Monday, November 16, 2015

তুলনা

কথা বলা আর না বলার মধ্যে কতটা ফাঁক আর কতটা শূন্যতা থাকে?

পাহাড় আর সমুদ্রের মতন
?
অথচ সমুদ্রের গা বেয়ে তো অনেক পাহাড় জেগে ওঠে,
পাহাড় থেকে নদী হাসতে হাসতে নাচতে নাচতে
পৌঁছে যায় ঠিক একদিন সমুদ্রের বুকে।

মাটি আর আকাশের মতো?
সেখানেও তো দিগন্তে লিখে রেখে আসে গোপন কথা তাদের।

পাতা আর শেকড়ের মতন কি?
কোনোদিন দেখা হয়না যদিও,
গভীরে বেঁচে থাকে একে অপরের বাতাস আর রসে।

তাহলে, প্রকৃতি আর মানুষের মতো -
প্রকৃতি বিমূখ হলে অস্তিত্ব সংকট জেনেও
মানুষ শুধুই তাকে ধ্বংস করে।
নির্বাক প্রকৃতি নীরবে মরতে মরতে
ভাবে, এ যে নিজের মরণ ডাকে, তাও বোঝে না...!

কেবল নৈশব্দঃ আর শূন্যতা মানুষের মাঝখানে হাহাকার করে।

একটুকরো ছেলেবেলা

ধর্ম, রাজনীতি এসব প্রসঙ্গ এলেই খুব ছোটবেলার কথা মনে পড়ে আমার, নানান টুকরো ঘটনা। ছোটবেলায় প্রতি বৃহস্পতিবার আমি লক্ষ্মীপুজো করতাম। আমার শিশুমনের আকর্ষণ ছিল পাঁচালীর গল্প আর প্রসাদ। আসলে ছোট থেকেই হাতের কাছে যে বই পাই বুভুক্ষুর মতো পড়ি। তাই পাঁচালিই সই। সব গল্পই পড়া, কয়েকটা আবার বেশি পছন্দ। মাস, তারিখ মিলুক ছাই না মিলুক সেগুলোই বার বার পড়া চাই। কিছুদিন পরে অবশ্য এই হুজুগ কেটে গেল। ক্লাস ফাইভ সিক্সে পড়তে দাদা বলল, ভগবান নেই। ব্যস, আমার ভগবানের সেখানেই ইতি হয়ে গেল, দাদা সব জানে। দাদা স্কুল বা বাইরে থেকে তখন যা শেখে সেই জ্ঞান বোনের ওপর প্রয়োগ করে। মাঝে একবার বাবার মাথায় ঢুকল শিব প্রতিষ্ঠা করবে, সে কী হইহই কাণ্ড বাড়িতে! আমরাও পরম উত্তেজিত এবং মা পরম বিরক্ত। কারণ বাবার যাবতীয় হুজুগের ঝামেলা মাকেই পোহাতে হত। তা দিনকয়েক দুধে-বেলপাতায় শ্বাসরূদ্ধ হওয়ার পর বাবার উৎসাহ শেষ হয়ে গেল, শিব পড়ল মায়ের ঘাড়ে। তখন ফেলতেও পারি না, গিলতেও পারি না গোছের দশা। কিছুদিন মায়ের হাতের জল পেয়ে শেষে তাকের ওপরে উঠে গেলেন শুকনো শিব। ইতিমধ্যে বাবার সখে ব্ল্যাকি নামক কুকুরের আগমন এবং অবশ্যম্ভাবীভাবে মায়ের দায়িত্বে আসা। আমাদের ছোটবেলায় মায়ের একটা পেটেন্ট বকুনি ছিল, ‘সেই কুকুর থেকে ঠাকুর সবই তো আমার ঘাড়ে পড়বে, তাহলে এসব আনা কেন বাপু? আমি আর পারি না’। তারপর অনেকদিন বেশ শান্তিতেই ছিল বাবা মাছধরা আর বাগান করায় যতটা মাকে জ্বালানো যায় আর কী। যেমন নেই ফ্রিজের যুগে রাত ন’টার সময় ধপাস করে কতগুলো ধরে আনা মাছ নামিয়ে রাখা। তখন কারেন্টও নেই, লন্ঠনের আলোয় সেই মাছ ঘচাঘচ কাটা হচ্ছে আর কাটতে কাটতে মা রাগে গরগর করছে। আমি তখন বোধহয় ইলেভেন কী টুয়েলভে পড়ি, বাবার মাথায় ঢুকল সরস্বতী পুজো করবে। ব্যস, আবার হইহই কাণ্ড পুরুত-টুরুত ডেকে। তখন মা গান শেখাতো তাই ছাত্রছাত্রীরাও হাজির। পরের বছরই বাবার উৎসাহ নিভে গেছে। সেবারে আমি না দাদা কে যেন পুরুতের কাজ করেছিলাম। সরস্বতীর সঙ্গেই আমাদের পুজো ঠাকুর  ইতি ঘটে।

