মেঘ ছিল
না। অথচ লাল-নীল অভিমানী বেলুনগুলো উড়ছিল আকাশে। মুঠো খুলে ভাসিয়ে দিতে দিতে
হাঁটছিল একা। সমুদ্রের ঢেউ পায়ের পাতা ভিজিয়ে দিয়ে আপনমনে হেসে উঠছিল বারবার।
এলোমেলো হাওয়া চুল সরিয়ে চিবুকের ঘাম মুছে ক্লান্ত চোখের পাতা বেয়ে নামছিল সাদা
জামায়। বৃষ্টির হীরে-মানিক কুচিরা রোদ্দুরের প্রিজম আঁকছিল তার মুখের পরে, বুকের পরে।
Wednesday, October 19, 2016
বিসর্জন
না, আমি
রিজওনুরের জন্য পথে হাঁটিনি। কারণ হাঁটতে গেলে পথেই থাকতে হয়, ঘরে ফেরা যায় না।
ভারতবর্ষের নানা রাজ্যে কত রিজওনুর মরছে প্রতিদিন, কে তার খবর রাখে?
মিতার
জন্যও কোনও পিটিশনে সই করিনি। তাহলে এই কদিনে কাগজে এক কলাম, দেড় কলাম ভরালো যে
ধর্ষিত, খুন হওয়া, অ্যাসিডে পুড়ে যাওয়া মেয়েগুলো তাদের জন্যও কোনও পিটিশন পেলাম না
কেন? আর ওই যে আপনার পাশের গলির মেয়েটি, কাগজে যার নাম আসেনি, যার মৃত্যু দু-চারজন
কাছের মানুষ ছাড়া কাউকে নাড়া পর্যন্ত দিল না, তারজন্য?
পিটিশন,
মোমবাতি, হাঁটাহাঁটি সব মৃত্যুর পরে হয়। বেঁচে থাকতে থাকতেই কিছু করুক মেয়েগুলো
অথবা তার পরিচিত, অপরিচিত জনেরা। এখনও তো অনেকেই বিসর্জনের অপেক্ষায় রয়েছেন।
পূজা করি মোরে রাখিবে উর্ধ্বে সে নহি নহি...
দিনচারেক
পুজো করে মাথায় তুলে রেখে তারপর দুম করে আক্ষরিক অর্থেই এই 'জলে ফেলে দেওয়া'র কোনও মানে হয় যুগ যুগ ধরে?
কবে যে
দুর্গা কোমরে আঁচল থুড়ি স্টোল গুঁজে আমাকে আমার মতো থাকতে দাও বলে ছেলেমেয়ের হাত
ধরে মন্ডপ থেকে গটগট করে নিজেই নেমে আসবেন বোধন কী ফিতে কেটে মন্ত্রীর উদ্বোধনের
আগে তার প্রতীক্ষায় আছি।
চিড়িয়াখানা!
খোলা
জঙ্গলে প্রথম জীব-জন্তু দেখি গরুমারায়, ডুয়ার্সে। মনে পড়ে ওয়াচটাওয়ার থেকে মানুষের সম্মিলিত চিৎকার - 'গণ্ডার গণ্ডার'। শুনতে শুনতে ভাবছিলাম ওই জন্তু-জানোয়ারেরা যদি কখনও মানুষ দেখতে আসে তবে
কেমন হয়?
কলকাতার কোনও ওয়াচটাওয়ার থেকে চিৎকার করবে তাদের নিজস্ব
ভাষায় - 'মানুষ, মানুষ'!
