Monday, March 28, 2016

ধিক্কার

২৭ মার্চ, ২০১৬
প্রতি
শ্রী মিলন চক্রবর্তী
সম্পাদক, ‘উত্তরের সারাদিন’
HIGH ZONE, SEVOKE ROAD, 2.5 MILE DON BOSCO MORE,
P.S. - BHAKTINAGAR, SILIGURI - 734008, West Bengal INDIA

মহাশয়,
সম্প্রতি আমাদের নজরে এসেছে যে আপনাদের সংবাদপত্রে নিয়মিতভাবে ‘আমাদের ছুটি’ আন্তর্জাল ভ্রমণপত্রিকায় পূর্বপ্রকাশিত ভ্রমণকাহিনি ছাপা হচ্ছে কোনও রকম অনুমতি ব্যতিরেকেই। আপনারা এখনই এই চৌর্যবৃত্তি বন্ধ করুন এবং ‘আমাদের ছুটি’ পত্রিকায় প্রকাশিত যে ভ্রমণকাহিনিগুলি ইতিমধ্যে আপনাদের সংবাদপত্রে পুনঃপ্রকাশ করেছেন সেগুলির লেখকদের প্রাপ্য সাম্মানিক দেওয়ার ব্যবস্থা করুন। এই বিষয়ে অবিলম্বে ‘আমাদের ছুটি’র সম্পাদকীয় বিভাগে যোগাযোগ করুন amaderchhuti@gmail.com  এই ইমেল ঠিকানায়। অন্যথায় আমরা উপযুক্ত পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হব।
আমাদের ছুটি একটি সম্পূর্ণ অবাণিজ্যিক পত্রিকা। আমরা নিজেদের যোগ্যতায় গত পাঁচ বছর ধরে সারা বিশ্বের বাঙলাভাষীদের কাছে আদৃত। আশা করি আপনাদের পত্রিকাও নিজের যোগ্যতাতেই পাঠকদের আকৃষ্ট করার ক্ষমতা রাখে।
- দময়ন্তী দাশগুপ্ত
 সম্পাদক, ‘আমাদের ছুটি’
www.amaderchhuti.com

Sunday, March 27, 2016

কী মিস্টি!

প্রুফ জমা দিয়ে বেশ হাল্কা মেজাজে বাসে উঠেছি। খানিকবাদে এক লজেন্সওলা উঠে হাঁক পাড়ল দই লজেন্স...।

যেকোনোরকমের মিস্টিই আমার চিরকাল প্রিয়। আমাদের ছোটবেলায় মফঃস্বল শহরে শুধুমাত্র বিয়েবাড়িতে খাবার শেষ পাতে বড় মাটির হাঁড়ি থেকে হাতায় কেটে কেটে মিস্টি লাল দই দিত। খুব কমই নেমতন্ন খেয়েছি। কিন্তু নিমন্ত্রণ হলেই আমার সমস্ত মনপ্রাণ মাছ, মাংস পেরিয়ে ওই দইতে গিয়ে পড়ত। বড় হয়ে কলকাতায় হস্টেলে পড়তে জলখাবারের পয়সাই থাকত না, তাই দই-মিস্টি খাওয়ার প্রশ্নই ছিল না। কলকাতায় পাকাপাকি থাকার পর যদিবা খেতে শুরু করলাম তো আবার তা বারণের লিস্টিতে পড়ে গেল কিছুদিনের মধ্যেই। অতএব টক দই-ই সই। আগে খাইনি, তাই দই লজেন্স হাঁক শুনেই কিনে ফেলি দুটাকায় চারটে। একটা গালে দিয়ে দেখি বেশ খেতে, একেবারে কলকাতার মিস্টি দই।