বাবা আর মায়ের মধ্যে রাজনীতি নিয়ে নিত্য তর্কাতর্কি হামেশাই শুনতে পেতাম। মায়ের কাছে তখন মায়ের দামাল ছেলেবেলা থেকে সত্তরের দশকে পার্টি করার নানান গল্প শুনে বেশ উদ্বুদ্ধ আমি। মায়ের সঙ্গে গলা মিলিয়ে রবীন্দ্রসঙ্গীতের পাশাপাশি ‘হেই সামালো ধান হো’, ‘জন হেনরী’, ‘উই শ্যাল ওভারকাম’, ‘ক্যালকাটা ইউথ কয়ার’-এর গান গাইতে রোমাঞ্চ হত। ঠিক যেমন রোমাঞ্চ হত পনেরোই আগস্টে স্কুলে পতাকা উঠলে বা ‘ভারত আমার ভারতবর্ষ’ গানে গলা মেলালে। সত্তরের নানা গল্পে অনায়াসেই মিশে যেত মায়ের প্রথম শ্বশুরবাড়ির যৌথ পরিবারের কাহিনিও। গল্পের টানেই আমরা বিভোর। আনন্দদাদা মায়ের বন্ধুর ছেলে থেকে ক্রমে আমাদের দাদা হয়ে ওঠে সেভাবেই। সেইসময় অনেক কংগ্রেসীরা বাবার সঙ্গে আড্ডা দিতে আসত। তারা কংগ্রেসী বোঝার মত বড় হইনি, মায়ের গজগজ মনে আছে – আমি ‘কংগ্রেসী চা’ করতে পারব না। যেমন আগের শ্বশুরবাড়িতে অনেক নানাবয়সী ছেলেমেয়েরা আসত, আর মাকে প্রায়ই তাদের জন্য ‘বিপ্লবী রুটি’ বানাতে হত। সুনীল, শক্তিদের কথা, মানে তখনও খ্যাত নয় কেউই, কাকা বা সন্তোষ রানা, জয়শ্রী রানা এদের সকলের কথা মায়ের মুখেই শুনেছি। বাবা এসব গল্প একদম করত না। এক জ্যোতি বসুর কিছু কথা বাবার কাছে কখনও শুনেছি। তবে মায়ের কলেজ লাইফে দেবেশ মামা বা অমিতাভ কাকা এদের সঙ্গে আড্ডা মারা, পার্টির গল্প এগুলো মায়ের বেশি প্রিয় এখনও।

