Thursday, August 31, 2017

ভুল ভাঙাতে


গত কয়েকদিন ধরে আমার পোস্ট কবিতা ইত্যাদি পড়ে যাঁরা ধরেই নিয়েছেন আমি বড্ড খারাপ আছি, তাঁদের ভুল ভাঙাতেই এই পোস্টাচ্ছি। কিছু অসুস্থতা বাদ দিলে হয়তো জীবনের সেরা প্রোডাক্টিভ সময়ের ভেতর দিয়ে যাচ্ছি। খুব খুশী আছি। আর সেই জায়গায় পৌঁছেচি বলেই নিজের জন্য মুখ খোলার উপযুক্ত সময় বলে মনে হয়েছে।

আগেও বলেছি, এখনো বলছি, কারোর সহানুভূতি, ইস টিস পাবার জন্য কোনোদিন লিখি না। ওমা, সহানুভূতি, ভালোবাসা পাবার সত্যিকারের যখন দরকার ছিল, সুদূর দিগন্তেও কাউকে দেখতে পাইনি। এখন বাপু বিস্তর লোকজন আমাকে ভালোবাসে। আর যারা ভালোবাসে তারা তো আর সহানুভূতি দেখায়না, ভালোইবাসে, অনুভব করে সমস্যাগুলো।

আমার কিছু শারীরিক সমস্যা আছে, সেই রিলেটেড মানসিক সমস্যা। তাতে নিজের কাজ সময়ে করতে না পারলে বেশ চাপ পড়ে। সত্যি বলতে কী গতকাল প্রুফের লাইব্রেরী ওয়ার্কটা শেষ করতে পেরে কী যে ফূর্তি হয়েছে কী আর বলব। সেই আনন্দে আজ বারটা অবধি মানে দুপুর আর কী টেনে ঘুমালাম। সকালে ডেকে তুলে পাঁউরুটি পোচ আর চা খাইয়ে গিয়েছিল অবশ্য কর্তামশাই।

তিরিশ বছর পরে শুনে যাঁরা বুঝতে পারছেন। সামনাসামনি কমেন্ট করছেন, উৎসাহ দিচ্ছেন বা অসুবিধা থাকলে মেসেজ করছেন তাঁদেরকে অসংখ্য ধন্যবাদ। আর যাঁরা এত কিছুর পরেও আমার ভুল খুঁজতে বসছেন তাঁদেরকে বলি, নমস্কার ভালো থাকুন। আমাকে বিরক্ত করবেন না।

তিরিশ বছর আগে গৌরী আচার্য, উত্তরা বসু, অমিতা কী যেন টাইটেল এরা মিলে যে অবোধ বালিকাকে খুন করেছিল, সে আজকের আমি নই। কোনো কোনো মানুষ নিজের চিতার আগুন থেকে নিজেকে গড়ে নেয় ফিনিক্স পাখির মতো। সেটাই এই আমি।

আর নামগুলো লিখতেই কিছু কিছু মানুষের বড্ড গায়ে লাগল। কী মুশকিল আপনার সন্তানের সঙ্গে আজ এই ঘটনা ঘটলে তো এই নামগুলো দিয়েই থানায় এফ আই আর করতেন। কোর্টে তুলতেন ডেকে ডেকে। আমি মাত্তর ফেসবুকে বলেছি বলেই এত্ত গায়ে লাগছে!

আর কেবলস মরে গেছে এই সত্যিটা বলায় যারা বড় বড় মহৎ কথাটথা বলছেন, তাদের বলি, মশাই কেবলস কেন মরল? আপনি তো ওখানেই ছিলেন, তা বাঁচাতে পারলেন না? হঠাৎ আমার কথায় খামোখা ফোঁস ফোঁস করছেন কেন? আমি কি সেই আগেকার দিনের মুনি-ঋষি নাকি? শাপ-টাপ দিয়ে দিলাম আর ফলে গেল? পারেন বাপু আপনারা।