লিচু লজেন্স খেতে আমার বেশ ভালোলাগে আর অরেঞ্জ লজেন্স। এই অরেঞ্জ লজেন্স খেলেই ছোটবেলার কথা মনে হয়, আর এক্লেয়ার্স। ছোট ছোট গোল গোল কমলা রঙের লজেন্স, কমলা মোড়কে। আর এক্লেয়ার্স-এর ওপরের আঠালো কঠিন চকলেট রঙের ত্বকের ভেতরে যেন গলানো চকলেটের স্বাদ। চকলেট আমার খুব প্রিয়। কিন্তু একেবারে ছোটবেলায় ফাইভ স্টার ছাড়া কিচ্ছু পাওয়া যেত না। ডাবড় মোড়ে সুভাষদাদার স্টেসনারি দোকানে গেলেই তাই মায়ের কাছে আমার বায়না ছিল এক্লেয়ার্স নয় ফাইভ স্টার। ডেয়ারি মিল্ক মফঃস্বলের বাজারে আসতে আসতে বেশ কিছুটা বড়ই হয়ে গেছি।

দই, মিস্টি, চকলেটের মতোই আইসক্রিম আমার প্রিয়। এখন তো কতরকমের আইসক্রিম পাওয়া যায়, কোনটা বেশি ভালোলাগে বলাই মুশকিল, অথবা সবই প্রায় ভালোলাগে, খাই বা না খাই। ছোটবেলায় রোজ ছুটির সময় স্কুলের দরজার কাছে আইসক্রিমওলা দাঁড়িয়ে থাকত। বাসভাড়ার পয়সা বাঁচিয়ে আইসক্রিম খাওয়া। দশ পয়সায় অরেঞ্জ কাঠি আইসক্রিম মানে কমলা রঙের দেখতে কমলালেবুর গন্ধওলা বরফ। এখন যে আইসক্রিমের দাম দশ টাকা। পঁচিশ পয়সাতে চকলেটের গন্ধওলা কাঠি আইসক্রিম। পঞ্চাশ পয়সায় পাওয়া যেত চিঁড়ে আইসক্রিম। ওপরে চিঁড়ে দেওয়া আর তার ভেতরটা খানিক ক্ষীরের মত স্বাদ। এটাও কিন্তু কাঠি আইসক্রিমই। এই আইসক্রিম আর পরে কখনও কোথাও আমি দেখিনি। 

স্কুলের সামনে আইসক্রিমওলাকে নিয়ে লিখতে গিয়ে ভারী মজার একটা দৃশ্য মনে পড়ে গেল। আমার মেয়ের স্কুল জি ডি বিড়লায় রোজ ছুটির সময় প্রথমে স্কুল বাসগুলো এক এক করে বেরোয়। আর আইসক্রিম নিয়ে রেডি থাকে স্কুলের সামনের আইসক্রিমওলা। বাসের জানলা থেকে হাত বেরিয়ে আসে, কারো দুটো আঙুল, কারও বা পাঁচটা কী তারও বেশি, তার সঙ্গে চিৎকার, কাকু দুটো, কাকু চারটে, কাকু দশটা। কাকুও দিব্বি নিপুণতায় প্রায় ক্রিকেট খেলার স্পিডে জানলার বাড়ানো হাতে আইসক্রিম ধরিয়ে হাত থেকে দামের টাকাটা নিয়ে নেন। সেই কমলা রঙের কাঠি আইসক্রিম। কেউ চকলেট আইসক্রিম খেলে আলাদা করে 'চকলেট' বলে চিৎকার করে। মাঝে মাঝে একেকটা বাস মিস হয়ে যায় কাকুর। 'কাকু, কাকু, আইসক্রিম...' আশাভঙ্গের সুর ভেসে আসে কচি গলায়।

আমাদের ছোটবেলায় ওই অঞ্চলে একটিমাত্র মিস্টির দোকান ছিল, স্টেশনের কাছে, রেললাইনের ধারে। দোকানটায় রসগোল্লা ভালো করত। পরে ডাবর মোড়ে একাধিক মিস্টির দোকান হয়েছিল, যারমধ্যে কল্যাণেশ্বরী মিস্টান্ন ভান্ডারই পুরোনো। এদের দোকানের ল্যাংচা আমার খুব প্রিয় ছিল। কিন্তু এত বছর পর গিয়ে দুদিন ধরে তাক করেও ল্যাংচা পাইনি। পরে একটা দোকান হয়েছিল মোড়ের থেকে কিছুটা ভিতরে, তাদের দই খুব ভালো ছিল। এবারে একটা নতুন দোকানের মিস্টি আর দই খেলাম, বেশ ভালোলাগল। এই দোকানটা অবশ্য অনেকটা ভেতরে।