এর পাশাপাশি ছিল মায়ের গান সাধনা। সংসারের সব কাজ একা হাতে সেরে একটু বেলায় বসত, একেকদিন বিকেল চারটে-পাঁচটা পর্যন্ত চলত। খাওয়া তারও পরে। মা অল্প যেকদিন চাকরি করতে পেরেছিল, তখন আমার ছিল পোয়া বারো। চেয়ার কিম্বা মোড়ায় উঠে ঘন্টার পর ঘন্টা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ‘দেশ’ পড়া। তখন সমরেশ বসুর ‘কালবেলা’, ‘কালপুরুষ’ একে একে বেরোচ্ছে। আর বাবা মায়ের ঝগড়া হলেই ছাদে পালিয়ে যাওয়া। আর গাছেদের সঙ্গে বকবক কিম্বা রাতে আকাশের তারা দেখা। ইতিমধ্যে বিভূতি, বঙ্কিম, রবি ঠাকুর থেকে চেকভ, দস্তাভয়স্কি, মোঁপাসা থেকে কাগজের ঠোঙা যা পাওয়া যায়। ওদিকে দেশ পড়া বারন, এদিকে ‘ন হন্যতে’ পড়তে পেলাম ক্লাস সেভেনেই। মায়ের লেখালেখিও শুরু হয়ে গেছে। মাঝে মাঝেই উনুনের মধ্যে পুড়ছে উপন্যাস আবার মাছের ঝোল চাপিয়ে চলছে লেখাও। ‘আমাকে কেউ ইঁট চাপা দিলে আমি ইঁট ফুঁড়ে বেরোব’ – এটাও মায়ের পেটেন্ট ডায়লগ। মায়ের যেটা সবচেয়ে ভালো ছিল, একা কাউকে বকত না, আমাদের তিনজনকে একসঙ্গে বকত, একেকসময় এটা চলত প্রায় মাঝ রাত্তির অবধি। সবার আগে ঘুমাত বাবা, মানে বিছানায় পড়া মাত্র। দাদাও খানিকটা সিনসিয়ারলি শুনে ঘুমিয়ে পড়ত, আর আমি এক্কেবারে শেষ পর্যন্ত। অনেকবার পরেরদিন সকালে কাল রাতে পুরো বকুনি একা শোনার জন্য আমাকে কিছু দিতে হবে এই দাবী জানাতাম। কম পাজি তো ছিলাম না। মায়ের আরেকটা ব্যাপার ছিল, কক্ষনো মিথ্যা বলত না, আর কেউ যদি ভুল করেও মা কে মিথ্যাবাদী বলেছে, তাও হয়তো সরাসরি নয়, অসম্ভব ক্ষেপে যেত।

ছ’-সাত বছর বয়স থেকে অনেক বড় পর্যন্ত আমার প্রিয় বই ছিল কাশীদাসী মহাভারত। পরে এই জায়গাটা দখল করে বিভূতিভূষণ আর গীতবিতান এবং আরও পরে রাণী চন্দের ভ্রমণ কাহিনি। আমি তখন একা একা ধানক্ষেতে ঘুরে বেড়াই। সাত-আট বছর বয়সেই মা হাতে ধরে দিয়েছিল ডায়েরি আর কলম, সেই লেখালেখির প্রতি ভালোবাসার শুরু। এখনও মায়ের পরে এটাই আমার সবথেকে বড় ভালোবাসা আর আশ্রয়ের জায়গা। অবশ্যই গীতবিতানও আছে। আসলে বই বা কলম এমন বন্ধু, অনেকটা মায়ের মত, তুমি যাই কর, তোমায় প্রশ্রয় দেবে, আড়াল করবে, ভালোবাসবে।

আমার মা এখন সাদা চুলে সামান্য ভারী চেহারায় দুই নাতনীর প্রিয় দিদিমা, ঠাকুমা, যে কীনা ওয়ান ডি-র গান থেকে ফ্রেঞ্চ শেখা সবেতেই সতেরো বছরের বড় নাতনীর সঙ্গে তাল মেলায় আর ডিভাইন কমেডি-র বাংলা অনুবাদ আর উপন্যাস লেখার ফাঁকে ছ’ বছরের ছোট নাতনীকে তাল দেয়। এই তো কয়েকদিন আগে, আর ঘুড়ি ওড়াতে পারি না, তাও চেষ্টা করলে এখনও পারতে পারি, তোদের কারোর উৎসাহ নেই, এই বলে দুঃখ করছিল। ওরে বাবা মায়ের ঘুড়ি ওড়ানো – সে আরেক গপ্প!