আর সত্যিই, সিলভিয়া প্ল্যাথ যদি 'ড্যাডি' কবিতাটা ওদেশে না লিখে এখানে লিখতেন, আর দেখতে হতো না। বিখ্যাত এই কবিতাটা আমায় এমন নাড়া দিয়েছিল যে আমি তাঁর লেখার ভক্ত হয়ে গেছি।

এই জন্য বলে, সত্যি কথা বললে বন্ধু ব্যাজার।

সেদিন মরে গেলে কিচ্ছু বলতে আসতাম না। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশতঃ বেঁচে তো আছিই আরো বহুকাল বাঁচব, উঁহু ব্যথা আর মাঝে মাঝে উলটে পড়লেও। এমনিতেই এসব বলেটলে বেশ আরামই হয়েছে মনে। এদ্দিন অপেক্ষা করেছি তো। তিরিশ বছর কী আর মুখের কথা মশাই?

আজকে বিকেলে চিংড়ি মাছের মালাইকারী আর পেন্ডিং মুড়িঘন্ট সঙ্গে প্রুফটার ফাইনাল চেক আপ। আপাতত এই।

পাপ


তিরিশ বছর ধরে পাপ জমেছিল ওই মাটিতে

ফসল শুকিয়ে গেছে, নদী সেও, ফিরিয়েছে মুখ।

ঘরবাড়ি ঢেকেছে জঙ্গলে, মানুষের চোখের কোটরে শুধু ভুখ।

মাটি খোঁড়ো যদি কোনোদিন। অনেক গভীরে

খুঁজে পাবে অস্থি অবশেষ।

নিষ্পাপ বালিকা ছিল এই অপরাধে

বিশ্বাস করে ছিল যাদের, তারাই হত্যাকারী -

শ্বাসরুদ্ধ। শেষ।

বিচার পায়নি সে, মাটি শুধু দিয়েছিল ঠাঁই।

মাটির গভীরে পাপ, আজ শুধু জন্ম নেয় ছাই।

দেখতে পেলে আছে, না দেখতে পেলেই নেই


শব্দেরা ভাষা খুঁজে পায় সেই তীব্র বোবা যন্ত্রণায়। ফুটে ওঠে বেদনার অবয়ব। অবোধ বালকের দৃষ্টিতে জেগে ওঠে অক্ষর, বর্ণমালারা। ওরা কেড়ে নিচ্ছিল। শব্দের রিনিঠিনি, কালির আঁকিবুঁকি। কেড়ে নিচ্ছিল আলো আর বাতাস। শব্দেরা তাকে ঘিরে দাঁড়িয়েছিল। যন্ত্রণার ভেতর থেকে জন্ম নিচ্ছিল সশস্ত্র অক্ষরেরা। জন্ম নিচ্ছিল আলো তার গভীরে। বার বার ফিরে ফিরে আঘাত করে ঘাতকেরা। আর শব্দেরা গড়ে তোলে প্রতিরোধ। আলো দেখায় পথ।

উত্তরণ হয়। যে উত্তরণের তাপ ওরা সহ্য করতে পারে না। ভয় পায়। ঈর্ষা করে আলো আর অক্ষরকে। তারারা নেমে আসে তখন। এক একটি তারা এক একটি আলো এক একটি শব্দ হয়ে তাকে ঘিরে রাখে অনন্তকাল। তা দেখতে পায় কেবল রূপকথারা। শব্দ আলো আর বেদনায় জন্ম হয় জীবনের।

ম্যাজিক দিদির গল্প


- বলবে না ম্যাজিকদিদি? প্রশ্ন করে, এলোমেলো রোদ্দুর।

ভুলে গেছিলাম, হঠাৎ করে মনে পড়ল, তাই তো, কে যেন আমায় ডেকেছিল, ম্যাজিক দিদি!

জীবনের কোন যাদুর সন্ধান সে পেয়েছিল আমার কাছে কে জানে! কতজনেই তো বলে, বেঁচে থাকার, লড়াই করার মধ্যে একটা যাদু আছে, আর সেই যাদু লুকিয়ে আছে আমার অক্ষরের ছবিতে।

ঘুম পেলে অক্ষরেরা কেমন রিমঝিম শব্দ করে মাথার ভেতর। সেও কি কথার মায়া?