বেঙ্গালুরুর
বানারঘাট্টা ন্যাশনাল পার্ক এক অর্থে অনেকটাই চিড়িয়াখানা। নির্দিষ্ট সীমানার মধ্যে
জীবজন্তুদের চলাফেরা নিয়ন্ত্রিত। তবে জু বলতে যা বুঝি, সেই অংশটা আবার আলাদা। এইদিকটায় খোলা জঙ্গলে সাফারি হয়।
ভাল্লুক,
হরিণরা মানুষের পক্ষে তুলনায় নিরাপদ বলে তাদের সামনে খাঁচার
আড়াল নেই। রাস্তার ধারেই তাদের খেতে দেওয়া হয়েছে যাতে দর্শকেরা দেখতে পায় সহজেই। এ
যেন রঙিন পোশাক আর সাজে খদ্দের ধরানোর চেষ্টা। আর অন্যদিকে বাঘ-সিংহেরা আমাদের
মতোই জালের আড়ালে। দর্শকদের আমোদের জন্য একেকটা বাঘকে একেকসময় খাঁচার বাইরে খোলা
জায়গায় খানিকক্ষণ ছেড়ে দেওয়া হয়।
সাফারিতে
নিয়ে যাওয়া হয় জাল দেওয়া বাস বা জিপে। ভেতরে বসে থাকলে মনে হয় যেন আমরাই খাঁচার
ভেতরে,
আর ওরা বাইরে। মেয়েকে বলছিলাম, নিশ্চয় ওরা নিজেদের মধ্যে বলাবলি করে, সেই দু'পেয়ে জন্তুগুলো
আবার এসেছে রে। কী অসভ্যের মতো চিৎকার করে আর কী সব আমাদের দিকে তাক করে! কই আমরা
তো ওদের বিরক্ত করিনা? ছেড়ে রাখা বাঘটা
আগেপিছে থাকা দুটো বাসের মাঝখানে পায়চারি করে দেখছিল আমাদের বেশ কিছুক্ষণ। শেষে
খানিক ধুত্তোর ভঙ্গীতে নেমে গেল পাশের রাস্তায়।
একবার
কাজিরাঙ্গা থেকে বেরিয়ে আসার সময় এক হরিণের চাহনি দেখে আমাদের মনে হয়েছিল, যেন এটাই ভাবছে যে কতক্ষণে এরা বেরিয়ে যাবে আর আমরা একটু
হাঁপ ছেড়ে বাঁচব।
খাঁচার
ভেতর থেকে ওদের দেখছিলাম। অথবা খাঁচার বাইরে থেকে ওরা আমাদের। ভাবছিলাম, ন্যাশনাল পার্ক বা অভয়ারণ্য এইসবও তো সেই নির্দিষ্ট সীমানার
মধ্যেই থাকা। আসলে সবই তো সেই মানুষের সৃষ্ট লক্ষণের গন্ডি - যাকে আমরা ওদের
স্বাধীনতা বলি।
আসলে
আমরা তো নিজেদেরও বেঁধেছি 'দেশ' নামক লক্ষণের গন্ডিতে। 'ধর্ম'
নামক অভয়ারণ্যে বাস করি আমরা। 'সমাজ' নামক ন্যাশনাল
পার্কে।
যেদিন
কারোরই কোনও ক্ষমতার সীমায়ণ ছিল না, আমরা স্বাধীন ছিলাম অন্যান্য জন্তুজানোয়ারদের মতোই। এখন আমরা দেশ ধর্ম সমাজের
জাল দেওয়া যে যার 'চিড়িয়াখানা'য় থাকি। সেখানে কে যে কাকে দেখে সেটাই ভাববার।
জটায়ু উবাচ
'ঘেন্না ধরে গেল মশাই, দেশের যেখানেই
যাই,
কোথাও আমাদের মতন এমন শহরজুড়ে মুখ্যমন্ত্রীর বিজ্ঞাপন চোখে
পড়েনা।'
- এয়ারপোর্ট থেকে বেরিয়ে বাসে করে বেঙ্গালুরু
শহরের দিকে আসতে আসতে মন্তব্যটা করলেন লালমোহনবাবু। 'এই তো গত পুজোর সময় লাদাখ গেসলাম, আর এই পুজোয় বেঙ্গালুরু - দেখুন তো কেমন পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন
শহর,
গাড়ি, বাস, অটো দিব্য চলছে সাঁ সাঁ করে।'
'কেন ওড়িশা তো একদম ঘরের পাশেই। কদিন আগেই তো পুরী ঘুরে এলেন' - চারমিনার থুড়ি গোল্ডফ্লেক-এ একটা টান দিয়ে ধোঁয়ার রিঙটা
ছেড়ে মন্তব্য করল ফেলুদা। গোল্ড ফ্লেকে ঠিক চারমিনারের মতো আমেজ নেই, ফেলুদা বলে। তবে পরিবর্তন তো মেনে নিতেই হয়। এটাও অবশ্য ওরই
মন্তব্য।
মোবাইলে
টেম্পল রান টু খেলার ফাঁকে ফেলুদার সিগারেটের মিলিয়ে যাওয়া রিঙগুলো দেখতে দেখতে
ফুট কাটলাম, আর গ্যাংটকের কথা ভুলে গেলে
ফেলুদা?