আমার কেবল মাঝে মাঝে আমার ভীষণ রোগা, ঊড়ণচণ্ডি, গাছে চড়া, বৃষ্টিতে ভেজা, হলুদ আঁচলের ছেলেমানুষ মা টার জন্য খুব মনকেমন করে।

ভারতবর্ষ কোনো ধর্ম নিরপেক্ষ দেশ নয়

যতদিন সরকারি বিভিন্ন জায়গায় বা ফর্মে ধর্ম লিখতে হবে, ততদিন পর্যন্ত ভারত কিছুতেই ধর্ম নিরপেক্ষ দেশ নয়। ব্যক্তিগতভাবে যে কেউ যে কোনো ধর্মাচরণ করতেই পারেন কিন্তু ধর্ম নিরপেক্ষ কোনো দেশে সরকারিভাবে কোনো ধর্ম কারোর থাকতে পারে না।

আমি এখনোপর্যন্ত কখনও কোথাও বাধ্যতামূলকভাবে ধর্ম লিখতে হলে ‘হিউম্যানিটি’ বা ‘মানবতা’ লিখি। ভাবছি এরপর ‘ভালোবাসা’ বা ‘love  লিখলে কেমন হয়?

সত্যিই কি আমাদের প্রকৃত কোনো ধর্ম আছে? আমার অন্ততঃ অফিসিয়ালিই নেই। বাবার দিক থেকে পরিবারগতভাবে এক সময়ে হিন্দু হলেও বাবার ঠাকুরদা এক ব্রাহ্ম মেয়েকে বিয়ে করায় সেইসময় ত্যাজ্যপুত্র হয়েছিলেন। আমার মায়েরা পরিবারগতভাবে বৌদ্ধ, কিন্তু মায়ের ঠাকুরদাদা আবার খ্রিস্টান ধর্মে ধর্মান্তরিত হয়েছিলেন এবং তিনি এক বার্মিজ মেয়েকেও বিয়ে করেছিলেন, আমার মায়ের দিদিমাকে ছাড়াও। ফলে আমার মধ্যে এক মুসলিম ছাড়া পরিচিত বেশ কয়েকটি ধর্মের উত্তরাধিকার রয়েছে। আমার জন্মের সময় এবং তারপরেও দীর্ঘদিন মানে আমার বিয়ের ঠিক আগে অবধি বাবা-মা লিভ ইন রিলেশনশিপে ছিলেন। আমার হিন্দু পরিবারে বিয়ে হলেও হিন্দুমতে হয়নি। এবং শাঁখা-সিঁদুর জাতীয় সংস্কার আমি মানি না। আমার বাড়িতে ঠাকুর বা কোনোরকম কোনো পুজো-আচ্চারও বালাই নেই, যদিও সমস্ত ধর্মের প্রসাদ খেতে আমার দারুণ লাগে। ফলে, ধর্মের কলামে প্রচলিত কোনোটা কেন লিখব সেটাই আমার মাথায় ঢোকে না।

আমার পাসপোর্ট নেই। বাংলাদেশ যাওয়ার খুব ইচ্ছে, তার জন্য পাসপোর্ট করালে ধর্ম আমার যা মনে হবে লিখব। দেখি ধর্মনিরপেক্ষ ভারত সরকার কী বলেন?