ম্যাজিক দিদি খুব এক কৌটো বেদনার পলাশ নিয়ে ছড়িয়ে দিতে পারে। বৃষ্টির হীরে মানিক কুচি? সে তো হারিয়েছে কবেই।

- গল্পটা কিন্তু বলছ না ম্যাজিক দিদি।

বলছি, বলছি, দাঁড়া। সে অনেকদিন আগের কথা। তখন ম্যাজিক দিদি মফ:স্বলের এক শহরের রূপকথায় বাস করত। সেইখানে বড় বড় গাছ ছিল, মাঠ ছিল, ধানক্ষেত ছিল, আর ছিল আস্ত একটা টিলা। ছোট্ট চোখের অবোধ দেখায় সেটাই হত মস্ত পাহাড়।

আর সেই রূপকথায় মানুষের বেশে ছিল রাক্ষসী সব রানিরা। কোথায় থাকত জানো? একটা ইস্কুলে। সেই ইস্কুলে যেখানে ম্যাজিক দিদিকে ইচ্ছে না হলেও যেতে হত।

আর তখন তো আর সে ম্যাজিক জানত না, ছোট্ট মেয়েটা জানত কেবল কান্না। তার কলম বেঁচে থাকলে রাক্ষসীদের ভারী সর্বনাশ। তাই তারা চেষ্টা করল কেড়ে নিতে শব্দ অক্ষরদের। কেড়ে নিতে আলো আর বাতাস।

মিস্টি মিস্টি হেসে বিষ ছড়াতো সবার মধ্যে। যাতে কেউ না ম্যাজিক দিদির বন্ধু হয়ে ওঠে। ওমা, কেন তাও জানো না বুঝি? বন্ধু শব্দের ম্যাজিক যে সবচেয়ে বেশি। কেউ তাকে হারাতে পারে না।

আর ম্যাজিক দিদি কি করেছিল জানো? চুপিচুপি বন্ধু বানিয়েছিল। শব্দ অক্ষর আর বর্ণমালাদের সঙ্গে। সেইসব জুড়ে জুড়ে ওই যে কাহিনির চরিত্ররা, তারা এসে হাত রেখেছিল তার হাতের ওপর। রাক্ষসীরা ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারে নি যে আস্তে আস্তে ম্যাজিকের জন্ম নিচ্ছে সেই বালিকার ভেতরে। যে ম্যাজিক একবার শিখে গেলে আর কেউ তাকে মারতে পারে না।

- তারপর?

তারপর একদিন রাক্ষসীরা তাকে মেরে ফেলল।

- এই তো তুমি বললে যে তোমায় কেউ মারতে পারে না। তুমি তো রয়েছ ম্যাজিক দিদি। আমি তো চাইলেই তোমার কথার ছবি দেখতে পাই, শুনতে পাই শব্দের কন্ঠস্বর।

দূর বোকা, পারে নাই তো। ওরা কি আর তোর ম্যাজিক দিদির কথা জানতো? মেরেছিল একটা অবোধ বালিকাকে। আর অমনি...

- অমনি কী হল ম্যাজিক দিদি?

অমনি ম্যাজিক দিদি বেঁচে উঠল। তার শব্দ আর আলোর অস্ত্র নিয়ে। চিরকাল ওই রাক্ষুসীরা, ছোট ছেলেমেয়েদের মারতে চায়, চেহারাগুলো কেবল বদলে বদলে যায়। তাদের হাতে আলো শব্দ আর বন্ধুত্বের অস্ত্র তুলে দেবে বলে সে তারপর থেকে কেবল ম্যাজিক শিখতে লাগল।

- কী ম্যাজিক দিদি?

