Sunday, February 12, 2017

জমি কার?


পৃথিবীর জন্ম হল।

জন্মলগ্নে

জমি ছিল সাগর আর নদীর।

তারপর গাছ আর অন্য প্রাণীদের।

এই পর্যন্ত ঠিক ছিল।

জমিদখলের লড়াই ছিল না,

গুলি ছিল না, মৃত্যু ছিল না।

মানুষের জন্ম হল।

জন্মলগ্ন থেকে

জমি হল মানুষের।

তারপর কৃষকের, শ্রমিকের।

বিরোধ হল, আপোষ হল।

কিছুটা রক্তপাতও।

শাসকের জন্ম হল।

জন্মলগ্ন থেকে

জমি হল রাষ্ট্রের।

সে সীমা টেনে দিল

চাষযোগ্য ও বাসযোগ্য ভূমির।

কতটা জমি গাছের অথবা প্রাণীর।

নদী কিম্বা সাগরের।

রাষ্ট্রের আদেশে তা বাড়ল-কমল,

এবং বদলালোও।

সীমালঙ্ঘনে

গুলি চলল এবং রক্তপাত।

তারপর আবার গুলি, রক্তপাত।

এবং গুলি ও রক্তপাত।

মৃত্যু।




বাউল গান


মানুষ ভজ ওগো সাঁই।

মানুষই পিরিতি দিবে

মানুষেই ঘৃণা করিবে;

তবু মানুষ বিনে

মানুষের গতি নাই।

মানুষ ভজ ওগো সাঁই।

মানুষেই শরীর দিবে

মানুষেই হৃদয় জুড়িবে;

ছুরিও মারিবে তোমায় তাই।

তবুও বুকের গভীরে

তারেই দিও ঠাঁই।

খেপী কয়, ওগো মোর সাঁই

মানুষ ভজ, মানুষ ভিন্ন

মানুষের আর গতি নাই।

বইমেলা - ২০১৭

বিছানায় শুয়ে কিছু পর্যবেক্ষণ। ওই আর কী খই ভাজা।


ছোট থেকেই বছরভর জীবনে আমার একটাই উৎসব - বইমেলা। তার জন্যই দিন গোণা। নতুন জামার চেয়েও আদরণীয় নতুন বই। শেষদিনে বিজয়া দশমীর চেয়েও মনখারাপ। উনিশ বছর আগে ওই শেষদিনটাতেই বই পড়ুয়া দুজনে একসঙ্গে চলাটাও শুরু করেছিলাম। যদিও আমাদের ততোধিক বই পড়ুয়া কন্যার মন্তব্য, বেশ কয়েকটা বিয়ে তো দেখলাম ইদানীংকালে, তোমাদের ছবি দেখলে মনেই হয় না যে তোমরা আদৌ বিয়ে করেছিলে। কী সব কাগজে সইটই করছিলে, তা বইমেলায় গিয়েই তো করতে পারতে সেটা! বলি, তুই তো ছিলিস না, এখন হলে তাই-ই করতাম। তা এবার সেই শেষদিনেও যেতে পারলাম না।

