্রুফটার ফাইনাল চেক আপ। আপাতত এই।

পাপ


তিরিশ বছর ধরে পাপ জমেছিল ওই মাটিতে

ফসল শুকিয়ে গেছে, নদী সেও, ফিরিয়েছে মুখ।

ঘরবাড়ি ঢেকেছে জঙ্গলে, মানুষের চোখের কোটরে শুধু ভুখ।

মাটি খোঁড়ো যদি কোনোদিন। অনেক গভীরে

খুঁজে পাবে অস্থি অবশেষ।

নিষ্পাপ বালিকা ছিল এই অপরাধে

বিশ্বাস করে ছিল যাদের, তারাই হত্যাকারী -

শ্বাসরুদ্ধ। শেষ।

বিচার পায়নি সে, মাটি শুধু দিয়েছিল ঠাঁই।

মাটির গভীরে পাপ, আজ শুধু জন্ম নেয় ছাই।

দেখতে পেলে আছে, না দেখতে পেলেই নেই


শব্দেরা ভাষা খুঁজে পায় সেই তীব্র বোবা যন্ত্রণায়। ফুটে ওঠে বেদনার অবয়ব। অবোধ বালকের দৃষ্টিতে জেগে ওঠে অক্ষর, বর্ণমালারা। ওরা কেড়ে নিচ্ছিল। শব্দের রিনিঠিনি, কালির আঁকিবুঁকি। কেড়ে নিচ্ছিল আলো আর বাতাস। শব্দেরা তাকে ঘিরে দাঁড়িয়েছিল। যন্ত্রণার ভেতর থেকে জন্ম নিচ্ছিল সশস্ত্র অক্ষরেরা। জন্ম নিচ্ছিল আলো তার গভীরে। বার বার ফিরে ফিরে আঘাত করে ঘাতকেরা। আর শব্দেরা গড়ে তোলে প্রতিরোধ। আলো দেখায় পথ।

উত্তরণ হয়। যে উত্তরণের তাপ ওরা সহ্য করতে পারে না। ভয় পায়। ঈর্ষা করে আলো আর অক্ষরকে। তারারা নেমে আসে তখন। এক একটি তারা এক একটি আলো এক একটি শব্দ হয়ে তাকে ঘিরে রাখে অনন্তকাল। তা দেখতে পায় কেবল রূপকথারা। শব্দ আলো আর বেদনায় জন্ম হয় জীবনের।

ম্যাজিক দিদির গল্প


- বলবে না ম্যাজিকদিদি? প্রশ্ন করে, এলোমেলো রোদ্দুর।

ভুলে গেছিলাম, হঠাৎ করে মনে পড়ল, তাই তো, কে যেন আমায় ডেকেছিল, ম্যাজিক দিদি!

জীবনের কোন যাদুর সন্ধান সে পেয়েছিল আমার কাছে কে জানে! কতজনেই তো বলে, বেঁচে থাকার, লড়াই করার মধ্যে একটা যাদু আছে, আর সেই যাদু লুকিয়ে আছে আমার অক্ষরের ছবিতে।

ঘুম পেলে অক্ষরেরা কেমন রিমঝিম শব্দ করে মাথার ভেতর। সেও কি কথার মায়া?

ম্যাজিক দিদি খুব এক কৌটো বেদনার পলাশ নিয়ে ছড়িয়ে দিতে পারে। বৃষ্টির হীরে মানিক কুচি? সে তো হারিয়েছে কবেই।

- গল্পটা কিন্তু বলছ না ম্যাজিক দিদি।

বলছি, বলছি, দাঁড়া। সে অনেকদিন আগের কথা। তখন ম্যাজিক দিদি মফ:স্বলের এক শহরের রূপকথায় বাস করত। সেইখানে বড় বড় গাছ ছিল, মাঠ ছিল, ধানক্ষেত ছিল, আর ছিল আস্ত একটা টিলা। ছোট্ট চোখের অবোধ দেখায় সেটাই হত মস্ত পাহাড়।

আর সেই রূপকথায় মানুষের বেশে ছিল রাক্ষসী সব রানিরা। কোথায় থাকত জানো? একটা ইস্কুলে। সেই ইস্কুলে যেখানে ম্যাজিক দিদিকে ইচ্ছে না হলেও যেতে হত।

আর তখন তো আর সে ম্যাজিক জানত না, ছোট্ট মেয়েটা জানত কেবল কান্না। তার কলম বেঁচে থাকলে রাক্ষসীদের ভারী সর্বনাশ। তাই তারা চেষ্টা করল কেড়ে নিতে শব্দ অক্ষরদের। কেড়ে নিতে আলো আর বাতাস।