ভালোবাসা।

Wednesday, August 30, 2017

মানুষ এখনো যা পারে


কারও কারও মুখোশ খুলে দেওয়াটা দরকার।

আমরা সকলেই তো কোনো না কোনো সময় মুখোশ পরে থাকি

ভালোমানুষের মুখোশ।

সততার মুখোশ।

মহত্ত্বের মুখোশ।

আর তাই মাঝে মাঝে সেইসব মুখোশ

টেনে খুলে দেওয়াটাই উচিত।

কারণ, এখনো কেউ কেউ পারে;

এই পৃথিবীতেই, কেউ কেউ পারে

সাহস করে মুখোশ খুলে চলতে।

অনায়াসে দেখাতে পারে

ঘৃণা, রাগ, এমন কী ভালোবাসাও।

আর তখনই সেই সব মুখোশ পরা মানুষেরা

আয়নায় নিজেদের বীভৎস মুখ দেখে শিউরে ওঠে।

তাড়াতাড়ি ভদ্র-সভ্য মুখোশটা টেনে দেয় মুখে।

তারপর খেপে ওঠে মুখোশহীন মানুষগুলোর ওপর।

চিৎকার করে বলে ছি, ছি তোমাদের বুকের ভাঁজ, উরু

সব দেখা যাচ্ছে বোরখা পর, বোরখা পর।

মুখোশ না পরলে তুমি আবার মানুষ নাকি?

আর তাই মুখোশহীন মানুষগুলো

তাদের রাগ কিম্বা ঘৃণার মুহূর্তে

টেনে ছিঁড়ে দেয় অন্যের মুখোশ।

আর মুখোশহীন সেইসব প্রেতাত্মারা

দুহাতে মুখ ঢাকতে ঢাকতে ওরই ফাঁকে

ছুরি বসিয়ে দেয় মুখোশহীন মানুষটির বুকে।



তবু, কিছু মানুষ আজো মুখোশহীন থাকতে ভয় পায় না।

তবু, কিছু মানুষ আজো টান দিয়ে ছিঁড়ে দিতে দ্বিধা করে না

অন্য কারো কারো রঙিন ভদ্র ঝলমলে মুখোশ।

কবিতার গল্প


আজ পথে যেতে যেতে কবিতাটা লিখলাম। অনেকদিনই এমন লিখি। কিন্তু আজকেরটা আলাদা দুটো কারণে। প্রথমত, মোবাইল না থাকায় বহুকাল পর কাগজ-পেন এ লিখলাম। আর দ্বিতীয়ত নারীশিক্ষার মিটিং-এ গিয়ে নিজেই ব্যাগ থেকে খাতা বের করে পড়ে শোনালাম। কোত্থাও এমন করি না। কিন্তু এখানে এলেই আমি আপনজনেদের মুখ দেখতে পাই যে।

একটি প্রতিবাদের জন্ম


প্রতিবাদ করার স্বভাবটা আমার খুব ছোটবেলাতেই তৈরি হয়েছিল। কিন্তু শুরুতেই একটা ঘটনায় এমন ধাক্কা খেয়েছিলাম যে যার জের আমাকে অনেকদিন বয়ে যেতে হচ্ছে।