তবে বইমেলা যা দেখলাম, যেটুকু দেখলাম তাতে সর্বত্রই সদ্য ঘটে যাওয়া অর্থনৈতিক টানাপোড়েনের থুড়ি নোট বদলের দীর্ঘশ্বাস চোখে পড়ল বেশি করে। শুয়োরের খোঁয়াড়ের কিছুটা উন্নতরূপের ঢাকা দেওয়া ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র স্টলগুলোতে হাঁপিয়ে উঠছিলেন প্রকাশনার লোকজনই। প্রতি বছরের চেনা স্টল খুঁজে পাচ্ছিলেন না পাঠকেরাও। বিক্রি মার খাচ্ছিল উভয়তই। 'ট্রাভেল ছুটি', 'জল-জঙ্গল'-এ কিছুক্ষণ কাটানোয় বোঝা গেল এই ছবি। বই সাজাতে গিয়ে র‍্যাকটাই কিমকর্তব্যবিমূড়ের মতো খসে পড়েছিল সে কথা হাসতে হাসতে বলছিল যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের উর্মি। এবারে নিজেদের মতো স্টল সাজাতে পারেনি বলে উর্মি, দেবলীনা সবারই বেশ মনখারাপ ছিল শুরুতে। তবে শেষবেলায় যখন বইয়ের বাক্স ঘাড়ে নিয়ে সকলের প্রিয় টিনটিনদা ফিরছিল, ফেসবুকে হাসিমুখ ছবিটা দেখে মনে হল, সব ভালো যার শেষ ভালো। মেশিন বিগড়েছিল একদিন 'ফ্যামিলি বুকশপ'-এ। মাসের শেষে মেয়ের পছন্দের বই না নিয়েই ফিরতে হয়েছিল সেদিন। পরে একদিন 'গাংচিল'-এর ওখানেও মেশিন বিগড়েছে দেখলাম। নোটকাণ্ডে বিক্রি যে মার খাবে সে আশংকা কিছুটা হলেও সত্যি অধীরদার কথাতেই বুঝতে পারলাম। যদিও নিজের বইয়ের কপি চেয়ে বার দুয়েক বকুনি খেয়েছি। তো কী আর করি, বাড়িতে থাকা নিজের বইয়ের একমাত্র কপিটাই বয়ে বয়ে বইমেলায় 'ট্রাভেল রাইটার্স ফোরাম'-এ রতনদাকে দিয়ে এলাম। আরে স্বয়ং রতনলাল বিশ্বাস যখন তাকের মাথায় 'অবলা বসুর ভ্রমণকথা' দেখিয়ে বলেন, তুমি অসাধারণ কাজ করেছ দময়ন্তী, তখন তো 'আমাদিগের ভ্রমণবৃত্তান্ত' নাচতে নাচতে দিতেই হয়। চেনা নামের মধ্যে বইমেলায় এবার একেবারেই অনুপস্থিত 'স্বর্ণাক্ষর' আর 'পরশপাথর''কালান্তর'-এর স্টলে দাঁড়িয়ে দুটো কথা বলে আসাটা সেই চাকরি জীবন থেকেই আমার কেমন জানি অভ্যেস।

বাংলা বই-পত্রিকার জগতে গোষ্ঠী ব্যাপারটা চিরকালই খুব চালু। এ যাবত একেকটা প্রিন্ট মিডিয়াকে ঘিরে গোষ্ঠী, কিছু প্রতিষ্ঠিত প্রকাশনাকে ঘিরে গোষ্ঠী এবং লিটল ম্যাগাজিনের ছোট-বড় নানান গোষ্ঠী ছিল। মূলত: গোষ্ঠীর লোকজন পরস্পরের বই কেনেন, পিঠ চাপড়ান। আবার কেউ কেউ পত্রিকার নামে অথবা নিজ গুণেই গোষ্ঠীর বাইরে বৃহত্তর পাঠকের কাছে পৌঁছে যান। গোষ্ঠী সাহিত্যে এ বছরের নতুন সংযোজন ফেসবুকের বেশ কিছু গ্রুপ ও তাদের প্রকাশনা। এই সূত্রেই আরও একটি বিষয় যা চোখে পড়ল যে, অর্থনৈতিক টানাপোড়েনের এই বাজারেও বেশ কিছু সম্পূর্ণ নতুন প্রকাশনা দামী কাগজ-কভারে ঝকঝকে প্রোডাকশন নিয়ে বাংলার মরে আসা বাজারে নেমেছে। তাহলে কি কলেজ স্ট্রিট বই মার্কেটের আপাত যে ভগ্ন দশাটা আমরা লেখক-পাঠক দেখতে পাই, যার জন্য প্রাপ্য টাকাটা চাইতেও দোনামোনা করি তার সবটা ঠিক নয়?

এইসবই ভাবছিলাম ঝিমোতে ঝিমোতে। আসলে আমাদের মেয়েরা যখন বড় হবে, বাংলা সাহিত্যের জগতটা তখন ঠিক কোথায় পৌঁছাবে, কেমনই বা হবে সেই বাঙালি পাঠক, ভাবছিলাম। ওই যে খই ভাজা।


মিস পেরিগ্রিনস হোম ফর পিকিউলিয়ার চিলড্রেন - দু-চার পাতা উলটে

ছবি পরিচালনার ডিগ্রি এবং আন্টিক শপ আর ফ্লি মার্কেট খুঁজে পাওয়া পুরোনো ফটো জমানোর সখ এই ছিল র‍্যানসম রিগের ঝুলিতে। পুরোনো এইসব ছবিগুলির অনেকটাই ছিল নানা কারণে বেশ অদ্ভুতই। নিজের সংগ্রহের পুরোনো ছবি ঘাঁটতে গিয়ে হঠাৎ করেই খেয়াল করেন, এর বেশিরভাগ ছবিই ছোটদের! তাঁর মনে কৌতূহল জমে ওঠে এইসব ছবির শিশুদের কাহিনি জানবার। আর তা সম্ভব নয় বলেই মনে হয় নিজেই নাহয় গল্প গেঁথে তুলি। ধারাবাহিক এই সিরিজের প্রথম বইটিতে লেগেছে মাত্র ৫০ টি ফটো। আর তার জন্য ঘেঁটেছেন এক লক্ষ ফটোগ্রাফ। এই অধ্যবসায় না থাকলে ছোটদের জন্য সেই মাপের লেখা যায় না হয়তো।