কলকাতায় হেদুয়া চত্ত্বরে আমি অনেকদিন থেকেছি। কিন্তু সেইসময়ে নকুড়ের মিস্টি কমই খেয়েছি। বরং এখন কখনও ওদিকে গেলে কিনে আনি। তবে নকুড়ের মিস্টি আমার সবথেকে ভালোলেগেছিল আন্দামানে নৌকায় বসে বীরেনরা যখন ঝুলি থেকে বার করে দিচ্ছিল কড়াপাকের সন্দেশ। কড়াপাকের সন্দেশ জিনিসটা আমার খুব ভালোলাগে। ওপরটা শক্ত কিন্তু চাপ দিলেই ভেতরটা রসে কী গুড়ে ভরা। আন্দামানে একটা খুব সুন্দর মিস্টি খেয়েছিলাম, খানিক কেক ধরণের, খুব হাল্কা আর ওপরে নারকোলের পাতলা পরত।

চিত্তরঞ্জনের রসগোল্লাও খুব ভালোলাগে। তবে অমৃত-র দইয়ের যত নাম, খেতে আমার তেমন আহামরি কিছু লাগেনি। আমাদের পাড়ার নিতাই সুইটস-এর দই বরং চেয়ে চেয়ে খাওয়ার মতো। নিতাই সুইটস-এর বিভিন্ন মিস্টিই খেতে খুব ভালো। আমার সবথেকে প্রিয় কালোজাম। কালোজাম মিস্টিটা কিন্তু সবাই খুব ঠিকঠাক বানাতে পারেনা। ওপরটা কুচকুচে কালো, খানিক প্রায় পোড়া ধরণের। কামড় দিলে ভেতরটা হালকা গোলাপী আর রসে ভরা। ওরই মধ্যে একটা এলাচের দানা, মুখে পড়লেই স্বাদ বদলে যাবে।

ইদানীং চকলেট মিস্টির বেশ চল হয়েছে। চকলেট মিস্টি আমার নকুড়ের থেকেও নলিন চন্দ্রের বেশি ভালো। কলকাতার আরও বেশ কিছু নামী অনামী দোকানের ভালো মিস্টি খেয়েছি, অবশ্য সবাই যে মনে দাগ কেটেছে থুড়ি জিভে স্বাদ টেনেছে তা নয়। তবে কলকাতার বাইরে কোথাও বেড়াতে গেলে যেটা মিস করি সবথেকে বেশি, তা এই মিস্টি। কোথাও কোথাও ব্যতিক্রম তো ঘটেই। পুরীর খাজা আর ছানাপোড়ার মতোই বেনারসের রাবড়ি।  

মাঝে মাঝে মনে হয় কেন যে মিস্টির এত দাম বাড়ে! আমাদের মতো সুগারের রুগীকে ঠেকিয়ে রাখার জন্যই বোধহয়।