তার আগে একটা কথা বলি। ছোটবেলায় চিত্তরঞ্জনে প্রাইমারী স্কুলে পড়তাম। কিন্তু আমার ইচ্ছের না থাকলেও হিন্দুস্থান কেবলস হাই স্কুলে ভর্তি হতে হয়েছিল। আর সেখানে শিকার হয়েছিলাম স্কুল পলিটিক্সের। বাবা সেখানকার একজন ছাত্রদের প্রিয় শিক্ষক ছিলেন। কিন্তু সহকর্মীদের কদ্দূর ঠিক জানি না। তার জের এসে পড়ত আমার ওপর। লেখাপড়ায় ভালো হওয়া সত্ত্বেও নম্বরে পিছিয়ে দেওয়া, শারীরিক অসুস্থতা জানা সত্ত্বেও নিয়মিত মানসিক অত্যাচার করা এই চলতে লাগল বছরের পর বছর। ইতিমধ্যে এপিলেপ্সি, থাইরয়েডের সমস্যা, ব্রেস্ট টিউমার অপারেশন একের পর এক লেগেই আছে। স্কুলে অসুবিধা হচ্ছিল রোদে দাঁড় করিয়ে রাখত, তাই বাবা ডাক্তারবাবুকে (ডঃ কল্যাণ চ্যাটার্জি, নিউরোলজিস্ট) দিয়ে সার্টিফিকেত লিখিয়ে জমা দিয়েছিল। কিন্তু কাকস্য পরিবেদনা। ফলে ক্রমশঃ মানসিক অসুস্থতার শিকার হতে লাগলাম। টেবিলে ঘুঁষি না মারলে কথা বলতে পারতাম না। আর তার পরেও আমাকে পড়া জানা সত্ত্বেও সহপাঠীদের সামনে অপমান করার জন্য শিক্ষিকারা পড়া জিজ্ঞাসা করে আমার বলতে পারার আগেই বসিয়ে দিতেন। এদের সত্যি আপনি বলতেও এখন ঘৃণা করে। এছাড়া লেখাতেও তোতলামি শুরু হল। হাত আটকে যেত লিখতে লিখতে। তবু চলতে লাগল ক্লাসে, করিডরে, প্রেয়ারে সর্বত্র কোনো না কোনোভাবে হ্যারাস করা। আর এর মধ্যে প্রধান ছিল হেডমিস্ট্রেস উত্তরা বসু আর তার দক্ষিণ হস্ত গৌরী আচার্য এবং ভূগোলের শিক্ষিকা অমিতাদি। আশ্চর্য এই যে কোনো সহপাঠীই পাশে দাঁড়ায়নি সেদিন। আজ যখন ফেসবুকে বন্ধু বলে তখন বড্ড হাসি পায় আমার। রোজ বাড়ি এসে কাঁদতাম আর কী আশ্চর্য তা সত্ত্বেও বাবা স্কুল বদলানোর কথা একবারও ভাবেনি। কেন? মেয়ে সন্তান বলে?

যে প্রসঙ্গ দিয়ে শুরু করেছিলাম এবার তা বলি। তখন ক্লাস টেনে পড়তাম। আমাদের স্কুলে একজন খুব ভালো শিক্ষিকা ছিলেন অশোকাদি, অশোকা বিশ্বাস, জীবন বিজ্ঞান পড়াতেন। খুব অসুস্থও ছিলেন। নিয়মিত ডায়ালিসিস করাতে কলকাতায় যেতেন, নেফ্রাইটিস ছিল। আমার ওপর এই সৎ, প্রতিবাদী, আদর্শবান মানুষটির একটা গভীর প্রভাব আছে। দেখতে তথাকথিত কিছুই ভালো ছিলেন না। কালো, সামনের দাঁতও একটু উঁচু। অথচ যেন মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে থাকতাম ওনার হাঁটাচলায়, কথা বলায়। সেইসময় আমাদের নতুন প্রধান শিক্ষিকা এসেছেন উত্তরাদি। তিনি নিজে বেশ ফাঁকিবাজ ছিলেন। ফলে ফাঁকিবাজ শিক্ষিকারা তাঁর দলে ভিড়লেন। দুঃখের কথা আমাদের স্কুলে এঁরাই দলে ভারী ছিলেন।

আমাদের ক্লাস টিচার শোভনাদি ছিলেন একটু পাগল মতো কষ্ট করে যেদিন ক্লাসে এসে পৌঁছতেন সেদিন সকালে কী রান্না করলেন, কী দিয়ে ভাত খেলেন, ম্যয় মাঝেমধ্যে বরের সঙ্গে টুকরোটাকরা প্রেমালাপ পর্যন্ত আমাদের রসিয়ে রসিয়ে গল্প করতেন। ভূগোল শিক্ষিকা অমিতাদিকে টিচারস রুম থেকে টেনে টেনে এনে ক্লাস করানোয় তিনি আমার ওপর বিস্তর চটা ছিলেন, শোধ তুলতেন খাতায়। আর যেসব শিক্ষিকারা উল-কাঁটা নিয়ে বসতেন তাঁদের ক্লাসে আনে কার সাধ্যি। আরেকজন শিক্ষিকাও সকলেরই খুব প্রিয় ছিলেন চন্দনাদি। আমি মাঝে মাঝে পৃথিবীর সবার ওপর অভিমান করে যখন লাস্ট বেঞ্চিতে বসে থাকতাম তখন চন্দনাদিই কৃত্রিম রাগ দেখিয়ে কিম্বা আদর করে ডেকে সেই মান ভাঙাতেন। অশোকাদি আবার এসব লক্ষ্যই করতেন না। পড়ানোতেই মসগুল হয়ে থাকতেন। করিডরে যেই ওনার জুতোর চেনা খটখট আওয়াজ উঠত তখনই পিন ড্রপ সাইলেন্স ক্লাসে।