গড়পাড়
থেকে রজনীসেন রোড আসতে গিয়ে ষষ্ঠীর দিন বিকেলেই জ্যামে ঝাড়া আড়াই ঘন্টা আটকে ভয়ানক
চটেছেন লালমোহনবাবু। তারপর গড়িয়াহাট থেকে নাকি গাড়ি আবার ঘুরিয়ে দিয়েছিল পুজোর
উদ্বোধনের জন্য। অমন ঠান্ডা মেজাজের হরিপদবাবু শুদ্ধু দেখি আপনমনে গজগজ করছেন।
'ধুর মশাই 'কলকাতায় কুরুক্ষেত্র' ছাড়া আর কোনও লেখাই মাথায় আসছে না। নার্ভগুলো সব গেছে।' অনেকদিনধরেই অবশ্য ডাক্তার দেখাতে বেঙ্গালুরু যাওয়ার কথা
বলছিলেন। পরামর্শটা ফেলুদারই। ইদানীং যেরকম ব্যথা-বেদনা হয়ে মেজাজ খারাপ করছেন, তাতে একবার নিমহানস-এ না দেখিয়ে এলে সত্যিই কী কুরুক্ষেত্র
করবেন কে জানে! কলকাতার কোনও ডাক্তারেই নাকি কিছু করতে পারছেনা।
তবে
আমাদের কোনও মন্তব্যই অবশ্য গায়ে মাখেননা তিনি - 'আরে মশাই, দু-দুবার স্বয়ং মগনলাল পর্যন্ত
কিস্যু করতে পারলনা আর রোগ-বালাই!' বেশ জোর গলাতেই বললেন।
পুজোর
কদিন আমারও ছুটি। অতএব ষষ্ঠীর দিন যখন জেট এয়ারের তিনটে টিকিট পকেট থেকে বার করে
সোফায় ধপ করে বসে পড়লেন বুঝলাম, একেবারে বেঙ্গল
থেকে বেঙ্গালুরু যাত্রাটা পাকা করেই বেরিয়েছেন।
অতএব...।
Thursday, October 6, 2016
আমাদিগের ভ্রমণবৃত্তান্ত
ঊনবিংশ শতকের মাঝামাঝি ভারতবর্ষে রেল চালু
হল। তার আগে বাঙালি মেয়ে তীর্থে বেরোলেও তার কোনও লিখিত দলিল চোখে পড়ে না। এই শতকের
সত্তরের দশকে এক বাঙালি মেয়ে ‘বম্বাই' বেড়াতে গিয়ে লিখল তার ভ্রমণকাহিনি
– ‘আমাদিগের ভ্রমণ
বৃত্তান্ত'। লেখিকার নামের উল্লেখ ছিল না। তার আগেই অবশ্য ষাটের দশকে ‘বামাবোধিনী'পত্রিকা
প্রকাশের তিনমাসের মধ্যেই কবিতায় ভ্রমণকথা লিখেছিল বাঙালি মেয়ে রমাসুন্দরী।
একবিংশ শতকের শুরুতে মফঃস্বলের এক বাঙালি
মেয়ে লিখতে শুরু করেছিল ভ্রমণকাহিনি। নিজের ভ্রমণকথা লিখতে লিখতে আর ভ্রমণ পত্রিকার
সম্পাদনা করতে করতে তার মনে প্রশ্ন জাগে আমার আগে কারা লিখেছিল,কোথায় গেল সেইসব লেখা?
