Thursday, November 5, 2015

মানবিকতা!

মানবিকতা মানুষেরই ধর্ম,
আমরা অনায়াসে হত্যা করতে পারি।
খিদে না পেলেও ছিন্নভিন্ন করি মনুষ্য শরীর
এবং তারপরেও তাকে চিবিয়ে খাই না।
অতএব আমরা কিছুতেই পশুত্বের তকমা পেতে পারি না।
আমরা সততই মানুষ এবং মানবিকতাই অর্থাৎ

লোভ, ঘৃণা, পরস্পরকে হত্যা আমাদেরই মানবধর্ম।

Wednesday, November 4, 2015

কণা কণা কুড়িয়ে পেলেম তারে

ছেলেবেলায় আমাকে এক মিনিবাসের কন্ডাক্টর ভারী স্নেহ করত। বাসে উঠলেই মামনির জন্য জানলার ধারের সিটের ব্যবস্থা করা চাই। একবার তো কোনো এক জানলা নিয়ে এক সহযাত্রীর সঙ্গে ভারী গোলমাল হয়েছিল। আমি বায়না ধরেছিলাম, ওই জানলাতেই বসব। আর যে লোকটা বসেছিল, সেও উঠবে না। শেষে কী হল, তা মনে নেই অবশ্য।

গত কয়েক বছর ধরে লক্ষ্য করছি আমাদের পাড়ার এক রিক্সাওলা আমাকে খুব স্নেহের চোখে দেখে। স্নেহ পাওয়ার বয়স পেরিয়ে চুল পাকলেও। আজকে ভাবতে ভাবতে আসছিলাম যে আমাকে হয় ওর মেয়ের মতো দেখতে, নাহলে ঠাকুমার মতো। নইলে এত বিরুদ্ধ পরিস্থিতিতেও লোকটা আমায় এত কেন পছন্দ করে? আসলে পাড়ার রিক্সাওলাদের রিক্সায় চড়িনা সেও প্রায় বছরখানেকের বেশি। এ বলে ও নিয়ে যাবে, ও বলে আমি যাব না, এসব করে বিরক্ত হয়ে ধুর যাবনা হয়ে গেছে। যদিও এই লোকটির সঙ্গে কোনোদিনই কিছু হয়নি। রিক্সায় উঠি না বলে কিছু রিক্সাওলার রাগ হয়। ফলে আর কারোর রিক্সাতেই চড়িনে। আগে কিন্তু রাস্তায়ঘাটে দেখলে পাড়ার রিক্সাওলারা এগিয়ে আসত নিয়ে যাবে বলে, কী যে হয়েছে ওদের কে জানে! এখন বরঞ্চ একটু এগিয়ে সামনে যে রিক্সাস্ট্যান্ড থেকে উঠি সেইসব জায়গার রিক্সাওলারা রাস্তায় তুলে নেয় অনেকসময়। সে যাইহোক, এর রিক্সায় যখন চড়তাম আমি, দিব্য গল্প করতে করতে যেতাম। এখনও যাই কখনও অন্য রিক্সায়। এই রিক্সাওলা আমার সঙ্গে কথা বলবে কী বলবে না তা কিছুদিন বুঝতে পারছিল না, আমারও একই অবস্থা। দু'জনেই দেখা হলে হাসব কী হাসব না মুখ করছিলাম। কিছুদিন হল আবার কথা শুরু হয়েছে। বাকীদের থেকে দূরে কোথাও দেখা হলেই একগাল হাসি - কেমন আছেন? মেয়ে কেমন আছে? আরও নানা কথা। নিদেনপক্ষে হাসি।


আজ সকালে ফিজিওথেরাপি করতে যাওয়ার সময় দেখা হল। খুব একগাল হেসে আমার দিকে হাত নাড়িয়ে টা টা করে চলে গেল। তারপর থেকেই ভাবছি, আমাকে নিশ্চয় ওর মেয়ের মতো দেখতে অথবা ঠাকুমা-দিদিমা। অকারণে এত ভালোবাসা নইলে...

অসম্পূর্ণ!