বন্ধু

অনেকদিন পর পুরোনো বন্ধুর সঙ্গে দেখা হওয়ায় একধরণের নস্টালজিয়া বা ভালোলাগা থাকে। কিন্তু যদি পঁয়ত্রিশ বছর ধরে সামনে বা আড়ালে, যোগাযোগে বা না যোগাযোগে কাউকে শেষপর্যন্ত বোঝানো যায় যে সত্যিই তোর পাশে আছি, সেটা খুব বিরল একটা ভালোলাগা। তেমনই এক ঘটনা ঘটল এইমাত্র। আমার আট বছর বয়স থেকে ক্লাসের একটি মেয়েকে খুব বন্ধু বলে ভাবতাম। চিরকালই ওর আচরণ খুব অদ্ভুত ছিল আমার সঙ্গে। আমাকে আঘাত করেই যেন খুশি হত। বড় হওয়ার পর ও যোগাযোগ না রাখলেও ওর খোঁজ রাখতাম দীর্ঘদিন ওর দিদির বাড়িতে ফোন করে। অনেক পরে যখন দেখা হল তখনও কিছুদিন মিশেই আবার আগের মতোই ব্যবহার করতে শুরু করল। এত যে রাগী, বদমেজাজি আমি, কোনোদিন ওর প্রতি মেজাজ হারিয়ে ফেলিনি, বরং মায়া হয়েছে ওর ছন্নছাড়া জীবন দেখে। আরোই ভালোবেসেছি। অনেকসময় ফোন করলেও ধরেনি। তাও ফোন করেছি। হঠাৎ করেই দু'দিন আগে ফোন করে যোগাযোগ করে দেখা। লেকটাউন মেলার মাঠে বসে টুকিটাকি কথা হল। এমনিতেই কারোর ব্যক্তিজীবন নিয়ে আমার কোনো কৌতূহল নেই। নিজের ক্ষেত্রেই দেখেছি ব্যক্তিজীবন নিয়ে কৌতূহল মানুষকে কতটা ভেঙে দেয়। ফিরে গিয়ে মেসেজ করেছিল, বুঝলাম একা ফিল করছে। বললাম, আমি আছি, তোর জন্য আমার সবসময় সময় আছে। আজ মেসেজ করে আমার ঠিকানা চেয়েছে, চিঠি লিখবে সেটাই তার কাছে মনে হয়েছে নস্টালজিক আর হিলিং। ঠিকানা দিয়ে বললাম, তোর যা ইচ্ছে লেখ, ভুলে যা উল্টোদিকে আমি আছি, জানিস তো আমার কোনো ব্যক্তিগত কৌতূহল নেই, বড়জোর উপন্যাসের রসদ খুঁজতে পারি।

মনে হল এতদিনে হয়ত ওর
'বন্ধু' হয়ে উঠতে পারছি। পঁয়ত্রিশ বছর, এমন কী আর বেশি সময়, বন্ধুসাধনার জন্য?
আরেকজনের এখনও পারলাম না, সেই সম্পর্ক সাঁইত্রিশ বছরের। জানিনা সে কখনও বন্ধু হবে কী না...

"এক হারিয়ে যাওয়া বন্ধুর সাথে..." - এই গানটা মাঝে মাঝেই বেজে ওঠে মনে।


আমার মনে হয়, যে কঠিন সময়ে আমরা আজ দাঁড়িয়ে আছি তার সঙ্গে লড়াই করবার সবচেয়ে ভালো অস্ত্র মানুষে মানুষে বিশ্বাস, ভালোবাসা, বন্ধুত্ব।