ঘটনার শুরুটা এতদিন পরে আর ঠিক মনে নেই। যতদূর মনে পড়ে হেডমিস্ট্রেস উত্তরা বসু আর তার সহযোগী গৌরী আচার্য অশোকাদির সঙ্গে এমন কিছু ব্যবহার করেছিলেন বা সকলের সামনে এমন কোন অপমান করেছিলেন যে উনি বলেছিলেন ক্ষমা না চাইলে আর ক্লাস নেবেন না। আমি তখন আমাদের সেকশনের ক্লাস টেন -র সকলকে ডেকে বোঝালাম যে চল, আমরাও ক্লাস বয়কট করি অশোকাদি যতদিন পর্যন্ত না আমাদের ক্লাস নেবেন আমরাও ক্লাস করবনা। সত্যি বলতে কী আপত্তি উঠল ভালো মেয়েদের মধ্যে থেকেই বেশি। তবু শেষপর্যন্ত সকলকে একরকম বোঝাতে পেরেছিলাম। শুধু তাই নয় ক্লাসের দরজা বন্ধ করে চেয়ার-টেবিল ভেঙ্গেছিলাম সঙ্গীসাথী জুটিয়ে। যেকটা ভাঙ্গতে পারিনি সেগুলো টানতে টানতে পেছনে নিয়ে গিয়ে জড়ো করেছিলাম। তারপর দরজা টেনে দিয়ে সবাই মিলে বাইরে। এই ঘটনা কতদিন চলেছিল আজ আর মনে নেই। তবে এটা ছিল টেস্ট পরীক্ষার ঠিক আগে আগেই। মা বহুবার সাবধান করেছিল আমার এপিলেপ্সি থাকার জন্য। কিন্তু আমার মনে হয়েছিল যে এটা আমায় করতেই হবে।

যেদিন জানলাম আমাদেরই জয় হয়েছে, ক্লাসে ফিরলেন অশোকাদি, আর সেই ক্লাসেই অ্যাটাক হল। জ্ঞানেই কনভালশন। স্কুল চেয়েছিল সরাসরি বাড়ি পাঠিয়ে বিষয়টার সেইখানেই ইতি টানতে। কিন্তু অশোকাদির হস্তক্ষেপে তা হয়নি। কনভালশন থামাতে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হল। সেখান থেকে বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হল। বাড়িতে আবার শুরু হল। একশো পর্যন্ত গুনেছিলাম ঘাড়ের ওপর মাথার কেঁপে ওঠাটা। তারপরে দম আটকে ঠাওর হল আমি মারা যাচ্ছি। তাতে একটা অভিজ্ঞতা হল বৈকী দম আটকানোর শুরুতে যতটা কষ্ট হয়, পরের দিকে কিন্তু কষ্টটা কমে আসে, বোধহয় সেন্সটা ভোঁতা হয়ে যায় বলে। যাইহোক মায়ের উপস্থিত বুদ্ধিতে কাম্পোজ কোনোমতে গিলিয়ে দেওয়ায় সেযাত্রা বেঁচে গেলাম। তারপরে আবার হাসপাতাল। টেস্ট পরীক্ষা দিতে পারলাম না। আমার সব সহপাঠীরাই দিল, যাদের একজনও আমাকে দেখতে আসেনি অসুস্থ হবার পর।