একটা সময় নিয়মিতই গল্প লিখতাম ছোট পত্রিকায়। তারপরে বেড়ানোর লেখা, 'আমাদের ছুটি', গবেষণা সব করতে করতে আর লেখা হয় না। বিস্তর অসম্পূর্ণ গল্প আছে, খানদুয়েক হলেও হতে পারে উপন্যাসও। আজকাল মাঝে মাঝেই সেইসব অসম্পূর্ণ চরিত্রেরা আমাকে জ্বালাতন করছে দিনে-রাতে।

সেই যে ডাক্তার মৃত্যুদণ্ড মানে না বলে বাধ্য হয়ে মানুষকে মারতে পারবে না বলে নিজে আত্মহত্যা করল, যুদ্ধের জুতসই বর্ণনা মাথায় না আসায় যার মৃত্যুকালীন চিঠিটি আমি শেষ করতে পারিনি, তিনি মাঝেমাঝেই অস্থিরভাবে পায়চারি করতে করতে আমায় বলেন, লেখ, লেখ, আমি যে কোনোদিকেই যেতে পারছি না।

মাঝে মাঝে আরুষি এসে আমার গলা জড়িয়ে ধরে ঝুলতে ঝুলতে গাল ফুলিয়ে বলে, আমার কথা, আমার মুখে লিখবে বলেছিলে, কই, কত তো সিনেমা হচ্ছে, আমার কথা বলছে না তো? তুমি কবে লিখবে?

সেই যে আধুনিক রূপকথার গল্পটা নাতি-নাতনিদের বলছিল ঠাকুমা না দিদিমা, নিঠারির মানুষখেকো রাক্ষসের গল্প থেকে শুরু করে গোধরার দৈত্যের কথা। তারা তো এখনো অভিযানে বেরোতেই পারল না। ঠাকুমা-নাতনি সবাই হট্টগোল বাঁধাচ্ছে নিত্যদিন।

বারো বছর পর এগারো জন কাপল দ্বিতীয়বার চাঁদিপুর যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়েও যেতে পারছে না, সবাই মনে মনে টেনসড এরমধ্যে কে খুনী ছিল, সেও কি আসবে? আরও কি কোনো ঘটনা ঘটবে

অথবা বন্ধু সুপ্রতিমের চরিত্রের খানিক আদলে যে ছেলেটা তার শুটিং টিম নিয়ে একজায়গা থেকে অন্য জায়গায় রওনা দিয়েছিল, সেও মাঝে মাঝে চুপ করে বসে থাকতে হচ্ছে বলে রেগে ওঠে। আমার আর সুপ্রতিমের সঙ্গে বসা হয় না, বসা হয়না মায়ের সঙ্গেও। মাকে নিয়েও কিছু একটা লিখব মাঝে মাঝেই ভাবি।

আর তিন্নি তো বড় হয়েই গেছে ওকে নিয়ে লেখা এখন বেশ কঠিন।

আমার অপ্রকাশিত গল্পের চরিত্ররা জ্বালায় না অবশ্য, বোধহয় তাদের আর কিছু করার নেই বলে। একমাত্র প্রথম গল্পের চরিত্রেরা, যাদের নাম বদলে আবার নতুন করে লিখতে শুরু করলাম কিছুদিন আগে তারা মাঝে মাঝে আমার কানের কাছে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, আমরাই কিন্তু তোমার প্রথম চরিত্র। হ্যাঁ, ওদের দাবী কিছু বেশি বইকি। কিন্তু আমি আদৌ কাউকেই লিখব কীনা জানিনা। অথবা নতুন আরও আরও অসম্পূর্ণ কাহিনি।


জানিনা আগামী দিনে আরও আরও অসম্পূর্ণ চরিত্রেরা আমার নিদ্রাভঙ্গ করবে কীনা!

আও বেটা

ফিজিওথেরাপির ওখানে বসে আছি। একই কম্পাউন্ডের মধ্যে স্পিচ থেরাপিও হয়। স্পিচ থেরাপির পেশেন্ট বলতে নানা বয়সের বাচ্চাদেরই দেখি। বেশ দুপুর হয়ে গেছে। এক মা আর ছেলে বসে আছে। ছ'-সাত বছরের মিস্টি দেখতে বাচ্চা ছেলেটা কেন জানি উঠে এসে হাসি হাসি মুখে আমার পাশে বসল। জানি হয়ত উত্তর দিতে পারবে না, তাও আদর করে মাথায় হাত বুলিয়ে নাম জিজ্ঞাসা করলাম। কী বুঝল জানি না, একটা আওয়াজ করল। ওর পিঠে হাত বুলাতে মনে হল, বারণ করছে, হাত সরিয়ে নিলাম। তারপর ওদের ডাক এল ডাক্তারের কাছ থেকে। মা উঠে হাত বাড়িয়ে বলল, আও বেটা। ছেলেও উঠল। উঠে কী ভেবে হাসি হাসি মুখে আমার দিকে হাত বাড়াল।