পুরীতে শেষদিন বিকেলে হাঁটতে হাঁটতে স্বর্গদ্বারের কাছে কাকাতুয়া-র দোকানে খাজা কিনতে গিয়েছিলাম। পৌঁছে দেখি দোকানের চারপাশে শুধু খাজা খাজা এবং খাজা। সামনেই একটা ছোট ট্রাক ধরণের গাড়ি দাঁড়িয়ে, তার পেছনের খোলা জায়গায় পেঁটরা পেঁটরা খাজা। আর দোকানের সামনেও বড় বড় পাত্রে স্তুপীকৃত সদ্য ভেজে আসা খাজা কর্মীদের হাতের নিপুণতায় দ্রুত প্যাকেটবন্দী হচ্ছে। বুই ব্যস্ত হয়ে পড়ল খাঁচায় কাকাতুয়ার ছবি তুলতে, আমার দৃষ্টি খাজার দিকে। আচ্ছা, অমনি একটু খাওয়া যায় না? ভাববাচ্যে বলি আমি। সামনে যে কর্মচারিটি খাজার প্যাকেট করছিল সে এক মুঠো ভাঙা খাজা তুলে আমার হাতে দেয়। আমরা তিনজনে ভাগ করে খাই। ফুরালে হাত ধুয়ে আসি। তারপর আবার ভাববাচ্যে বলি, আরেকটু কি পাওয়া যায় না? লোকটি আবার একমুঠো ভাঙা খাজা তুলে দেয়।

পরেরদিন বাড়ি ফিরে কোনও লাগেজ খোলার আগেই খাজার প্যাকেট খুলি সর্বাগ্রে।

কী মিস্টি এ সকাল...!


Friday, March 25, 2016

ঈশ্বর

হাজার আলোকবর্ষ দূর থেকে তুমি দেখ, আমার ঘুমন্ত কপাল চাঁদ ছুঁয়ে যায় -

তুমি অনন্তকাল জেগে থাক ওইখানে, তারাদের আলোকমালায়...।

Thursday, March 24, 2016

মায়া

মুঠোয় বালি সামনে সমুদ্দুর -
সাদা ফেনায় জোছনা বা রোদ্দুর।
কাঙাল! তাকে ডাক দিয়েছি কবে?
নোনা হাওয়াই মাতাল হল তবে!
মুঠো খুলে তোমায় দিলাম সব -

ঝরেছে রঙ! মায়া না উৎসব?

Wednesday, March 23, 2016

মন্দিরকথা

প্রথমবার কাশী গিয়ে বিশ্বনাথের মন্দিরে আমি ঢুকিনি। ছোটবেলার কথা মনে নেই, বড় হয়ে প্রথমবার পুরী গিয়ে জগন্নাথের মন্দিরেও যাইনি। ঈশ্বর মানিনা এই মনোভাবটা তীব্রভাবে থাকায়। ভ্রমণকাহিনি লেখার পাশাপাশি যখন ক্রমশ ভারতীয় স্থাপত্য, ভাস্কর্য, ঐতিহ্য, শিল্পকলা ইত্যাদি বিষয়ে আমার মতো করে আগ্রহী হয়ে উঠলাম তখন ব্যক্তি আমি কী মানি বা মানি না সেটা নিয়ে তেমন করে আর মাথা ঘামাইনি। তারপর যখন রমাসুন্দরী, লক্ষ্মীমণিদের লেখা পড়তে শুরু করলাম তখন মনে হল সত্যিকারের সংস্কারবিহীন এবং ভ্রামণিক বোধহয় এমন মন না থাকলে হওয়া যায় না। এঁরা সকলেই কম বেশি কষ্ট করে তীর্থে এসেছেন, অথচ তীর্থ শব্দটাই কোথাও নেই। সেই সময়ে, যে সময়ে বাঙালি মেয়েরা মূলতঃ তীর্থ করতেই ঘর ছেড়ে বেরোতো। সেই সময়ে, যে সময়ে বাংলা ভ্রমণসাহিত্যে তীর্থভ্রমণ ছিল একটি আলাদা ধারা।

বিশ্বনাথ মন্দিরে গিয়ে কী অনায়াসে বাঙালি ঘরের বধূ রমাসুন্দরী বলতে পারেন, মন্দিরের মধ্যে আছে, কেবল প্রস্তর। প্রয়াগে গিয়ে মাথা মুড়াতে বলায় বিধবা লক্ষ্মীমণি প্রবল রাগ দেখিয়ে চলে আসতে পারেন অথবা স্বর্ণকুমারী তীব্র ঠাট্টা করতে পারেন। গিরিবালা দেবী মন্দিরে শিবলিঙ্গের রঙ বদল হচ্ছে দেখে সেই সময়ে তার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দেন, যেখানে এখন ফেসবুকে দেখি, এই শিবলিঙ্গ দিনের তিন সময়ে তিন রঙে বদলায়, দেখামাত্র লাইক দিন...। পাণ্ডারা ব্যবসা করলেও ভালো গাইড হয় একথা কবেই বলে গেছেন গিরীন্দ্রমোহিনী।