সন্ত্রাস, সাম্রাজ্যবাদ এবং ধর্ম

প্রথমেই বলে রাখি রাজনীতি বিষয়ে এবং বিশ্ব রাজনীতির ব্যাপারে আমি খুব কম জানি। আমি অনেকটাই লিখি যা অনুভব দিয়ে বুঝি। গতকাল আমার এক বন্ধুর ফেসবুক প্রোফাইলে তার একটি পোস্টের বিরুদ্ধে একজন ‘মুসলমানের দালাল’ বলে কটূক্তি করেছে। আমার মনে হয় সোশাল মিডিয়ার মত জায়গায় এই ধরণের কথাবার্তা খুবই অশালীন মানসিকতার পরিচয়। এতেই বোঝা যায় যে সাম্রাজ্যবাদ কতটা মগজ ধোলাই করতে পারে মানুষের। সন্ত্রাসের সঙ্গে ধর্মের সে অর্থে কোনো যোগাযোগই নেই। ধর্ম বা জাত, রঙ-এর বিভেদ একেক জায়গায় সন্ত্রাস প্রকাশের মাধ্যম মাত্র। মূলতঃ সন্ত্রাস জড়িয়ে আছে সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে। সাম্রাজ্যবাদেরই আরেক মুখ হল সন্ত্রাস। মূলতঃ যে দেশগুলির মানুষের মধ্যে সন্ত্রাস জিইয়ে রাখলে বাজার দখল করা যাবে সেখানেই ধর্ম, জাত এসবের বিচার উঠে আসে। মুসলিম দেশ বলে নয় ইরাক এবং ইরান তেলের বাজার দখলের জন্য সন্ত্রাসের শিকার। ভারতবর্ষের মতো দেশেও যে টাকা সেনাবাহিনীকে পুষতে, সন্ত্রাস দমন করতে খরচ হয়, সেই টাকা দেশের উন্নয়নে খরচ হলে দেশের চেহারাই পালটে যেত। কিন্তু ভারত-পাকিস্তানের মত দেশগুলি যদি নিজেদের উন্নয়নে মন দেয় তাহলে তাদের বাজার দখল হবে কী করে? কী করে বিক্রি বাড়বে পশ্চিমী দেশগুলি, মূলতঃ আমেরিকার অস্ত্র শিল্পে?

এশিয়া, আফ্রিকার বিভিন্ন অংশে প্রতিদিন শ’য়ে শ’য়ে মানুষ এই সাম্রাজ্যবাদ তথা সন্ত্রাসের শিকার হয়। কিন্তু সেসব নিত্য ঘটনা শিরোনামে আসে কচিৎ কদাচিৎ। আর তাই যখন বুমেরাং হয়ে পশ্চিমী কোনো উন্নত দেশের গায়ে লাগে তখন তা হইচইয়ে পরিণত হয়। আমরা ভুলে যাই, সব জায়গাতেই মারা যায় রক্ত মাংসের মানুষ, এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সাধারণ মানুষ, তার বাইরের পরিচয় যাই হোক না কেন। এই হিন্দু-মুসলিম, ইহুদী-খ্রিস্টান, সাদা-কালো বিভেদ তৈরি করে ও জিইয়ে রাখে সাম্রাজ্যবাদ তার নিজের বাজার দখলের স্বার্থেই। আর বোকা মানুষের মগজ ধোলাই করে। আর আমরা তাই নিজেদের মধ্যে অকারণে মারামারি করে মরি। ওরা উপভোগ করে আর মাঝে মাঝে শান্তির বুলি আওড়ায়।

তাই সন্ত্রাসের কোনো ধর্ম নেই একথা একেবারেই সত্যি। সন্ত্রাস বেঁচে থাকে সাম্রাজ্যবাদের হাত ধরেই।


Sunday, November 15, 2015

তুমি সুন্দর তাই...

চোখ-নাক-মুখের সৌন্দর্য সবার থাকে না, ওতে মানুষের কোনো হাত নেই। চেষ্টা করলেও বদলানো যায় না গায়ের রঙ, মাথার চুল। কিন্তু মনকে সুন্দর রাখলে তার একটা প্রতিফলন ঘটে মুখে। এই প্রসঙ্গে মনে পড়ে অশোকাদিকে। কালো রঙ, দাঁত উঁচু, মাঝারি উচ্চতার এই মহিলা আমাদের কিশোরী মনে দারুণ শ্রদ্ধা আর ভালোবাসার জায়গা করে নিয়েছিলেন। রঙিন শাড়ি, হিলতোলা জুতো আর ডানহাতে ঘড়ি, বাঁহাতে একটাই চুড়ি – বছর পঁচিশ আগে সেইসময়ে মফঃস্বল শহরে সহজেই আমাদের আইডিয়াল হয়ে উঠেছিলেন। নিজেকে ঠিকঠাকভাবে প্রেজেন্টেশন শুধু নয়, কাজের প্রতি অসম্ভব আন্তরিকতা এবং সহজ সরল মন ছিল তাঁর জনপ্রিয়তার অন্যতম কারণ।