এর উত্তর খুঁজতে বিভিন্ন লাইব্রেরিতে,বইমেলায়
এবং আরও নানা সম্ভাব্য, অসম্ভাব্য জায়গায় ঘুরতে ঘুরতে গড়ে ওঠে আর এক ভ্রমণকাহিনি – ‘আমাদিগের ভ্রমণবৃত্তান্ত'
উনিশ শতকের বাঙালি নারীর বাড়ির বাইরে এবং
বহির্বিশ্বে পা রাখার কাহিনি উঠে আসে একুশ শতকের বাঙালি মেয়ের কথায় ও তাদের নিজের লেখা
‘কাহিনি'তে।
কাহিনির নির্মাণ অথবা কিছুই না
তাকে সকলেই একসঙ্গে দেখতে পেয়েছিল অথবা
কেউই পায়নি। সকলেই শুনতে পেয়েছিল অথবা ভেবেছিল পেয়েছে।
সে নারী অথবা পুরুষ অথবা যে কোনও কিছুই।
তার কোনও অবয়ব ছিল অথবা ছিল না।
কথাটা শুনেছিল সকলেই অথবা ভেবেছিল।
কেউ কেউ প্রশ্ন করেছিল, কেন? অথবা তুমি
কে?
কেউ বলেছিল, যদি না বলি?
সবাইকে একটা করে ধারণা ভাবতে হবে অথবা
গল্প। তাও না পারলে কোনও সূত্র।
তোমরা সবাই আমার চরিত্র। উত্তর না দিলে
নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। সবচেয়ে ভালো উত্তরটা নিয়ে একটা কাহিনি লেখা হবে। কাহিনির চরিত্রেরা
কখনও মারা যায় না।
কী করে বুঝব সত্যি না মিথ্যে? আবারও প্রশ্ন
করেছিল কেউ কেউ। অথবা এইসবই ছিল তাদের ভাবনার মধ্যে প্রশ্ন এবং উত্তরগুলো।
নতুন কিছু বলতে হবে যা কখনও লেখা হয়নি।
আমি গল্প ভাবতে পারি না একজন চিৎকার করে
উঠল।
জীবনকে ভাব। কে যেন উত্তর দিল কানে কানে।
জীবন খুব সাধারণ। আমরা ব্যতিক্রমী নই।
বলে উঠল অনেকগুলো কন্ঠস্বর।
ব্যতিক্রমী হলেই কি অন্যরকম হয়? খোঁজো।
যদি চেনা গল্প অন্যভাবে বলি। যদি মিশিয়ে
দিই সাদা-কালো, ধর্ম-অধর্ম।
সেটা তোমার পছন্দ।
এক মুহূর্তের নিরবতা। তারপর কেউ প্রশ্ন
করল কিন্তু বলব কাকে? কে তুমি?
নিজেকে বল। নিজের কাছে বল। আমি সব শুনতে
পাই। সব দেখতে পারি।
শালা, নিজেকে ঈশ্বর ঠাওড়াচ্ছে - কে যেন
বিরক্ত গলায় হিসহিস করে উঠল।
ঈশ্বর তো যে কোনও কেউ হতে পারে যদি চেষ্টা
কর।
ধপ করে বসে পড়ে লোকটি।
সে একজন সাধারণ মানুষ। বলে চলেছিল তার
আপন কাহিনি, রাগে, ক্ষোভে, চোখের জলে, আনন্দে।
এ তো রোজকার গল্প। এ আবার নতুন কি? যে
এগিয়ে এসেছিল সে ছিল একজন সৈনিক। সীমান্তের পাহারাদার। তার ঝুলিতে সব রোমাঞ্চকর ঘটনা।
কথা বলতে বলতে বদলে যাচ্ছিল ঘর বাড়ি, দৃশ্যপট।
এমন কী চরিত্রেরাও।
এরপর কে এগিয়ে আসবে অথবা মুখ বুজে নিশ্চিহ্ন
হয়ে যাবে এমনটা ভাবছিল অনেকেই। অথচ তারা যে কোনও কেউই সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে রয়েছে খাদের
ধারে বা পাহাড়ের মাথায়, বুঝছিল না। অথবা বুঝতে পারছিল কিন্তু ভাবতে চাইছিল না।
আমি এদের সকলকেই দেখছিলাম অথবা দেখছিলাম
না, নির্মাণ করছিলাম। অথবা এর কোনটাই আসলে সত্যি ছিল না।
Subscribe to:
Posts (Atom)