পুজো না দিয়ে মন্দিরে ঢোকা যায় কী যায় না এ বিষয়ে আমার কোন পরিস্কার ধারনা ছিল না। তাই বিশ্বনাথ মন্দির দেখার জন্য দ্বিতীয়বারে পুজোর ফুলটুল কিনেই ঢুকেছিলাম। যেহেতু ফেলুদা জ্ঞানবাপীতে গিয়েছিল, আমাকে লেখাটা লিখতে হলে ওখানে যেতেই হত। ফেলুদা পুজো দিয়েছিল কিনা তা অবশ্য জানা নেই। তবে লালমোহনবাবু দিলে আশ্চর্য হব না।

প্রথমবার জগন্নাথ মন্দিরে ঢুকে এসব নানা ভাবনা মাথায় ঘুরছিল।

কলিঙ্গ স্থাপত্যের রীতি অনুযায়ী ওড়িশার মন্দিরগুলির চারটি অংশ - ভোগমণ্ডপ, নাটমন্দির, জগমোহন ও দেউল। কোণার্কের মন্দিরের ক্ষেত্রে এই নিয়ম পুরোপুরি মানা হয়নি। নাটমন্দির নেই। দেউল ও জগমোহন মিলিয়ে একটা ইউনিট হিসেবে তৈরি হয়েছিল। এখন আমরা কোণার্কে যে মন্দিরটি দেখতে পাই সেটি মন্দিরের জগমোহন ও ভোগমণ্ডপ অংশ। মূল মন্দির বা রেখ-দেউল বহু শতাব্দী আগেই ধ্বংস হয়ে গেছে।জগন্নাথ মন্দির কিন্তু কলিঙ্গ স্থাপত্যরীতি মেনে তৈরি। মন্দিরের পশ্চিম থেকে পূবে যথাক্রমে দেউল, জগমোহন, নাটমন্দির ও ভোগ মণ্ডপ।

আসলে কেন জানি মন্দিরের রেখ-দেউলের দিকে তাকিয়ে দেখতে দেখতে কোণার্কের মন্দিরের না দেখতে পাওয়া রেখ-দেউলের একটা আন্দাজ করতে চাইছিলাম। ১৮২৫ সালে এস্টারলিং-এর বর্ণনায় কোণার্কের রেখ-দেউলের ভগ্নাবশেষের উল্লেখ পাওয়া যায়। ১৮৩৭ সালে জেমস ফার্গুসনের হাতে আঁকা ছবিতে রেখ-দেউলের একটা অংশ দেখা যায় যার উচ্চতা ছিল আন্দাজ ১৪০-১৫০ ফুট।এটা ছবিতে দেখা অংশের উচ্চতা না মূল উচ্চতার একটা আন্দাজ তা আমার কাছে খুব একটা পরিস্কার নয়। জগন্নাথ মন্দিরের রেখ-দেউলের উচ্চতা প্রায় ২১৬ ফুট। ভূবনেশ্বরের অন্যান্য বেশ কয়েকটি মন্দির ঘুরলেও এত বড় দেউল চোখে পড়েছে বলে এখন মনে পড়ছে না। আর হয়ত তাই এটা দেখে কোণার্কের কথা মনে হয়েছে আমার। জগন্নাথ মন্দিরের দেউলে বেশ কিছু মূর্তি আছে। যার মধ্যে বড় মূর্তির চেয়ে প্যানেলের মধ্যে ছোট মূর্তির সংখ্যা বেশি। ভিড়ভাট্টা আর চড়া রোদ থাকায় খুব খুঁটিয়ে দেখা হয়নি এবারে। কিছু কিছু ভাস্কর্যেও কোণার্কের সঙ্গে মিল পাওয়া যায়। কিন্তু অনেক মোটা দাগের। সম্ভবতঃ উভয় মন্দির সমসাময়িক অথবা কোণার্ক কিছুটা পুরোনো। ভোগ মণ্ডপের লাল রঙ খুব বিশ্রী লাগে। তবে অবশ্যই নিত্য পূজা পান এমন ঠাকুর শুদ্ধু মন্দিরের থেকে ঠাকুর বিহীন মন্দিরের ভাস্কর্য দেখা অনেক সুবিধাজনক। আরও সুবিধাজনক হয় যদি সেই মন্দিরও ততো প্রচারিত না হয়। মানে শেষবার যখন শুধু কোণার্ক দেখব বলেই সেখানে গিয়েছিলাম, শীতের ছুটিতে সেখানে স্থানীয় লোকজনের প্রায় কলকাতার চিড়িয়াখানার মতো ভিড় হয়েছিল। এটা আমাদের দেশ বলেই সম্ভব।