এবং শেষোক্ত এই ব্যাপারটিই সৌন্দর্যের আসল চাবিকাঠি বলে আমার মনে হয়েছে। ত্বক পরিচর্যা অথবা অজস্র রূপটানেও মানুষ সুন্দর হতে পারে না, যদি না মন সুন্দর হয়। আবার মন সুন্দর হলে অনেক সাধারণ চেহারাও অসাধারণ হয়ে ওঠে। ওই যে কথা আছে না, মুখই মনের প্রতিবিম্ব, সত্যিই তাই।


যদি সত্যি মানুষের মন সুন্দর হত তাহলে ধর্মের নামে এই হানাহানি, সন্ত্রাস কিছুই থাকত না। মানুষকে শুধু মানুষ বলেই ভাবতে পারত মানুষ। আর তা নেই বলেই প্রসাধনের মুখোশে মুখ ঢাকতে হয়।

Thursday, November 12, 2015

আমি খুঁজছি তোমার ঠিকানা

লেকটাউন জয়া সিনেমার ঠিক পাশের গলিতে ঢুকেই ডানহাতে একটা ঝুপড়ি দোকান আছে চায়ের। খিদে পেয়েছিল, ডিম-পাঁউরুটি বলে দিয়ে দাঁড়িয়ে আছি। দেখছি দোকানদারের ধীরেসুস্থে বানিয়ে তোলার ভঙ্গী। আমার পাশে শ্যামলা রঙের রোগা পাতলা একটা লোক দাঁড়িয়ে দোকানদারের সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছিল। হঠাৎ আরেকজন এসে কিছুটা চিন্তিত মুখে জিজ্ঞাসা করল, এখানে প্রিয়া বিস্কুটের দোকান কোথায় আছে জানেন? দোকানদার ধীরেসুস্থে ঠিকানা জানতে চায়। কিন্তু জয়ার কাছে ছাড়া কোনো ঠিকানা সে জানে না। দোকানদার বলে, কোন রাস্তা তাও জানো না? জয়ার পাশে তো কতকিছুই আছে। একদম সত্যি কথা। বিভ্রান্ত দেখায় লোকটিকে। পাশের থেকে শ্যামলা ভদ্রলোক মন্তব্য করেন, এখন তো সবারই সিঁড়ির নীচে বিড়ির দোকান – সব বাড়িতেই একটা-দুটো অফিস রয়েছে, ঠিকানা না জানলে হয়?  সবে পাঁউরুটি কাটা হয়ে ডিম গোলা হচ্ছে। আমি বলি, ফোন নম্বর তো আপনার কাছে নিশ্চয় আছে, ফোন করে ঠিকানাটা জেনে নিন। লোকটি কিঞ্চিৎ স্বস্তির মুখ করে বলে, আছে, আছে। দোকানদার বলে, ঠিকানাটা জেনে নিয়ে বলুন আমি সব চিনি, বলে দেব। লোকটি বোধহয় ফোন করতে সরে যায় এবং আর ফিরে আসে না। পাশের শ্যামলা লোকটির কথা কানে আসছে। ইতিমধ্যেই বুঝলাম লোকটি ফ্রিজ সারায়, পাকা চাকরি কিছু নেই, সামনে ছোট মেয়ের বিয়ে। সবই একই রকম হাসিমুখে বলে যাচ্ছে, দোকানদার এবং অপরিচিত আমাকে ভারী চেনা মুখ করে। ওরই মাঝে ডিম-পাঁউরুটির ঠোঙা বার করে দোকানদারের নির্দেশে। ঠোঙা হাতে নিয়ে দাম মিটিয়ে পাঁউরুটি চিবোতে চিবোতে হাঁটা দিই। ভাবতে ভাবতে যাচ্ছিলাম যে, লোকটা খুঁজে পেল কীনা দোকানটা আদৌ।


‘সারি সারি সব বাড়ি, যেন সার বাঁধা সৈন্য, সব একধাঁচ সব এক রঙ তুমি কোথায় থাক অনন্য’ ... ওই যাহ্‌ প্রিয়া বিস্কুট...!