মিস্টি মিস্টি হেসে বিষ ছড়াতো সবার মধ্যে। যাতে কেউ না ম্যাজিক দিদির বন্ধু হয়ে ওঠে। ওমা, কেন তাও জানো না বুঝি? বন্ধু শব্দের ম্যাজিক যে সবচেয়ে বেশি। কেউ তাকে হারাতে পারে না।

আর ম্যাজিক দিদি কি করেছিল জানো? চুপিচুপি বন্ধু বানিয়েছিল। শব্দ অক্ষর আর বর্ণমালাদের সঙ্গে। সেইসব জুড়ে জুড়ে ওই যে কাহিনির চরিত্ররা, তারা এসে হাত রেখেছিল তার হাতের ওপর। রাক্ষসীরা ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারে নি যে আস্তে আস্তে ম্যাজিকের জন্ম নিচ্ছে সেই বালিকার ভেতরে। যে ম্যাজিক একবার শিখে গেলে আর কেউ তাকে মারতে পারে না।

- তারপর?

তারপর একদিন রাক্ষসীরা তাকে মেরে ফেলল।

- এই তো তুমি বললে যে তোমায় কেউ মারতে পারে না। তুমি তো রয়েছ ম্যাজিক দিদি। আমি তো চাইলেই তোমার কথার ছবি দেখতে পাই, শুনতে পাই শব্দের কন্ঠস্বর।

দূর বোকা, পারে নাই তো। ওরা কি আর তোর ম্যাজিক দিদির কথা জানতো? মেরেছিল একটা অবোধ বালিকাকে। আর অমনি...

- অমনি কী হল ম্যাজিক দিদি?

অমনি ম্যাজিক দিদি বেঁচে উঠল। তার শব্দ আর আলোর অস্ত্র নিয়ে। চিরকাল ওই রাক্ষুসীরা, ছোট ছেলেমেয়েদের মারতে চায়, চেহারাগুলো কেবল বদলে বদলে যায়। তাদের হাতে আলো শব্দ আর বন্ধুত্বের অস্ত্র তুলে দেবে বলে সে তারপর থেকে কেবল ম্যাজিক শিখতে লাগল।

- কী ম্যাজিক দিদি?

ভালোবাসা।

Wednesday, August 30, 2017

মানুষ এখনো যা পারে


কারও কারও মুখোশ খুলে দেওয়াটা দরকার।

আমরা সকলেই তো কোনো না কোনো সময় মুখোশ পরে থাকি

ভালোমানুষের মুখোশ।

সততার মুখোশ।

মহত্ত্বের মুখোশ।

আর তাই মাঝে মাঝে সেইসব মুখোশ

টেনে খুলে দেওয়াটাই উচিত।

কারণ, এখনো কেউ কেউ পারে;

এই পৃথিবীতেই, কেউ কেউ পারে

সাহস করে মুখোশ খুলে চলতে।

অনায়াসে দেখাতে পারে

ঘৃণা, রাগ, এমন কী ভালোবাসাও।

আর তখনই সেই সব মুখোশ পরা মানুষেরা

আয়নায় নিজেদের বীভৎস মুখ দেখে শিউরে ওঠে।

তাড়াতাড়ি ভদ্র-সভ্য মুখোশটা টেনে দেয় মুখে।

তারপর খেপে ওঠে মুখোশহীন মানুষগুলোর ওপর।

চিৎকার করে বলে ছি, ছি তোমাদের বুকের ভাঁজ, উরু

সব দেখা যাচ্ছে বোরখা পর, বোরখা পর।

মুখোশ না পরলে তুমি আবার মানুষ নাকি?

আর তাই মুখোশহীন মানুষগুলো

তাদের রাগ কিম্বা ঘৃণার মুহূর্তে

টেনে ছিঁড়ে দেয় অন্যের মুখোশ।

আর মুখোশহীন সেইসব প্রেতাত্মারা

দুহাতে মুখ ঢাকতে ঢাকতে ওরই ফাঁকে

ছুরি বসিয়ে দেয় মুখোশহীন মানুষটির বুকে।



তবু, কিছু মানুষ আজো মুখোশহীন থাকতে ভয় পায় না।

তবু, কিছু মানুষ আজো টান দিয়ে ছিঁড়ে দিতে দ্বিধা করে না

অন্য কারো কারো রঙিন ভদ্র ঝলমলে মুখোশ।

কবিতার গল্প


আজ পথে যেতে যেতে কবিতাটা লিখলাম। অনেকদিনই এমন লিখি। কিন্তু আজকেরটা আলাদা দুটো কারণে। প্রথমত, মোবাইল না থাকায় বহুকাল পর কাগজ-পেন এ লিখলাম। আর দ্বিতীয়ত নারীশিক্ষার মিটিং-এ গিয়ে নিজেই ব্যাগ থেকে খাতা বের করে পড়ে শোনালাম। কোত্থাও এমন করি না। কিন্তু এখানে এলেই আমি আপনজনেদের মুখ দেখতে পাই যে।