শুধু অধ্যবসায়ই নয়, থিমের বৈচিত্র‍্যর কথাও বারবারই বলতে হয় ইংরেজিতে লেখা ইয়াং আডাল্ট জাঁরের ক্ষেত্রে। এই কাহিনির শুরুতে 'প্রোলোগ' অংশে লেখক গল্পের মূল চরিত্রের ঠাকুরদাদার জীবনের কথা নিয়ে এসেছেন। আসলে সেই গল্পটা জার্মান হানায় দেশ থেকে পালিয়ে আসা এক ইহুদি শিশুর কাহিনি। যে হারিয়ে ছিল আত্মীয়স্বজন সবাইকেই আর মানুষ হয়েছিল এক অরফানেজে। অথচ বৃদ্ধ যখন নাতির কাছে গল্প করেন তখন তাঁর কল্পনায় জার্মান সেনারা হয়ে ওঠে 'মনাস্টার' আর অরফানেজ রূপকথার পুরী, যেখানে নানান বয়সী ম্যাজিকাল শিশুরা তাঁর সঙ্গী হয়ে উঠেছিল। কিন্তু সেই কাহিনি এই গল্পের পশ্চাৎপট মাত্র। মূল কাহিনির নায়ক আজকের এই ছেলেটি। সেই গল্প সবে শুরু করেছি পড়া।

জার্মানদের হাতে ইহুদী নিধনও হতে পারে একটি কিশোর উপন্যাসের পটভূমি! আর পুরোনো ফটোগ্রাফ হতে পারে গল্প লেখার ইন্ধন! সত্যি কুর্ণিশ লেখককে। বইটির আরেক আকর্ষণ ফটোগ্রাফগুলি।

এবারেও বইমেলার বইপড়া শুরু মেয়ের সংগ্রহ উলটেই। আমাকে সমৃদ্ধ করার জন্য অবশ্যই ধন্যবাদটা সবার আগে প্রাপ্য ওরই।

Tuesday, January 17, 2017

জীবনযাপন


জীবন থেকে মাঝে মাঝেই যাপন খুলে রাখি।

দু-একটা দিন একলা পালাই।

নিজের কাছেই ফাঁকি!

যাপন থেকে মাঝে মাঝেই জীবন তুলে রাখি।

দু-একটা দিন একলা হারাই।

নিজের মনেই থাকি।

জীবন এবং যাপন তবু জড়িয়ে ধরে রাখি।


ক্ষমা

ক্ষমা মানে
নিজের বুক থেকে ছুরি বার করে
নামিয়ে রাখা।
যে তোমাকে হত্যা করেছিল, তার
বুকে প্রতিঘাত নয়।
ধর্ম
জাত
সমাজ
লিঙ্গ
ব্যক্তিগত বাদ-প্রতিবাদ।
ক্ষমা
একপক্ষীয় হয়।
ক্ষমা মানে
কখনও প্রশ্রয়।

অনুবাদ খেলা





(১)

শব্দের জন্যই সে বেঁচে থাকত
অন্যদের থেকে পাওয়া,
এবং নিজেও লিখেছিল
কিছু কিছু।
ওহ! কত ছোট্ট থেকে
এখনও পর্যন্ত পুরোপুরি
বেড়ে ওঠা শব্দেরা
আহ কী জাদু!
আবেগ, ঠান্ডা ও উষ্ণ।
এবং তারা কমবয়েসীই
রয়ে যাবে চিরকালই;
মেয়েটির মতো ক্রমে
বৃদ্ধা হবে না আর...


(২)

এসো তাহলে -
এই কলম নাও,
এই হাত,
এ আত্মা;
এসো তাহলে -
এই কবিকে নাও,
এ হৃদয়,
আর শব্দদের;
এবং নিজেকে হারিয়ে ফেল
কবিতায়...