শুনলাম আমাকে নাকী থার্ড লিস্টে অ্যালাও করা হয়েছে। বাবাকে বললাম, আমি এবছর মাধ্যমিক দেবনা, আর এই স্কুল থেকেতো দেবইনা, আমাকে অন্য স্কুলে ভর্তি করে দাও। ক্লাস টেনে নতুন স্কুলে ভর্তি হওয়া খুব মুখের কথা নয়। যাইহোক মধ্যশিক্ষা পর্ষদ পর্যন্ত দৌড়াদৌড়ি করে বাবা সেই কাজ করেছিল। তবে সেইসময়ে চিত্তরঞ্জনের দেশবন্ধু বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা মৈত্রেয়ী মজুমদার পাশে না দাঁড়ালে কিছুতেই হত না। মৈত্রেয়ীদি আমাকে দ্বিতীয় জন্ম দিয়েছেন। যে আমি আজ লড়ে যাচ্ছি। ইনিও আরেকজন অসাধারণ মানুষ। স্বল্প পরিচয়ে যেটুকু অনুভব করেছি। একবছরের মধ্যেই ওই স্কুলের শিক্ষিকারা এবং ক্লাসের সহপাঠীরা আমাকে আপন করে নিয়েছিল, যা আগের স্কুলে পাঁচ বছরেও হয়নি। যদিও তখন আর মেশার মতো কোন মনের অবস্থাই আমার ছিল না।

অসুস্থ অবস্থায় খোঁজ না নিলেও মাধ্যমিকের ফল বেরোলে পুরোনো স্কুল থেকে নতুন স্কুলে ফোন গেল আমার রেজাল্ট জানতে। যাক তাদের মুখ রক্ষা করেছিলাম প্রথম বিভাগের তালিকায় আরেকজন বাড়িয়ে। কিন্তু এই একবছর এভাবে নষ্ট হওয়ায় এবং বাকী সবার সরে দাঁড়ানোয় আমার কিশোর মনে যে গভীর ছাপ ফেলেছিল তার থেকে আজো বেরোতে পারিনি।

এই ঘটনাটা আমি গল্পের আকারে সেইসময় আনন্দমেলায় পাঠিয়েছিলাম। বাবার এক বন্ধুই তখন আনন্দমেলার দায়িত্বে ছিলেন। কিন্তু স্কুলের শিক্ষিকাদের বিরুদ্ধে এমন কাহিনি সত্যি হলেও তিনি নীতিগত (?) দিক থেকেই প্রকাশ করতে রাজী হননি।

অথচ আমার পরবর্তী জীবনে যখনই কোনো খারাপ অভিজ্ঞতা হয়েছে, আমার মাথায় কাজ করেছে যে, কেউ আমাকে মেরে ফেলতে চাইছে। আর তার থেকেই দীর্ঘ মানসিক অসুস্থতার সূত্রপাত।

আর আজ যখন সেই সত্য মানুষের সামনে তুলে ধরছি তখন আমার এই লড়াইয়ে যেমন অজস্র মানুষ পাশে দাঁড়াচ্ছেন, কাছে টেনে নিচ্ছেন। তেমনি কেউ কেউ বিদ্রূপ করে সেই অপরাধীদের মহান বোঝাতে চাইছেন।

তাদের নাম কেন দেওয়া হয়েছে এই নিয়েও উঠছে কথা। আসলে মৃত মানুষ কথা বলে না। আর জীবিত মানুষের কেউ কেউ সত্যি বলতে ঘাবড়ায় না। আমার কী যায় আসে তাদের নাম জানানোয়? বরং মানুষ জানুক, চিনুক মুখোশের আড়ালে তাদের প্রকৃত মুখ।
আরো আশ্চর্য লাগে যখন নিকটজনেরাও আমার ওপরেই দোষারোপ করে!

আমি বলব। কলম নামক অস্ত্র আছে আমার হাতে। তা ওরা কেড়ে নিতে পারে নি।