মূল মন্দিরে ভিড়ে ঢোকা সম্ভব হয়নি। আমার আগ্রহ ছিল সূর্য মন্দিরটায় ঢোকা। কোণার্কের মূল সূর্যমূর্তিটি কালাপাহাড়ের আক্রমণের ভয়ে পুরীর মন্দিরে সরিয়ে নিয়ে আসা হয় এমন গল্প কোথাও আমিও পড়েছি। নারায়ণ সান্যালের বইতে এই তথ্য পুরাতত্ত্ব বিভাগের একটি বইতে আছে বলে জানিয়েছেন। যদিও সেখানেও রয়েছে মন্দিরের মূর্তির পেছনে কষ্টি পাথরের একটি ভাস্কর্যের নিদর্শন আছে, কিন্তু তা সূর্যমূর্তি বলে সনাক্ত করা যায়নি। মূর্তিটিকে খুব কাছ থেকে টর্চ দিয়ে নারায়ণবাবু নিজেও পর্যবেক্ষণ করে সেভাবে কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারেননি। আমারও যে ভালো করে দেখার ইচ্ছে ছিল না এমনটা নয়, কিন্তু পূজারিদের আচরণে মন্দিরের মধ্যে আছে, কেবল প্রস্তর ভেবেই তাড়াতাড়ি বেরিয়ে আসতে হল।

এবং ফেলুদা

অন্য রাজ্যের জনপ্রিয় ট্যুরিস্ট স্পটগুলোর মধ্যে পুরী আর বেনারসের তিনটে মিল। এক, উভয় জায়গাতেই বাঙালি গিজগিজ করছে। যদিও সে অর্থে ভারতবর্ষের সর্বত্রই দেশীয় ট্যুরিস্ট বলতে বাঙালিই প্রধান। মানে বাঙালি বেড়াতে যায় আর অন্যান্য রাজ্যবাসীরা ট্যুরিজম থেকে রোজগার করে। তারাও বাংলায় আসে, খুব আসে, মানে একেবারে বাঙালিকে কোনঠাসা করে ফেলে তার নিজের মাটিতেই, তা হল অবাঙালি ব্যবসায়ীরা। আমবাঙালি চাকরিবাকরি করে, কলকাতার থেকে দূরে, আরও দূরে সরে গিয়ে অবাঙালি কনট্রাকটরদের কাছ থেকে ফ্ল্যাট কেনে, আর তারপরে সারা পৃথিবী ভ্রমণ করে।  সে তো গেল অন্য কথা, আমি পুরী আর বেনারসের মধ্যে মিল দেখছিলাম। 
দুই, উভয়ই লালমোহনবাবুর ভাষায় জমজমাট জায়গা। সকালবেলার বেনারসের ঘাট আর সন্ধ্যেবেলার পুরীর সমুদ্রতীরের মধ্যে বেশ একটা মেজাজের মিল আছে। হাঁটতে হাঁটতে স্বর্গদ্বারের কাছটায় চলে এলে আবার মণিকর্নিকার কথা মনে পড়ে যায়। 
আর তিন নম্বর মিলটা হল ফেলুদা। বেনারসে গিয়ে মছলিবাবার আড্ডা খোঁজার মত এবারেও যথারীতি ফেলুদা আর তপসে মিলে দুর্গাগতি সেন-এর বাড়ি সাগরিকা খুঁজতে বেরিয়েছিল। জটায়ুর শরীরটা বিশেষ সুবিধার না থাকায় তাকে বাদ দিয়েই। তপসে ফিরে এসে বলল, সেটা পাওয়া গেছে, তবে বন্ধ থাকায় ঢোকা যায়নি।