খুব সম্ভব ছেলেটির স্প্যাস্টিক সমস্যা আছে। একটা সময় এদের নিয়ে কাজ করার আমার খুব ইচ্ছা ছিল...।

আও বেটা, বলতেই ছেলেবেলায় আমার মায়ের মুখ মনে পড়ে গেল। আমি স্প্যাস্টিক ছিলাম না, কিন্তু অনেকটা বড় পর্যন্তই নানা অসুস্থতায় আমার কথা বলা, লেখা এবং অন্যান্য নানারকম বাধা ছিল। সমস্যা ছিল ম্যাচিওরিটিতেও। সেইসময় ডাক্তার, ওষুধ, চিকিৎসা, শুশ্রুষা এইসবই দৌড়ানো থেকে পাশে থাকা, সবই ছিল মা।

তবে এখন মনে হয়, প্রথাগত অসুস্থতার বাইরে 'অদৃশ্য অসুখ'-এ যারা ভোগে তাদের জন্য আমাদের দেশে কোনো সংস্থা, কোনো চিন্তাভাবনাই নেই। অথচ এদের কিন্তু সুস্থ মানুষদের সঙ্গে সমানতালে লড়তে হয়। করুণা কেউ চায় না, কিন্তু সহমর্মিতা প্রয়োজন। এদের জন্য কিছু কাজ করার কিন্তু দরকার আছে।


অন্ততঃ তুমি একা লড়ছ না, এই অনুভূতিতা খুব জরুরি। শিশুদের জন্যে তো আরওই।

মানুষ অথবা!

আজ সকালে খবরের কাগজের পাতা উল্টাতে গিয়ে একটা হেডিং-এ চোখ আটকালো। বিষয়টা হল গাড়ি দুর্ঘটনা এবং মারা গিয়েছে সাতজন। ধাক্কাটা লাগল এই জায়গাটায় এসে - মারা গেছে সাত তৃ্মূলকর্মী। বিষয়টা আন্তঃগোষ্ঠীদন্দ্ব ছিল না, ছিল না বিরোধীপক্ষের সঙ্গে লড়াই। তবু ওই সাত যুবক মরবার সময়ও শুধুমাত্র মানুষ, এই পরিচয়টুকু পেল না।

রাজনীতি কতটা মনুষ্য পরিচয় কেড়ে নেয়, এটাই মনে হচ্ছে বারবার।


সময়বিশেষে একই কাজ করে ধর্মও।

পড়ন্ত বিকেল

শীত পড়ার আগে কিছুদিন এরকম মেঘ মেঘ থাকে অনেকবছরই। এইসময় থেকেই ঝুপ করে বিকেল নেমে আসে আর তারপরে হঠাৎ গড়িয়ে সন্ধে। পড়ন্ত এই বিকেলগুলো ভারী মনখারাপের হয়। ছেলেবেলায় পড়ন্ত বিকেলের ঠাণ্ডা মনখারাপ লেগে থাকত টবের গাছের গায়ে, ছাদের পাঁচিলে, সিমেন্টের বারান্দার রেলিং-এর লম্বা ছায়ায়, ঝরে পড়া পাতায়, আরও কতকিছুতে। আজও তেমনি পড়ন্ত বিকেল আসে তার ঠাণ্ডা মনখারাপ নিয়ে। মায়ের হলুদমাখা আঁচলের কথা কেন জানি মনে করিয়ে দেয়। শুধু এখন আমি আর একা একা ঘুরে বেড়াইনা ধানক্ষেতের আল ধরে।

Sunday, November 1, 2015

অথঃ মদন কথা - ত্বকের সৌন্দর্যের গোপন রহস্য অথবা শিব্রাম

মদন মিত্রের জামিন উপলক্ষে রচিত এবং বিনামূল্যে প্রচারিত

সন্ধে পৌনে সাত ঘটিকা, তিথি জিজ্ঞাসা করিয়া লজ্জা দিবেন না। এখন জামিন যোগ্য তিথি চলিতেছে।