বাংলা আর ওড়িশা

ওড়িশার শিল্প বা কৃষি উন্নয়নের বর্তমান পরিস্থিতি ঠিক কী তা আমার জানা নেই। শুধু বেড়াতে গেলে চোখে পড়ে পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন রাস্তাঘাট। কোথাও রাজনৈতিক হোর্ডিং, কী প্রচার, আলোচনা কিচ্ছু চোখে-কানে পড়ল না। এই চারদিনে একবার মাত্র একটা পার্টি অফিসের একেবারে গায়ে খুব ছোট, প্রায় চোখেই পড়ে না, মুখ্যমন্ত্রীর এমন একটা ছবি দেখে তো রীতিমতো অবাকই লাগল।

ধৌলি যাওয়ার পথে রাস্তার ধারের যে দোকানটায় সকালে চমৎকার লুচি তরকারি আর ধোসা সবাই মিলে ভাগ করে খেলাম, সেই দোকানের পিছনে টিনের চালের বাথরুমটাও দিব্বি ঝকঝকে তকতকে। এই প্রথম ধোসার সঙ্গে ছোট্ট এক বোতল করে কোক ফ্রি!

একশো বছর আগেও বাঙালি মেয়েরা অন্য রাজ্যে আর দেশে গেলে নিজের রাজ্যের সঙ্গে তুলনা করত, আমিই বা বাদ যাই কেন? মনে পড়ছিল দার্জিলিং বেড়াতে গিয়ে বৌদ্ধ মন্দিরের কাছের বাথরুমটার কথা। ওই যে লিখেছিলাম, যতদিন না ট্যুরিস্ট লোকেশনগুলোয় বাথরুম পরিস্কার হচ্ছে ততোদিন পশ্চিমবঙ্গ পর্যটনের কিস্যু হবে না। দার্জিলিং-এর গর্ব টয় ট্রেন যে রাস্তায় যায় তা আর বলার মতো নয় দুর্গন্ধে গা গোলাতে গোলাতে আর উড়ে আসা পোকা তাড়াতে তাড়াতে নিজেরই খুব ঘেন্না লাগে এই রাজ্যের মানুষ বলে। অথচ সারা ভারতবর্ষে এত প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য আর কোনও রাজ্যেই নেই।

ইদানিং কলকাতার বেশ কিছু জায়গায় রাস্তাঘাটের কিছু উন্নতি চোখে পড়েছে। কিন্তু আগামী বর্ষা অবধি সেসবে ভরসা রাখা যাবে কিনা আমার জানা নেই। তবে আরও বেশি যেটা চোখে পড়ে সেটা নির্লজ্জ আত্মপ্রচার। ওই যে সুকুমার রায় বলে গেছেন কাজের চেয়ে জোর গলা যার তিনিই লাউডস্পিকার।

শুধু কী নোংরা বাথরুম? যেদিকেই তাকাও দেওয়াল থেকে আকাশে - নানা রঙের পতাকা, হোর্ডিং, চিহ্ন এবং সর্বোপরি সব ছাপিয়ে একটিমাত্র মুখ, মুখ এবং মুখ।

এই চারদিন অন্ততঃ চোখ-কান-নাক সবকটা একটু বিশ্রাম পেয়েছিল।