মদন মিত্রকে আমি সামনাসামনি মাত্র একবার দেখেছি, সে কথা তো লিখেইছিলাম। সেই যে যেবার দীপঙ্করদারা লোৎসে অভিযানে যাচ্ছিলেন, সেবারে প্রেসক্লাবে খেলমন্ত্রী মদন মঞ্চে উঠে জানতে চেয়েছিলেন, লোৎসে কি এভারেস্টের থেকেও উঁচু? নাহলে খামোখা এরা এভারেস্ট জয় করে এসে লোৎসে যেতে চাইছে কেন?
তারপর থেকেই ওনার ছবি দেখলেই আমার পেটের ভেতর থেকে একটা হাসি গুড়গুড় করে উঠে আসে। সুকুমার রায় তো বটেই, নিদেন শিবরাম থাকলেও লেখার একটা জম্পেশ রসদ পেতেন। ভাবুন তো মদন দৌড়োচ্ছে আর পিছনে সি বি আই। গোবর্ধনের মতো দৌড়তে দৌড়তে শেষে সিবি আই আগে, মদন পিছে, থুড়ি, মদন আগে সি বি আই পিছে...ওই যযা...কী যেন বলছিলাম সব কেমন গুলিয়েে গেল। অথবা ধরুন, মদনকে ঘিরে দড়ি দিয়ে বাঁধছে সি বি আই অথবা সি বি আই কে মদন। মন্ত্র পড়ছে আর ঘুরছে। তারপর কাক ডাকল, কাকাও ডাকলেন। কাকা না থাকলে মামা ডাকলেন। অথবা মমতা...মানে কেউ একটা ডাকলেই তো হল, কী মুশকিল!
মদনের এমন চকচকে গাল যে মাছি বসলে পিছলে যাবে মনে হচ্ছিল। আমি তো সামনাসামনি মন্ত্রী-আমলা বিশেষ দেখিনি, তা যাই বল, দেখবার মতোই। দেখেই মালুম হচ্ছে ক্রিকেট-ফুটবল কেন ডাংগুলিও খেলতে পারবে না।
মদনের জামিন নিয়ে ভারী দুঃখ পাচ্ছে অনেক লোকে। আরে এতদিন জেলে যতই যত্ন আত্তিতে থাক, সে চেহারা কী আর থাকে? চেহারা মেনটেন করার জন্যও তো একটু বাইরের হাওয়া-বাতাস দরকার।
এই যেমন ব্রাত্য বসু, কী চেহারা ছিল, আর মন্ত্রী হওয়ার পর কী চেহারা হয়েছে! একেবারে যেন মা খাইয়েদাইয়ে চুল আঁচড়িয়ে হাতে রুমাল দিয়ে রোজ দুগগা দুগগা বলে বেরোনোর সময়। দুর্ভাগ্যবশতঃ যদি কখনও জেলে যেতে হয়, মানে জীবন বড় অনিশ্চিত কী না, তাহলে এমন সাধা চেহারা কী আর থাকবে?
অতএব মাছি পিছলোনো গালের সৌন্দর্য বজায় রাখার জন্য অবশ্যই জামিন দরকার।
ওমন পিছলোনো গালের সৌন্দর্যের জন্য সারদার কত টাকা তাঁর কোন খাতে ব্যয় হয়েছে জানতে ভারী ইচ্ছে করে আমার। আহা একটা বিজ্ঞাপন তো দিতেই পারেন ত্বকের গোপন রহস্যের ওপর। এই যে আমরা,অর্থাৎ জনগণ, শীত আসছে, ফাটা কপাল আর শুষ্ক ত্বক নিয়ে বেকার এটাসেটা মেখে পকেট হাতড়ে খরচ করব, সেটা তো বাঁচত।
এ ভারী অন্যায়। জামিন পেয়েছে তো কী হয়েছে, আমাদের যদি ত্বকের গোপন রহস্যের হদিস দেন, আমরাও আগামী শীতে একটু ভালো থাকতে পারি।

না দাদা, আপনার ত্বকে আরও আরও মাছি পিছলোক, খারাপ লোকের কথায় একদম কান দেবেন না, শুধু যদি এই শীতে এট্টু সন্ধান দিতেন তাহলে তৃণমূল স্তরের লোকেদের হেব্বি্ উপকারে দিত, মানে পকেটে কুলালে অবশ্য। আমাদের আবার মা সারদাও নাই।